
সুবিনয় দেব
মণিপুরের মতো জাতি দাঙ্গায় জ্বলছে আসামও। দুটি রাজ্যই বিজেপি শাসিত। দুই রাজ্যেই দাঙ্গায় ইন্ধনকারী বিজেপি। জাতি দাঙ্গার আগুনে ঘি ঢালার কাজটাও বিজেপি’রই। মণিপুরে বীরেন সিং ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী আর আসামে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। জাতি দাঙ্গা লাগিয়ে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারার কারণে মণিপুরে এখন রাষ্ট্রপতি শাসন। সেখানে কুকি ও মেইতেই এই দুই জাতির মধ্যে দাঙ্গা বাঁধিয়ে ফায়দা লুটতে চেয়েছিল বিজেপি। তা আর হলো না। কেন্দ্রের বিজেপি সরকার মণিপুরের বিজেপি সরকার হটিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করেছে। সরকার আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসলে দাঙ্গার আগুন নেভানো যেত। তা না করে আফম্পা জারি করে দমন-পীড়নের আশ্রয় নিয়েছিল। ফলে যা হবার তাই হলো। দাঙ্গার আগুন দ্বিগুণ তেজে জ্বলে উঠেছিল। ঠিক এমনটাই দেখা যাচ্ছে আসামের কার্বি আংলঙ জেলায়।
কার্বি আংলঙ জেলার অন্যতম শহর খেরোনিতে বিহারি ও নেপালিরা ভিলেজ গ্রজিং রিজার্ভ ও প্রোফেশনাল গ্রাজিং অর্থাৎ গোচারণ ভূমিতে বসবাস করে আসছিলেন দীর্ঘকাল ধরে। অভিযোগ উঠেছে, এই বিহারি ও নেপালিরা এই গোচারণ ভূমি বেদখল করে আছে। এনিয়ে ২০২৪-র ফেব্রুয়ারি মাসে স্থানীয় কার্বি ও হিন্দিভাষীদের মধ্যে বাঁধে গোষ্ঠীসংঘর্ষ। ঐ এলাকায় বসবাসকারী বিহারি ও নেপালিদের দাবি তারা সরকারি জমিতে বাস করছেন। তাদের কাছে জমির নথিপত্রও আছে বলে দাবি করেন। এই দুই গোষ্ঠীর মধ্যে বিরোধ বাঁধিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা তুলতে লেগে পড়ে বিজেপি। কার্বি স্বশাসিত পরিষদ নির্বাচনের আগে কার্বিদের সমর্থন পেতে প্রায় দুই হাজার বিহারি ও নেপালি পরিবারকে উচ্ছেদের নোটিশ দেয় অর্বিস্বশাসিত জেলা পরিষদ। সেই নোটিশের বিরুদ্ধে গুয়াহাটি হাইকোর্টে জনস্বার্থ মামলা করেন বিহারি ও নেপালি জনগণ।
অন্যদিকে কার্বিদের অভিযোগ, বিজেপি পরিচালিত স্বশাসিত পরিষদ নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে বিহারি ও নেপালিদের উচ্ছেদ করছে না। এনিয়ে কার্বি জনতা বিহারি ও নেপালিদের উচ্ছেদের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলেন। ১১ ডিসেম্বর থেকে তারা আমরণ অনশনেও বসেন। অনশন নিয়ে কোনো ধরনের মাথা ব্যথা নেই স্বশাসিত পরিষদের কর্মকর্তাদের। বসেননি কোনোরকম আলোচনায়ও। উলটো আন্দোলন ভাঙতে দমন-পীড়নের আশ্রয় নেয় সরকার। এতে আন্দোলন আরও তীব্র আকার নেয়। আন্দোলনকারীদের লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে পুলিশ। এতে করে আন্দোলন নতুন রূপ ধারণ করে। ক্ষিপ্ত কার্বি জনতা বিজেপি’র শীর্ষ নেতা তথা কার্বি স্বশাসিত পরিষদের মুখ্য নির্বাহী সদস্যের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। আগুন লাগানো হয় বি জেপি’র অপর নেতা তথা স্বশাসিত পরিষদের আরও এক সদস্যের বাড়িতে। ঘটনা হলো বিজেপি নেতা তথা স্বশাসিত পরিষদের মুখ্যনির্বাহী সদস্যের নেতৃত্বে বিজেপি নাকি লুটের রাজত্ব কায়েম করেছে এই অঞ্চলে। ঝর্বিপাহাড়ে কয়লা খাদান, জঙ্গল অকাতরে লুট চলছে। এই জেলার আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে সাড়ে পাঁচ হাজার বিঘা জমি আদানি ও বাজাজগ্রুপকে দিয়ে দিয়েছে হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সরকার। কার্বি জনতা রাজ্য সরকার ও বিজেপি পরিচালিত স্বশাসিত পরিষদের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তুলেছে। জনতার ক্ষোভ থেকে বাঁচতেই বিজেপি। কার্বি ও বিহারি-নেপালিদের মধ্যে বিরোধ। বাঁধানের ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র করে। এর ফল হয়েছে উলটো, ক্ষিপ্ত কার্বি জনতা বিজেপি’র দুই নেতা তথা স্বশাসিত পরিষদের মুখ্য নির্বাহী ও অপর সদস্যের বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। জাতি সংঘর্ষের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে। কার্বি পাহাড়ে অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতি। দফায় দফায় চলে সংঘর্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ গুলি চালালে। দু’জনের মৃত্যু হয়। প্রথমে ১৬৩ ধারা এবং পরে কারফিউ জারি করা হয়েছে।
জাতিগত বিরোধ বাঁধিয়ে বিজেপি যে আগুন নিয়ে খেলা করছে সেই আগুনে ছারখার আসামের কার্বি আংলঙ। প্রাণ বাঁচাতে মানুষ এখন এলাকা ছাড়ছেন। মূলত বিজেপি সরকারের স্বৈরাচারী ও দমনমূলক নীতির জন্যই রক্তাক্ত কার্বি। আংলঙ। কার্বি জনগণের মূল ক্ষোভের কারণ কার্বি। আদিবাসীদের উচ্ছেদ করে সেই জমি আদানি-বাজাজ গ্রুপের হাতে তুলে দেওয়া। এই পুঞ্জিভূত ক্ষোভথেকেই আজ কাৰ্বি আংলঙ জ্বলছে দাউ দাউ করে। আর তা মুখ্যত বিজেপি’র কর্পোরেট তোষণ, আদিবাসীদের উপর দমন-পীড়ন, শোষণ এবং জাতিগত বিভেদের আগুন নিয়ে সর্বনাশা খেলার পরিণাম। তুষের আগুনের মতো ধিকিধিকি জ্বলতে থাকা জাতি দাঙ্গার আগুন সহজে নির্বাপিত হয় না। বরং অন্যত্র তা ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
(মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত ও নিজস্ব। মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।)
