ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ২১ শতকের ভূ-রাজনীতিতে অন্যতম বড় আশঙ্কার নাম মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য সরাসরি যুদ্ধ। গত কয়েক দশক ধরে এই দুই দেশের মধ্যে ছায়াযুদ্ধ (Proxy War) চললেও, সাম্প্রতিক বিশ্ব পরিস্থিতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তনশীল সমীকরণ ইঙ্গিত দিচ্ছে, ওয়াশিংটন এবং তেহরান হয়তো ইতিহাসের সবচেয়ে বিপজ্জনক সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে।
১. ঐতিহাসিক বৈরিতার প্রেক্ষাপট
মার্কিন-ইরান দ্বন্দ্বের শিকড় অনেক গভীরে। ১৯৫৩ সালের সিআইএ-সমর্থিত অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লব—ঘটনাপ্রবাহের প্রতিটি বাঁক এই দুই দেশের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি করেছে। ১৯৭৯ সালে তেহরানে মার্কিন দূতাবাসে জিম্মি সংকট কূটনীতির যে স্থায়ী ক্ষত তৈরি করেছিল, তা আজও শুকায়নি। বর্তমান উত্তেজনার কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পরমাণু কর্মসূচি এবং মধ্যপ্রাচ্যে তাদের ক্রমবর্ধমান প্রভাব।
২. ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং জেসিপিওএ থেকে বেরিয়ে আসা
২০১৫ সালে বারাক ওবামার আমলে হওয়া পরমাণু চুক্তি (JCPOA) থেকে ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বেরিয়ে যাওয়া ছিল আধুনিক ইতিহাসের অন্যতম বড় মোড়। ট্রাম্পের ‘সর্বোচ্চ চাপ’ (Maximum Pressure) নীতি ইরানের অর্থনীতিকে পঙ্গু করে দিলেও তেহরানকে মাথা নত করাতে পারেনি। বরং ইরান তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি আরও বেগবান করেছে, যা এখন পরমাণু অস্ত্র তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
৩. কাসেম সোলেইমানি হত্যাকাণ্ড ও প্রতিশোধের রাজনীতি
২০২০ সালের জানুয়ারিতে বাগদাদ বিমানবন্দরে ড্রোন হামলায় ইরানের প্রভাবশালী জেনারেল কাসেম সোলেইমানির মৃত্যু এই দুই দেশের শত্রুতাকে ব্যক্তিগত ও আদর্শিক লড়াইয়ে রূপ দেয়। ইরান এরপর সরাসরি ইরাকে মার্কিন ঘাঁটিতে মিসাইল হামলা চালিয়েছিল। সেই থেকে উভয় পক্ষই একে অপরকে লক্ষ্য করে পাল্টাপাল্টি হুমকি দিয়ে আসছে।
৪. হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ এবং ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক
৭ অক্টোবর ২০২৩-এ হামাসের ইসরায়েল আক্রমণের পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে পাল্টে গেছে। ইসরায়েল ও হামাসের এই লড়াইয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি ইসরায়েলকে সমর্থন দিচ্ছে। অন্যদিকে, ইরান সমর্থিত ‘অ্যাক্সিস অফ রেজিস্ট্যান্স’ (Axis of Resistance)—যাতে রয়েছে লেবাননের হিজবুল্লাহ, ইয়েমেনের হুথি এবং ইরাকের বিভিন্ন মিলিশিয়া গোষ্ঠী—সরাসরি ইসরায়েল ও মার্কিন স্বার্থের ওপর হামলা চালাচ্ছে।
লোহিত সাগরে হুথিদের জাহাজ আক্রমণ এবং জর্ডান বা সিরিয়ায় মার্কিন সেনাদের ওপর ড্রোণ হামলা ওয়াশিংটনকে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখে ঠেলে দিয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি এই প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোর ওপর বড় ধরনের হামলা চালায়, তবে ইরান সরাসরি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়।
৫. পরমাণু অস্ত্র: লাল রেখা অতিক্রম?
ইসরায়েল এবং মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর দাবি, ইরান এখন কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরমাণু বোমা তৈরির মতো জ্বালানি সংগ্রহ করতে সক্ষম। ইসরায়েল বারবার ঘোষণা দিয়েছে যে তারা ইরানকে পরমাণু শক্তিধর হতে দেবে না। যদি ইসরায়েল ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলা চালায়, তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বাধ্য হয়েই সেই যুদ্ধে যোগ দিতে হবে। এটিই বর্তমানে বিশ্ব শান্তির জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি।
৬. ইরান ও মার্কিন সামরিক শক্তির তুলনা
সরাসরি যুদ্ধ শুরু হলে শক্তির ভারসাম্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে। মার্কিন নৌবাহিনী এবং বিমানবাহিনী বিশ্বের শ্রেষ্ঠ। তবে ইরান কোনো দুর্বল প্রতিপক্ষ নয়। ইরানের রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় মিসাইল এবং ড্রোন ভাণ্ডার। মনে করা হচ্ছে, বিমান হামলা এবং সাইবার যুদ্ধের মাধ্যমে ইরানের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করতে পারে আমেরিকা। পাল্টা ইরান হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়া (যা বিশ্বের তেলের ২০% সরবরাহ করে), ইসরায়েল জুড়ে মিসাইল বৃষ্টি এবং ড্রোন হামলা এবং বিশ্বজুড়ে মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে হিজবুল্লাহর মতো গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে চোরাগোপ্তা হামলা চালানো হতে পারে।
৭. তেলের বাজারে অস্থিরতা ও বৈশ্বিক অর্থনীতি
যুদ্ধ শুরু হওয়া মানেই বিশ্ব অর্থনীতিতে ধস। হরমুজ প্রণালী দিয়ে প্রতিদিন যে পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়, তা বন্ধ হয়ে গেলে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ২০০ ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। ভারত, চীন এবং ইউরোপের মতো দেশগুলো যারা জ্বালানির জন্য মধ্যপ্রাচ্যের ওপর নির্ভরশীল, তারা ভয়াবহ সংকটে পড়বে।
৮. কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা কি শেষ?
বর্তমানে কাতার, ওমান এবং সুইজারল্যান্ডের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে কিছু আলোচনা চললেও তা খুব একটা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। ইরানের দাবি—আগে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে, আর আমেরিকার দাবি—আগে প্রক্সি হামলা বন্ধ এবং পরমাণু কর্মসূচি সীমাবদ্ধ করতে হবে। এই ‘ডেডলক’ পরিস্থিতিই যুদ্ধকে অনিবার্য করে তুলছে।
৯. যুদ্ধ কি অনিবার্য?
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান—কেউই এই মুহূর্তে একটি পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ চায় না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে ইউক্রেন এবং তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে ব্যস্ত। অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও বিক্ষোভ পরিস্থিতি তাদের বড় যুদ্ধে জড়ানোর পক্ষে অনুকূল নয়। কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যে একটি ছোট ভুল বা একটি বড় হামলা মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে নিয়ে যেতে পারে। যুদ্ধ হয়তো আগামীকালই শুরু হবে না, কিন্তু যুদ্ধের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়ার মতো পরিস্থিতিও নেই। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য একটি বারুদের স্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে একটি স্ফুলিঙ্গই দাবানল জ্বালিয়ে দিতে পারে।
