ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: দেশজুড়ে দুর্নীতির শিকড় যেভাবে ‘ক্যানসারের’ মতো ছড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করল সুপ্রিম কোর্ট। মঙ্গলবার একটি মামলার শুনানিতে শীর্ষ আদালতের বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন দেশের শিশু ও যুবসমাজের প্রতি এক নজিরবিহীন আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বাবা-মায়েরা যদি দুর্নীতির মাধ্যমে কোনো সম্পদ অর্জন করেন, তবে সন্তানদের উচিত সেই সম্পদের মোহ ত্যাগ করা।
দুর্নীতিদমন আইনের ১৭এ ধারা নিয়ে বিভক্ত রায়
২০১৮ সালে দুর্নীতিদমন আইনে যুক্ত করা ‘১৭এ’ (Section 17A) ধারার সাংবিধানিক বৈধতা নিয়ে এদিন রায় দিচ্ছিলেন বিচারপতি বি ভি নাগরত্ন এবং বিচারপতি কে ভি বিশ্বনাথনের ডিভিশন বেঞ্চ। এই ধারা অনুযায়ী, কোনো সরকারি আধিকারিকের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করার আগে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের আগাম অনুমতি নেওয়া বাধ্যতামূলক। এই আইনি রক্ষাকবচ নিয়ে দুই বিচারপতির মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হওয়ায় বিষয়টি এখন প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের কাছে পাঠানো হয়েছে, যাতে একটি বৃহত্তর বেঞ্চ এর চূড়ান্ত নিষ্পত্তি করতে পারে।
দুর্নীতিকে ‘ক্যানসার’ বললেন বিচারপতি
বিচারপতি নাগরত্ন তাঁর পর্যবেক্ষণে জানান, রাতারাতি ধনী হওয়ার এবং বিপুল সম্পত্তি দখলের এক অন্ধ উন্মাদনা মানুষের নৈতিক মানদণ্ড এবং সরকারি প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে ধস নামিয়েছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘ক্যানসারের বৃদ্ধি’র সঙ্গে তুলনা করেছেন। সুপ্রিম বিচারপতি বলেন, “এই দেশের যুবসমাজ ও শিশুদের উচিত বাবা-মা বা অভিভাবকদের জ্ঞাত আয়ের উৎসের বাইরে অর্জিত যেকোনো সম্পদ ত্যাগ করা। দুর্নীতির সেই সম্পদের সুবিধাভোগী হওয়ার পরিবর্তে তা প্রত্যাখ্যান করাই হবে সুশাসনের প্রতি এবং দেশের প্রতি তাদের শ্রেষ্ঠ সেবা।”
লোভ ও বস্তুবাদী মানসিকতাই মূল কারণ
দুর্নীতির নেপথ্যে মানুষের সীমাহীন লোভ এবং ঈর্ষাকে দায়ী করেছেন বিচারপতি নাগরত্ন। তিনি বলেন, বস্তুগত শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের এক অসুস্থ প্রতিযোগিতা থেকেই মানুষ অবৈধ পথে সম্পদ আহরণ করছে। তাঁর মতে, মানুষের মন থেকে লোভ ও হিংসা দূর করতে না পারলে প্রশাসন থেকে ঘুষ ও দুর্নীতি মোচন করা সম্ভব নয়। এর প্রতিকার হিসেবে আধ্যাত্মিক চেতনার বিকাশের ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। বিচারপতি বলেন, “ভোগবিলাসের প্রতি অনাসক্তি তৈরি করা এবং দেশসেবার ওপর মনোনিবেশ করাই এই প্রবণতা ঠেকানোর অন্যতম উপায়।”
মামলার প্রেক্ষাপট
২০১৮ সালের জুলাই মাসে কার্যকর হওয়া দুর্নীতিদমন আইনের ১৭এ ধারাটি সরকারি কর্মচারীদের একটি বিশেষ সুরক্ষা দেয়। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী আধিকারিকদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রক্রিয়া থমকে যায়। বিচারপতি নাগরত্ন এই ধারাটিকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে মনে করলেও ডিভিশন বেঞ্চে সহমত না হওয়ায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখন বৃহত্তর বেঞ্চের ওপর নির্ভর করছে।
