TOP NEWS

জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ: অবিরাম যুদ্ধের মাঝে নিষ্ক্রিয়তার দীর্ঘ ছায়া!

——————————————————————————-

কাজিম আলম

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে যে প্রতিষ্ঠানটি বিশ্বের শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার প্রতিশ্রুতি নিয়ে গড়ে উঠেছিল, সেই জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ (UNSC) আজ ক্রমশ এক গভীর প্রশ্নের মুখে। বিশ্বজুড়ে সংঘাত বাড়ছে, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন জ্বলছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ ঘরছাড়া হচ্ছে—কিন্তু এই সংকটের সময়েও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার প্রধান সংস্থাটি যেন অসহায়, অচল এবং অনেকের মতে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। এই বাস্তবতাকে সামনে এনে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক কাজিম আলম এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন—নিরাপত্তা পরিষদ কি সত্যিই তার ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করছে, নাকি এটি ক্রমেই পরিণত হয়েছে বড় শক্তিগুলোর রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার একটি মঞ্চে?

যুদ্ধের আগুন, নীরব নিরাপত্তা পরিষদ

মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক সংঘাত এই প্রশ্নকে আরও তীব্র করে তুলেছে। মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় ইরানে ১,৩০০-রও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে রয়েছে শতাধিক স্কুলছাত্রী। যুদ্ধের ফলে প্রায় ৩২ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানও পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে প্রতিবেশী বিভিন্ন দেশে। একই সময়ে লেবাননে ইসরায়েলি অভিযানে ৬০০-রও বেশি মানুষের মৃত্যু এবং প্রায় ৮ লাখ মানুষের বাস্তুচ্যুতি ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার দায়িত্বপ্রাপ্ত নিরাপত্তা পরিষদের ভূমিকা কী ছিল—এই প্রশ্নই এখন সবচেয়ে বড় বিতর্কের বিষয়।

ওয়েবসাইটের একটি ছবি, বড় এক প্রতীক

সমালোচকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের নিষ্ক্রিয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে একটি সাধারণ দৃশ্য। সংস্থাটির ওয়েবসাইটের প্রথম পাতায় এখনও যে ছবি দেখা যায়, সেটি একটি বৈঠকের—যেখানে মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্প সভাপতিত্ব করছেন। বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল মার্চের শুরুতে। কিন্তু এরপরের দিনগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ আরও বিস্তৃত হয়েছে, হাজার হাজার মানুষ মারা গেছে বা বাস্তুচ্যুত হয়েছে—তবুও সেই ছবিই যেন সময়ের স্থির হয়ে থাকা একটি মুহূর্তের মতো দাঁড়িয়ে আছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই ছবি আসলে একটি গভীর বাস্তবতার প্রতীক—বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শান্তি সংস্থাটি যেন বাস্তব সংঘাতের সামনে কার্যত স্থবির।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান

১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা বজায় রাখা। যুদ্ধ প্রতিরোধ করা, কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করা, প্রয়োজনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা এবং প্রয়োজনে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের অনুমোদন দেওয়া—এসবই ছিল তার দায়িত্ব। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অনেকেই বলছেন, বাস্তবে এই সংস্থা সেই ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সংঘাত—গাজা যুদ্ধ, লেবানন সংকট কিংবা ইরানকে ঘিরে বর্তমান যুদ্ধ—এসব ক্ষেত্রে নিরাপত্তা পরিষদের কার্যকর পদক্ষেপ খুবই সীমিত।

গাজা যুদ্ধ ও সমালোচনার ঝড়

সমালোচকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো গাজা যুদ্ধ। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সংঘাতে গাজায় নিহত ফিলিস্তিনির সংখ্যা ৭১ হাজার ছাড়িয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। এত বড় মানবিক বিপর্যয়ের পরও নিরাপত্তা পরিষদ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। যুক্তরাষ্ট্রের ভেটোসহ বিভিন্ন কূটনৈতিক বাধার কারণে বহু প্রস্তাব আটকে গেছে। ফলে অনেকেই মনে করছেন, আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রে এই সংস্থার কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

“নিরাপত্তা পরিষদ অনেক দিন ধরেই ব্যর্থ”

ইস্তাম্বুল বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান অধ্যাপক আহমেত উয়সাল মনে করেন, নিরাপত্তা পরিষদের ব্যর্থতা নতুন নয়। তাঁর মতে, ইরাক ও আফগানিস্তান আক্রমণের সময় থেকেই এই সংস্থার প্রভাব কমতে শুরু করে। তিনি বলেন, “দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তা পরিষদ কার্যত ব্যর্থ। অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সংঘাতে জাতিসংঘের ভূমিকা এখন দুর্বল এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।”

সাম্প্রতিক প্রস্তাব ও বিতর্ক

মার্চের ১১ তারিখে নিরাপত্তা পরিষদ একটি প্রস্তাব পাস করে, যেখানে ইরানের প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর হামলাকে “গুরুতর আক্রমণ” হিসেবে নিন্দা জানানো হয়। কিন্তু একই সময়ে রাশিয়ার আনা আরেকটি প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা হয়। সেই প্রস্তাবে বলা হয়েছিল, ইরানের হামলার মূল কারণ ছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের পূর্ববর্তী আক্রমণ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে। সমালোচকদের মতে, সংঘাতের মূল কারণ নিয়ে আলোচনা না করে শুধুমাত্র একটি পক্ষকে দোষারোপ করা শান্তি প্রতিষ্ঠার পথকে আরও কঠিন করে তোলে।

“সংস্থাটি নীরব নয়, বরং পরিকল্পিতভাবে কাজ করছে”

আঙ্কারা ইয়িলদিরিম বেয়াজিত বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ওমাইর আনাস ভিন্ন একটি বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন। তাঁর মতে, নিরাপত্তা পরিষদ আসলে নীরব নয়; বরং এটি যেভাবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, সেভাবেই কাজ করছে। তিনি বলেন, “এই সংস্থাটি মূলত একটি আধিপত্যবাদী বিশ্বব্যবস্থা রক্ষার জন্য গড়ে উঠেছিল।” তাঁর মতে, তাই অনেক ক্ষেত্রেই বড় শক্তিগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা হয়, আর ছোট বা দুর্বল দেশগুলো সেই ব্যবস্থার মধ্যে আটকে পড়ে।

ভেটো ক্ষমতা: সমস্যার মূল?

নিরাপত্তা পরিষদের সবচেয়ে বড় বিতর্কিত বিষয় হলো ভেটো ক্ষমতা। পরিষদের পাঁচটি স্থায়ী সদস্য—যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—প্রতিটি প্রস্তাবের ওপর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। এই কাঠামোর কারণে অনেক গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে যায়। বিশেষ করে যখন কোনো সংঘাতে এই পাঁচ দেশের কোনো মিত্র জড়িত থাকে, তখন কার্যত নিরাপত্তা পরিষদের পদক্ষেপ নেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ে।

“বিশ্ব পাঁচটির চেয়ে বড়”

তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা পরিষদের এই কাঠামোর সমালোচনা করে আসছেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি—“দুনিয়া পাঁচটির চেয়ে বড়”—আসলে এই ব্যবস্থার বিরুদ্ধে একটি রাজনৈতিক স্লোগানে পরিণত হয়েছে। এরদোয়ানের মতে, পাঁচটি দেশের হাতে এত ক্ষমতা থাকা আন্তর্জাতিক গণতন্ত্রের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশ্বের বহু দেশ, বিশেষ করে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলো, এই দাবির সঙ্গে একমত।

প্রতিনিধিত্বের সংকট

বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা পরিষদের কাঠামো আজকের ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে আর সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। আফ্রিকার কোনো দেশ স্থায়ী সদস্য নয়। এশিয়ার বিশাল অংশ প্রতিনিধিত্বহীন। মুসলিম বিশ্বেরও কোনো দেশ ভেটো ক্ষমতা পায়নি। ফলে অনেক দেশের কাছে এই প্রতিষ্ঠানটি একটি পুরোনো বিশ্বব্যবস্থার প্রতীক।

বিকল্প জোটের উত্থান

এই পরিস্থিতিতে বিকল্প আন্তর্জাতিক জোটের উত্থানও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। শাংহাই কোঅপারেশন অর্গানাইজেশন (SCO) এবং ব্রিকস (BRICS)-এর মতো জোট ক্রমশ শক্তিশালী হচ্ছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এসব জোট ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বড় ভূমিকা নিতে পারে এবং জাতিসংঘের বিকল্প কাঠামো তৈরি করতে পারে।

জাতিসংঘ সংস্কার কি সম্ভব?

উয়সালের মতে, জাতিসংঘকে ভেতর থেকে সংস্কার করা প্রায় অসম্ভব। কারণ স্থায়ী সদস্য দেশগুলো বর্তমান কাঠামো থেকে সুবিধা পায় এবং তারা সেই কাঠামো পরিবর্তনে আগ্রহী নয়। তিনি মনে করেন, বাস্তবসম্মত বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা তৈরির কথা ভাবতে হবে।

আইসিজে ও আইএইএর সীমাবদ্ধতা

জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থাও একই ধরনের সমালোচনার মুখে পড়েছে। আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (ICJ) ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজা যুদ্ধ নিয়ে মামলা শুনছে এবং কিছু গুরুত্বপূর্ণ রায়ও দিয়েছে। কিন্তু আদালতের রায় বাস্তবায়নের ক্ষমতা সীমিত। একইভাবে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)-কেও অনেক সময় অকার্যকর বলে সমালোচনা করা হয়েছে। বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চলমান উত্তেজনার সময় সংস্থাটিকে প্রায় পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে।

ভবিষ্যৎ কোন পথে?

সব মিলিয়ে প্রশ্নটা এখন আরও স্পষ্ট—জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ কি এখনও আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষার কার্যকর প্রতিষ্ঠান? নাকি এটি ধীরে ধীরে এমন একটি কাঠামোতে পরিণত হয়েছে, যা বাস্তব সংঘাতের সামনে কার্যত অসহায়? বিশ্লেষকদের মতে, এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বদলাচ্ছে, আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বদলাতে হবে। নইলে শান্তির যে স্বপ্ন নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের জন্ম হয়েছিল, তা হয়তো ইতিহাসের পাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

Credit: TRT World

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!