ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: “ধর্ম কিংবা রাজনীতির চেয়েও মানবতা অনেক উপরে”— এই চিরন্তন সত্যকে আরও একবার প্রমাণ করল কেরলের কাসারগড় জেলার এক নজিরবিহীন ঘটনা। মুখগহ্বরের ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যাওয়া ৬৪ বছর বয়সী এক প্রাক্তন আরএসএস কর্মীকে যখন তাঁর নিজের পরিবার ও আত্মীয়রা ত্যাগ করেছিল, তখন এগিয়ে এলেন এক মুসলিম মহিলা। নিজের ধর্মের পবিত্র ‘মহররম’ উৎসবের দিনেই, সম্পূর্ণ হিন্দু শাস্ত্রীয় আচার মেনে ওই হিন্দু বৃদ্ধের মুখাগ্নি করলেন ইন্ডিয়ান ইউনিয়ন মুসলিম লিগ নেত্রী ইরফানা ইকবাল। শ্মশানে বোরখা পরিহিত মুসলিম নেত্রীর মুখাগ্নি করার সেই ছবি সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হতেই দেশজুড়ে প্রশংসার জোয়ার বইছে। ঘটনাটি ঘটেছে কেরলের কাসারগড় জেলার মঞ্জেশ্বরম তালুকে। মুখাগ্নি করা বছর পঁয়ত্রিশের ইরফানা ইকবাল কাসারগড় জেলা পঞ্চায়েতের উন্নয়ন বিষয়ক চেয়ারপার্সন এবং মঞ্জেশ্বর ডিভিশনের নির্বাচিত সদস্য। গত ২৭ জুন, যেদিন সারা দেশের মুসলিম সমাজ মহররম পালন করছিল, ঠিক সেদিনই উপ্পালার চেরুগোলি পাবলিক শ্মশানে নারায়ণন থোট্টাথোডি নামের ওই বৃদ্ধের চিতায় আগুন দেন তিনি।
জানা গিয়েছে, মঞ্জেশ্বরম তালুকের মীঞ্জা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত চিগুরুপাদের বাসিন্দা ছিলেন নারায়ণন। দীর্ঘদিন ধরে তিনি ক্যানসারে ভুগছিলেন। কোঝিকোড় সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ২৩ জুন তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। কিন্তু মৃত্যুর পর এক চরম অমানবিক দৃশ্যের অবতারণা হয়। নারায়ণনের দুই স্ত্রী, সন্তান এবং বোন—কেউই তাঁর মৃতদেহ নিতে রাজি হননি। শেষ পর্যন্ত পরিবারের সদস্যরা লিখিত সম্মতি দিয়ে ইরফানাকেই মৃতদেহ গ্রহণ এবং শেষকৃত্যের সমস্ত দায়িত্বভার অর্পণ করেন।
ঘটনার সূত্রপাত নারায়ণনের মৃত্যুর ঠিক এক মাস আগে। চিগুরুপাদের একটি পরিত্যক্ত দোকানঘরের বারান্দায় মুমূর্ষু অবস্থায় পড়েছিলেন তিনি। মীঞ্জা পঞ্চায়েতের ওয়ার্ড সদস্য শরিফ চিনাল বিষয়টি জানতে পেরে অবিলম্বে ইরফানাকে খবর দেন। উল্লেখ্য, ইরফানা উপ্পালা এলাকায় ‘শেখ জায়েদ ওল্ড এজ হোম’ এবং ‘শেখ জায়েদ ফাউন্ডেশন’ নামের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা চালান। ইরফানা যখন ঘটনাস্থলে পৌঁছান, তখন রোগ ও অনাহারে নারায়ণনের শরীরের হাড় জিরজিরে হয়ে গিয়েছিল। তিনি জানান, গত ৭ দিন ধরে তিনি কিছুই খাননি। ক্যানসার এতটাই ছড়িয়ে পড়েছিল যে ক্ষতস্থান থেকে তীব্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছিল, যার কারণে স্থানীয় মানুষও তাঁর কাছে ঘেঁষতে পারছিলেন না। ইরফানা দ্রুত জেলা শাসক এবং জেলা স্বাস্থ্য আধিকারিকের সাথে যোগাযোগ করে নারায়ণনকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। দীর্ঘ পাঁচ সপ্তাহ চিকিৎসার পর সেখানেই তিনি মারা যান। কিন্তু পাশে কোনো স্বজন ছিল না।
হাসপাতালের সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে ইরফানা নিজে অ্যাম্বুলেন্সে করে নারায়ণনের দেহ উপ্পালায় নিয়ে আসেন। শ্মশানে কোনো আত্মীয় না থাকায়, তিনি নিজেই কন্যার স্থানে দাঁড়িয়ে হিন্দু রীতিনীতি মেনে শেষকৃত্য সম্পন্ন করেন। এই চিতাভস্মের সাক্ষী হিসেবে সেখানে উপস্থিত ছিলেন সেবা ভারতীর স্বেচ্ছাসেবক রঘু এবং সমাজকর্মী রিয়াজ পিলাথারা ও মেহমুদ কাইকাম্বা। শেষকৃত্য শেষে ফেসবুকে একটি আবেগঘন পোস্টে ইরফানা লেখেন, “কোনো নিকটাত্মীয় আসেননি। আমি একজন মেয়ের মতো নারায়ণনদার শেষকৃত্য সম্পন্ন করলাম। রাজনীতি আর ধর্মের চেয়ে মানবতা অনেক উর্ধ্বে। এই বয়সে তাঁর এভাবে মারা যাওয়ার কথা ছিল না, কিন্তু কেউ তাঁর যত্ন নেয়নি।” ইরফানার কথায়, মহররমের দিনে এই কাজ করার সিদ্ধান্তটি সচেতনভাবেই নেওয়া। যখন তিনি রাস্তা থেকে নারায়ণনকে উদ্ধার করেছিলেন, তখন তাঁকে নিজের বৃদ্ধাশ্রমে রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তাই মৃত্যুর পর তাঁকে এভাবে ফেলে দেওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
