TOP NEWS

ভোটার তালিকায় নাগরিকত্ব যাচাইয়ের পূর্ণ ক্ষমতা কমিশনেরই: সুপ্রিম কোর্টে সাফ জানাল কমিশন

ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: ভোটার তালিকা তৈরি এবং নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনই চূড়ান্ত কর্তৃপক্ষ। কোনো ব্যক্তি যদি অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে সেই বিষয়ে কমিশনের অভিমত মেনে নেওয়া রাষ্ট্রপতির জন্য বাধ্যতামূলক। মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (SIR) সংক্রান্ত এক মামলার শুনানিতে এমনটাই জানাল জাতীয় নির্বাচন কমিশন (ইসিআই)। ইসি সাফ জানিয়েছে, নাগরিকত্ব ইস্যুতে কমিশনের অভিমত রাষ্ট্রপতিও উপেক্ষা করতে পারেন না।

SIR ও নাগরিকত্ব বিতর্ক

সম্প্রতি বিহারসহ বেশ কিছু রাজ্যে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর (SIR) প্রক্রিয়া করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে একগুচ্ছ আবেদন জমা পড়ে শীর্ষ আদালতে। আবেদনকারীদের দাবি ছিল, নাগরিকত্ব নির্ধারণের ক্ষমতা কমিশনের নেই এবং এই প্রক্রিয়া আসলে এনআরসি-র (NRC) সমান্তরাল একটি ব্যবস্থা।

কমিশনের যুক্তি: এটি এনআরসি নয়

মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চে নির্বাচন কমিশনের পক্ষে প্রবীণ আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী সওয়াল করেন। তিনি স্পষ্ট জানান, এসআইআর এবং এনআরসি এক নয়। তাঁর কথায়, “এনআরসি-তে দেশের সমস্ত নাগরিকের নাম অন্তর্ভুক্ত থাকে। কিন্তু ভোটার তালিকায় কেবল ১৮ বছরের ঊর্ধ্বে থাকা যোগ্য ভারতীয় নাগরিকরাই স্থান পান। সংবিধানের ৩২৬ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো বিদেশি ভোটার তালিকায় থাকতে পারেন না। তালিকায় ১০ জন বা হাজার জন বিদেশি থাকলেও তাঁদের বাদ দেওয়া আমাদের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা।”

ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়লে কি দেশত্যাগ করতে হবে?

নাগরিকত্ব নিয়ে তদন্তের জেরে আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই বলে আশ্বস্ত করেছে কমিশন। আইনজীবী দ্বিবেদী জানান, এসআইআর প্রক্রিয়ায় যদি কারও বিরুদ্ধে বিরূপ তথ্য পাওয়া যায়, তবে তার একমাত্র তাৎক্ষণিক পরিণতি হলো ভোটার তালিকা থেকে ওই ব্যক্তির নাম বাদ যাওয়া। তিনি বলেন, “ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটা যাওয়া মানেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে (Ipso facto) দেশ থেকে বহিষ্কার বা ডিপোর্টেশন নয়।” তবে প্রয়োজন মনে করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিষয়টি অধিকতর তদন্তের জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠানো হতে পারে।

রাষ্ট্রপতির ওপর কমিশনের সিদ্ধান্ত বাধ্যতামূলক

কমিশন আদালতের কাছে দাবি করে যে, জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫১-এর ১৪৬ নম্বর ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে একটি দেওয়ানি আদালতের সমতুল্য ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। কোনো ভোটারের নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন উঠলে কমিশন নিজস্ব তদন্ত চালাতে পারে। আইনজীবী বলেন, “যদি কেউ অন্য দেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করেন, তবে ভোটার তালিকার স্বার্থে কমিশন সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখে এবং কমিশনের অভিমত মেনে নেওয়া রাষ্ট্রপতির জন্য বাধ্যতামূলক।”

বিচারপতির পর্যবেক্ষণ ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

শুনানি চলাকালীন বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ভারতের নাগরিকত্ব আইনের বিবর্তন নিয়ে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, “আগে জন্ম এবং বাবা-মায়ের মধ্যে একজন ভারতীয় হলেই নাগরিকত্ব পাওয়া যেত। এখন জন্ম এবং বাবা-মা উভয়েরই ভারতীয় হওয়া বাধ্যতামূলক।” এর জবাবে রাকেশ দ্বিবেদী সংবিধানের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং ১৯৪৯ সালের গণপরিষদের বিতর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইনের আগে ভারত এক অন্তর্বর্তীকালীন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল।

বিচারপতি বাগচী আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন— নাগরিকত্বের বিষয়টি যখন কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে বিচারাধীন থাকবে, তখন কি কোনো ব্যক্তির ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া যায়? জবাবে কমিশন জানায়, এই বিধিনিষেধ কেবল ভোটার তালিকায় নাম থাকা বা না থাকার জন্য সীমিত থাকবে। ভারতে বসবাস বা বহিষ্কারের বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের এক্তিয়ারভুক্ত। আগামী বৃহস্পতিবার এই মামলার পরবর্তী শুনানি হওয়ার কথা রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!