TOP NEWS

শারজিল ইমামের বন্দিত্বের ৬ বছর: গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ কি এখন ‘সন্ত্রাসবাদ’? আইনের প্যাচে এক মেধার অপচয়

(জেএনইউ-এর প্রাক্তন ছাত্রনেতা শারজিল ইমাম।)

ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: আজ ২৮ জানুয়ারি, ২০২৬। ভারতের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মোড়—নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) বিরোধী আন্দোলনের দীর্ঘ ছয় বছর পূর্ণ হলো। এই দিনটি একইসঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেয় জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ের (JNU) মেধাবী গবেষক শারজিল ইমামের কারাবাসের ছয় বছর পূর্ণ হল। ২০২০ সালের এই দিনে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং বিতর্কিত ইউএপিএ (UAPA) আইনের কঠোর ধারায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। সেই থেকে আজ পর্যন্ত তিনি দিল্লির তিহার জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিন কাটাচ্ছেন।

ছাত্র থেকে ‘প্রতিবাদী’: শারজিল ইমামের উত্থান

৩৬ বছর বয়সী শারজিল ইমাম বিহারের জাহানাবাদের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারের সন্তান। তাঁর শিক্ষাগত যোগ্যতা ঈর্ষণীয়—তিনি আইআইটি বোম্বে (IIT Bombay) থেকে স্নাতক এবং পরবর্তীতে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ করেছেন। এরপর ইতিহাসের প্রতি টানে তিনি জেএনইউ-তে আধুনিক ইতিহাস ও দর্শনে উচ্চশিক্ষার জন্য ভর্তি হন। মৌলানা আজাদ ন্যাশনাল ফেলোশিপ এবং নেট (NET) উত্তীর্ণ শারজিল একজন প্রথিতযশা লেখক এবং গবেষক হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

২০১৯ সালে যখন সিএএ (CAA) এবং এনআরসি (NRC)-র প্রতিবাদে সারা দেশ উত্তাল, তখন শারজিল ইমাম শাহীনবাগের ঐতিহাসিক শান্তিপূর্ণ অবস্থানের অন্যতম প্রধান চিন্তক বা আর্কিটেক্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। তবে তাঁর ‘চাক্কা জ্যাম’ বা রাস্তা অবরোধের ডাককে কেন্দ্র করে দিল্লি, উত্তরপ্রদেশ, অসমসহ পাঁচটি রাজ্যে তাঁর বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করা হয়। অভিযোগ ওঠে, তাঁর ভাষণ ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ এবং ‘উস্কানিমূলক’।

সিএএ ও এনআরসি: একটি বৈষম্যমূলক আইনের বিতর্ক

২০১৯ সালে পাস হওয়া নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনটি শুরু থেকেই সমালোচনার মুখে পড়েছিল। আফগানিস্তান, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে আসা অ-মুসলিম শরণার্থীদের দ্রুত নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হলেও, সচেতনভাবে মুসলিমদের এই তালিকার বাইরে রাখা হয়। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, এটি সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত সাম্য ও জীবনের অধিকারের সরাসরি লঙ্ঘন। এই প্রেক্ষাপটেই শারজিল ইমামের নেতৃত্বে আন্দোলন দানা বেঁধেছিল।

আইনি মারপ্যাঁচে শারজিল: জামিন ও জেলবন্দিত্বের খেলা

শারজিল ইমামের বিরুদ্ধে মোট ৮টি মামলা করা হয়েছিল। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এর মধ্যে রাষ্ট্রদ্রোহ এবং ইউএপিএ-র মতো গুরুতর মামলাসহ ৭টি মামলাতেই তিনি জামিন পেয়েছেন। বিভিন্ন আদালত তাদের পর্যবেক্ষণে স্পষ্ট জানিয়েছে, শারজিল তাঁর ভাষণে কোথাও সরাসরি হিংসার ডাক দেননি। কিন্তু ২০২০ সালের উত্তর-পূর্ব দিল্লি দাঙ্গার ষড়যন্ত্রের মামলায় (FIR 59/2020) তিনি আজও বন্দি। মজার ব্যাপার হলো, আলিগড় মুসলিম ইউনিভার্সিটিতে যে ভাষণের ভিত্তিতে তাঁকে ষড়যন্ত্রের মূল কারিগর বলা হচ্ছে, সেই ১৬ জানুয়ারির ভাষণের সময় বা ঠিক পরে কোনো হিংসার ঘটনা ঘটেনি। অথচ ইউএপিএ-র কঠোর ধারার কারণে কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ ছাড়াই তাঁর জামিন বছরের পর বছর আটকে রয়েছে।

মুক্তি বনাম বন্দিত্ব: বৈষম্যের অভিযোগ

সম্প্রতি গুলফিশা ফাতিমা, শিফা উর রহমান, মহম্মদ সেলিম খান এবং মীরান হায়দার—এই চারজন সহ-অভিযুক্ত ২,০০০ দিনেরও বেশি জেল খাটার পর মুক্তি পেয়েছেন। কিন্তু শারজিল ইমাম, উমর খালিদ, খালিদ সাইফিদের মতো সাতজনের জামিন আবেদন সুপ্রিম কোর্ট প্রত্যাখ্যান করেছে। আদালতের যুক্তি, এই অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ইউএপিএ-র অধীনে ‘প্রথম দৃষ্টিতে’ (prima facie) অভিযোগের সারবত্তা রয়েছে। এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন আইনি বিশেষজ্ঞ এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলো। শারজিলের ভাই মোজাম্মিল ইমাম এই রায়কে ‘স্বেচ্ছাচারী’ ও ‘প্রহসন’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, “একই মামলার সাতজন অভিযুক্তের মধ্যে যদি মাত্র দু-একজনের জামিন আটকে রাখা হয়, তবে ষড়যন্ত্রের ভিত্তি কোথায় থাকে?”

‘কারাগার আমার বিশ্বস্ত বন্ধু’: শারজিলের চিঠি

দু’বছর আগে জেল থেকে লেখা একটি চিঠিতে শারজিল ইমাম তাঁর মানসিক প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন। মির্জা গালিবের কবিতা উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছিলেন যে, রাজদ্রোহ বা দুর্নীতির অভিযোগে নয়, বরং শাহীনবাগের আন্দোলনের অংশ হওয়ার জন্য তাঁকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে—এটা তিনি জানতেন। কিন্তু দাঙ্গার এক মাস আগে গ্রেফতার হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে দাঙ্গার ‘সন্ত্রাসবাদী ষড়যন্ত্রকারী’ হিসেবে অভিযুক্ত করা হবে, এটা তাঁর কল্পনার বাইরে ছিল। তিনি লিখেছিলেন, “আমার একমাত্র বেদনা হলো আমার অসুস্থ ও বৃদ্ধা মা। ৯ বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর আমি আর আমার ছোট ভাই-ই তাঁর ভরসা। এর বাইরে, আমি আল্লাহর ওপর ভরসা করি এবং পড়াশোনায় সময় কাটাই। যতক্ষণ আমার কাছে ভালো বই আছে, বাইরের পৃথিবী আমাকে খুব একটা ভাবায় না।”

গণতান্ত্রিক অধিকার বনাম প্রশাসনিক দমননীতি

শারজিল ইমামের কারাবাস আজ ভারতের বিচারব্যবস্থার সামনে এক বড় প্রশ্নচিহ্ন। প্রতিবাদ করা বা রাস্তা অবরোধের ডাক দেওয়া কি ‘সন্ত্রাসবাদ’? শারজিলের মতে, বর্তমান প্রশাসন সংগঠিত প্রতিবাদকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করছে, যা গণতান্ত্রিক ভিন্নমত এবং সন্ত্রাসবাদের মধ্যে পার্থক্য মুছে দিচ্ছে।

২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার ইচ্ছা থাকলেও, আইনি জটিলতা এবং ‘রাজনৈতিক বন্দি’ হিসেবে প্রচারের সুযোগ না থাকায় তাঁকে মনোনয়ন থেকে সরে দাঁড়াতে হয়। ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও শারজিল ইমাম আজও অনেকের কাছে ভারতীয় রাজবন্দিদের প্রতীক এবং প্রতিবাদের কন্ঠস্বর দমনের উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কারান্তরালে বই পড়েই সময় কাটছে এই মেধাবী গবেষকের, অপেক্ষায় আছেন এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের। ফৈজ আহমেদ ফৈজের ভাষায় তিনি আজও মনে করেন— “দিল না-উমেদ তো নহি, নাকাম হি তো হ্যায়…” (হৃদয় আশাহীন নয়, কেবল আজ বিফল হয়েছে…)

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!