নিজস্ব সংবাদদাতা, বহরমপুর: মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনকে ঘিরে জেলাজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাম্প্রতিক গেজেট নোটিফিকেশনে ‘মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়’-এর পরিবর্তে ‘মুর্শিদাবাদ মহারাজা কৃষ্ণনাথ বিশ্ববিদ্যালয়, বহরমপুর’ নামকরণের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরেই তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে (এপিডিআর)-এর মুর্শিদাবাদ জেলা কমিটি। সংগঠনের অভিযোগ, এই নাম পরিবর্তন জেলার ঐতিহাসিক ও সামষ্টিক পরিচয়কে সংকুচিত করার পাশাপাশি ব্রিটিশ-ঘনিষ্ঠ জমিদারতান্ত্রিক ঐতিহ্যকে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা।
নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত ও এপিডিআর-এর দাবি
এপিডিআর জেলা কমিটির সম্পাদক রাহুল চক্রবর্তী এক প্রেস বিবৃতিতে জানিয়েছেন, ২০১৮ সালে ‘মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়’ গঠনের যে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল, তা বদলে দেওয়া গণমানুষের আকাঙ্ক্ষার বিরোধী। আমাদের তিন দফা দাবি হল— বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম ‘মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়’ই রাখতে হবে। নামের পাশাপাশি পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করতে হবে। কৃষনাথ কলেজ-কে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন পৃথক ঐতিহ্যবাহী কলেজ হিসেবেই উন্নয়ন করতে হবে।
শিক্ষাবঞ্চনার ইতিহাস ও আন্দোলনের প্রেক্ষাপট
প্রেস বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকা জেলা হিসেবে মুর্শিদাবাদবাসীর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি প্রবল ছিল। ২০১১ সালে বর্তমান রাজ্য সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দাবিতে জেলাজুড়ে আন্দোলন, সভা-মিছিল ও কনভেনশন হয়। তারই ফলস্বরূপ ২০১৮ সালে বহরমপুরে মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সংগঠনের অভিযোগ, বিশ্ববিদ্যালয়কে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে পরিকাঠামো, বিভাগ সম্প্রসারণ ও স্থায়ী শিক্ষক নিয়োগের মতো মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত থেকে গেছে।
কৃষ্ণনাথ নাম যুক্ত করার বিরোধিতা
এপিডিআর-এর বক্তব্য, কাশিমবাজার রাজপরিবারের সদস্য -এর নাম যুক্ত করা আসলে “ব্রিটিশ আনুগত্যে লালিত জমিদার ঐতিহ্যকে সামনে আনা”। সংগঠন দাবি করেছে, রাজপরিবারের উত্থান মূলত ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার ফল এবং ‘রাজা’ উপাধিও ছিল ব্রিটিশদের প্রদত্ত সম্মানসূচক খেতাব। তাই জেলার সর্বজনীন পরিচয়ের প্রতীক একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে এই নাম যুক্ত করা “আধুনিক মননশীল সিদ্ধান্ত নয়” বলেই তাদের মত।
বৃহত্তর রাজনৈতিক অভিযোগ
প্রেস বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের নির্বাচনকে সামনে রেখে রাজ্য সরকারের এই সিদ্ধান্ত “নরম হিন্দুত্ববাদী রাজনীতি”-র প্রতিফলন, যা আরএসএস-বিজেপির আদর্শকে শক্তিশালী করতে পারে। সংগঠনের মতে, মুর্শিদাবাদের ইতিহাসে ১৮৫৭-র বিদ্রোহ থেকে তেভাগা আন্দোলন ও সমকালীন গণআন্দোলন—সবকিছুই রয়েছে, কিন্তু সেই ঐতিহ্য উপেক্ষা করে ব্রিটিশ-ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিত্বকে সামনে আনা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
জেলার পরিচয় বনাম ব্যক্তিনির্ভর নামকরণ
এপিডিআর যুক্তি দিয়েছে, একটি জেলার নামে বিশ্ববিদ্যালয় থাকলে তা বৃহত্তর আঞ্চলিক ঐক্যের প্রতীক হয়। কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির নামে নামকরণ করলে সেই সর্বজনীনতা ক্ষুণ্ণ হয়। সংগঠনের মতে, ‘মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়’ নামটি জেলার সব মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য ও আপন ছিল, যা পরিবর্তনের ফলে সংকুচিত হতে পারে। সংগঠন আরও বলেছে, জেলার উচ্চশিক্ষার প্রকৃত সমস্যা—নতুন বিভাগ, উন্নত গবেষণাগার, শিক্ষক নিয়োগ—এসবের সমাধান না করে নাম পরিবর্তন “ভোট রাজনীতির কৌশল”। নাম বদলে শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন হবে না বলেই তাদের দাবি।
বিকল্প প্রস্তাব
এপিডিআর স্পষ্ট জানিয়েছে, কৃষ্ণনাথ কলেজের ঐতিহ্য অস্বীকার করা হচ্ছে না। কলেজকে তার নিজস্ব পরিচয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন রেখে উন্নয়নের পক্ষেই তারা। তবে যদি ভবিষ্যতে আলাদা নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গঠন করা হয়, তার নাম ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক -এর নামে করার প্রস্তাব দিয়েছে সংগঠন।
মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের সরকারি সিদ্ধান্ত ঘিরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা শিক্ষা, ইতিহাস ও রাজনীতির ত্রিমুখী প্রশ্নকে সামনে এনে দিয়েছে। জেলার মানুষ ও শিক্ষাজগতের বৃহত্তর অংশের মতামত না নিয়েই এই সিদ্ধান্ত হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। আপাতত এপিডিআর-এর এই প্রতিবাদ ভবিষ্যতে বৃহত্তর গণআন্দোলনে রূপ নেয় কি না, এখন সেটাই দেখার।
