
——————————————————————————-
বিদ্যালয়কে বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। যে প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে ছাত্ররা সহনশীলতা, ঐক্য এবং ভ্রাতৃত্বের পাঠ নেওয়ার কথা, সেখানে যদি সহপাঠীর রক্তে সহপাঠীর হাত রঞ্জিত হয়, তবে বুঝতে হবে সমাজ এক গভীর অসুখের দিকে এগোচ্ছে। ঝাড়খণ্ডের লোহারদাগা জেলায় এক উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে তিন মুসলিম ছাত্রের ওপর যে নৃশংস হামলা চলল, তা কেবল একটি সাধারণ মারপিটের ঘটনা নয়; এটি আমাদের সামাজিক অবক্ষয় এবং সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের এক নগ্ন প্রতিফলন।
ঘটনার বিবরণ শিউরে ওঠার মতো। টিফিন বিরতির পর যখন ক্লাসরুমে পড়াশোনা শুরু হওয়ার কথা, তখন “মুসলিমদের মারব” বলে চিৎকার করে হামলা চালানো হচ্ছে। ২০-২৫ জনের উন্মত্ত ভিড়ে যেমন সহপাঠীরা ছিল, তেমনই ছিল বহিরাগতরা। প্রশ্ন জাগে, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে বহিরাগতরা প্রবেশের সাহস পায় কী করে? স্কুলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা কি এতটাই ঠুনকো যে, যে কেউ ঢুকে ছাত্রদের ওপর প্রাণঘাতী হামলা চালিয়ে নির্বিঘ্নে বেরিয়ে যেতে পারে?
তবে এই ঘটনার সবচেয়ে কলঙ্কজনক অধ্যায় হলো আক্রান্ত ছাত্র আবরার আনসারির অভিযোগ—”শিক্ষকরা সব দেখেও চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলেন।” শিক্ষকরা যদি বিপদে পড়া ছাত্রকে রক্ষা করতে এগিয়ে না আসেন, তবে ছাত্ররা কার ওপর ভরসা রাখবে? এই নীরবতা কেবল কাপুরুষতা নয়, বরং এক প্রকার পরোক্ষ সমর্থন বা ভয়ের সংস্কৃতির বহিঃপ্রকাশ। একজন শিক্ষকের কাছে ছাত্রের পরিচয় হবে কেবল ‘ছাত্র’, তার ধর্মীয় পরিচয় নয়। যদি সেই মহান পেশার মানুষগুলোই সাম্প্রদায়িকতার বিষে নীল হয়ে যান বা ভয়ে নিশ্চুপ থাকেন, তবে শিক্ষা ব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেকটি পোঁতা হয়ে গিয়েছে বলে ধরে নিতে হবে।
লোহারদাগার এই ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সাম্প্রদায়িকতার বিষ আজ কেবল রাজনৈতিক মঞ্চে সীমাবদ্ধ নেই, তা ঢুকে পড়েছে কিশোর-কিশোরীদের মনেও। যখন একজন ১৪-১৫ বছরের কিশোর তার বন্ধুর ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে তাকে মেরে ফেলার কথা বলে, তখন বুঝতে হবে বিষের শিকড় অনেক গভীরে। সোশ্যাল মিডিয়ায় রক্তাক্ত জামা পরিহিত ছাত্রের ছবি আমাদের মানবতার হার মেনে যাওয়ার কথা মনে করিয়ে দেয়।
প্রশাসনের দায়িত্ব এখন কেবল তদন্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বহিরাগতদের মদতদাতা এবং নীরব দর্শক হওয়া শিক্ষকদের ভূমিকা নিয়েও কঠোর তদন্ত প্রয়োজন। সাম্প্রদায়িক উস্কানির উৎসগুলো গোড়া থেকে উপড়ে না ফেললে আজ যা লোহারদাগায় শুরু হয়েছে, কাল তা গোটা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার পবিত্রতা গ্রাস করবে। সময় এসেছে অভিভাবকদেরও সচেতন হওয়ার—আমরা আমাদের সন্তানদের মনে ঘৃণার বীজ বপন করছি না তো? মনে রাখা প্রয়োজন, ঘৃণার এই আগুনে একদিন দাউদাউ করে জ্বলবে আমাদের নিজেদের ঘরও।
