
ঋত্বিকা সেন (শিক্ষিকা)
——————————————————————————
রাজ্য সরকারের নতুন প্রকল্প ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-এর ফর্ম প্রকাশ পেতেই রাজ্যজুড়ে যে শোরগোল ও তীব্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, তা অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং প্রত্যাশিত। যে প্রকল্পকে নারীর ক্ষমতায়ন ও সামাজিক নিরাপত্তার এক যুগান্তকারী হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে, তার অন্দরে প্রবেশ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষকে যে ১২ পাতার এক পর্বতপ্রমাণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে, তা বোধহয় এ রাজ্যের প্রান্তিক ও দরিদ্র নারীরা দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। সরকারের দাবি— ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এই বাড়তি সতর্কতা। কিন্তু এই ‘সতর্কতা’র নামে যা তৈরি করা হয়েছে, তা আদতে জনকল্যাণ নাকি সাধারণ নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনের ওপর এক ধরণের ‘আমলাতান্ত্রিক নজরদারি’, সেই প্রশ্ন এড়ানো যাচ্ছে না।
একটি সাধারণ সরকারি ভাতার ফর্মের জন্য পরিবারের প্রত্যেক সদস্যের চাকরি, আয়, প্যান কার্ড, রেশন কার্ড, ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট তো বটেই, এমনকি কার কিসান ক্রেডিট কার্ড আছে, কার চার চাকার গাড়ি আছে, কার বাড়িতে কটা পাকা ঘর আছে— এই সব খুঁটিনাটি জানতে চাওয়া হচ্ছে। এখানেই শেষ নয়, বাড়ির শিশুটি কোন শ্রেণিতে পড়ে বা তার টিকাকরণ আপডেটেড কি না, কিংবা ২০২৬ এসআইআরে (SIIR) নাম বাদ যাওয়ার বিষয়টি ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন কি না— এমন জটিল আইনি ও ব্যক্তিগত তথ্যও ওই ফর্মে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এই কড়াকড়ি ও দীর্ঘ ফর্ম নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে।
১. ‘ডিজিটাল বিভাজন’ এবং প্রান্তিক মানুষের বঞ্চনা
পশ্চিমবঙ্গের একটা বড় অংশের গ্রামীণ ও আদিবাসী নারীরা এখনও সম্পূর্ণ নিরক্ষর অথবা নাম সই করতে পারেন মাত্র। যেখানে একটি সাধারণ ফর্ম পূরণ করতেই তাঁদের অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়, সেখানে ১২ পাতার এই জটিল মারপ্যাঁচওয়ালা ফর্ম পূরণ করা তাঁদের পক্ষে এককভাবে অসম্ভব। এর ফলে গ্রামাঞ্চলে দালাল চক্রের দাপট বাড়বে এবং তথ্যের সামান্য ভুলে বহু প্রকৃত ও যোগ্য উপভোক্তা এই প্রকল্পের আওতা থেকে শুরুতেই বাদ পড়ে যাবেন। সাহায্য পাওয়ার চেয়ে ফর্মের জটিলতাই তাঁদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
২. ব্যক্তিগত গোপনীয়তার অধিকার কি লঙ্ঘিত হচ্ছে না?
একটি ভাতার জন্য কেন একটি পরিবারের সমস্ত প্রাপ্তবয়স্ক ও অপ্রাপ্তবয়স্ক সদস্যের জীবনের ‘নাড়ি-নক্ষত্র’ সরকারের দরবারে পেশ করতে হবে? কারও জিএসটি (GST) নম্বর আছে কি না, কিংবা কেউ আয়কর দেন কি না— এই সমস্ত তথ্য সরকারের নিজস্ব অর্থ বা আয়কর দপ্তরের ডেটাবেসে অনায়াসেই থাকার কথা। সরকার নিজের প্রশাসনিক অলসতা ঢাকতে সেই সমস্ত তথ্য জোগাড় করার হ্যাপা চাপিয়ে দিয়েছে সাধারণ আবেদনকারীর ঘাড়ে। এটি আমজনতার ব্যক্তিগত গোপনীয়তার ওপর এক ধরণের অযাচিত হস্তক্ষেপ।
৩. ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর সরলতা বনাম ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-এর জটিলতা
পূর্ববর্তী সামাজিক প্রকল্পগুলির বড় সাফল্য ছিল সেগুলির সরলতা ও সহজলভ্য আবেদন প্রক্রিয়া। কিন্তু এই প্রকল্পে যোগ্যতা নির্ধারণের যে সুদীর্ঘ তালিকা (যেমন: পাকা ঘরের সংখ্যা, জমির পরিমাণ, কর প্রদানের ইতিহাস) দেওয়া হয়েছে, তাতে স্পষ্ট যে সরকার দিতে যতটা না চাইছে, তার চেয়ে বেশি চাইছে আবেদনকারীদের ‘ছাঁটাই’ করতে। নথিপত্রের এই পাহাড় প্রমাণ বোঝা আসলে যোগ্য মানুষদের বঞ্চিত করার একটি পরোক্ষ হাতিয়ার মাত্র।
আমলাতন্ত্রের জাঁতাকলে পিষ্ট জনকল্যাণ
প্রশাসনের উচিত ছিল একটি সরল, এক বা দুই পাতার আবেদনপত্র তৈরি করা এবং ব্যাক-এন্ডে সরকারি ডেটাবেসের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তথ্য যাচাই (Data Verification) করা। তা না করে, ফর্মের শেষে ‘ভুল হলে আধিকারিককে কারণ ব্যাখ্যা করতে হবে’— এই ধরণের ভীতিপ্রদ শর্ত জুড়ে দিয়ে সরকার কল্যাণকামী রাষ্ট্রের ধারণাকেই খাটো করেছে।
জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত প্রান্তিক মানুষের দুয়ারে সহজে সুবিধা পৌঁছে দেওয়া, তাঁদের নথির জালে শ্বাসরোধ করা নয়। সরকার যদি সত্যি ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’-এর ভুল থেকে শিক্ষা নিতে চাইত, তবে প্রশাসনিক প্রক্রিয়াকে আরও আধুনিক ও ডিজিটাল করত; সাধারণ মানুষের ওপর ১২ পাতার এই ‘তথ্য-সন্ত্রাস’ চাপিয়ে দিত না। এই আবেদনপত্র অবিলম্বে সরলীকরণ না করা হলে, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ সাধারণ মানুষের অন্ন জোগানোর চেয়ে তাঁদের চরম ভোগান্তি ও হয়রানির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব ও ব্যক্তিগত।)
