ধর্ম নয়, মানবতাই বড় পরিচয়: গভীর রাতে ডোমকলে মুমূর্ষু হিন্দু মায়ের প্রাণ বাঁচাতে রক্ত দিলেন মুসলিম যুবক

নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: রক্তে নেই কোনও ধর্মের ভেদাভেদ, মানুষের শরীরের লাল রক্তে জাত-পাতের কোনও স্থান নেই— এই চিরন্তন সত্যকে আরও একবার প্রমাণ করল ডোমকল। যখন এক মুমূর্ষু হিন্দু মায়ের জীবন রক্তের অভাবে চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়েছিল, তখন গভীর রাতে দেবদূতের মতো ডোমকল ব্লাড ব্যাংকে ছুটে এলেন এক মুসলিম যুবক। কেবল মানবতার ডাকে সাড়া দিয়ে রক্তদান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করলেন সাজিদ হোসেন মণ্ডল।

জানা গিয়েছে, বিশুকা দাসী নামের এক মহিলা ডোমকল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ওই মহিলার অত্যন্ত জরুরি ও জটিল অস্ত্রোপচার হওয়ার কথা ছিল। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, অস্ত্রোপচার সফল করতে অবিলম্বে রক্তের প্রয়োজন। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন জায়গায় চেষ্টা করেও প্রয়োজনীয় রক্ত জোগাড় করতে ব্যর্থ হন। রক্তের অভাবে যখন অস্ত্রোপচার হওয়া নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং বৃদ্ধার জীবন বিপন্ন হতে বসে, তখন ছুটে আসেন জলঙ্গি থানার টিকরবাড়িয়া গ্রামের বাসিন্দা সাজিদ হোসেন মণ্ডল। তিনি ডোমকলের একটি স্বেচ্ছাসেবী সামাজিক সংগঠনের সক্রিয় সদস্য। রক্তদানের পর সাজিদ হোসেন জানান, “কারও জীবন বাঁচানোর চেয়ে বড় ধর্ম আর কিছু হতে পারে না। যখন শুনলাম একজন মায়ের অপারেশন রক্তের জন্য আটকে রয়েছে, তখন আমি আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। আমার রক্তে যদি একজন মানুষের প্রাণ বাঁচে, তবে একজন রক্তযোদ্ধা হিসেবে সেটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সার্থকতা।”

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সম্পাদক ফরিদ আনসারী বলেন, ঘড়িতে তখন রাত ১২টা। চারদিক নিস্তব্ধ। সেই গভীর রাতেই বাড়ি থেকে বাইক নিয়ে ডোমকল মহকুমা ব্লাড ব্যাংকের উদ্দেশ্যে রওনা দেন তিনি। ব্লাড ব্যাংকে পৌঁছেই সমস্ত নিয়মকানুন মেনে বিশুকা দাসীর জন্য রক্তদান করেন সাজিদ। তাঁর দেওয়া এই রক্তের ওপর ভর করেই পরদিন ওই মায়ের অস্ত্রোপচারের পথ সুগম হয়। তাঁর কথায়, “আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যেখানে চারিদিকে ধর্মের নামে বিভাজনের রাজনীতি চলে, সেখানে সাজিদ প্রমাণ করে দিল মানুষের আসল পরিচয় তার ধর্মে নয়, তার মানবতায়। এই লড়াইটাই আমাদের সংগঠন প্রতিনিয়ত লড়ে যাচ্ছে। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়ানোটাই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।”

বিশুকা দাসীর পরিবারের সদস্যরা সাজিদ এবং ওই সংগঠনের প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানিয়েছেন। তাঁরা বলেন, “আজ সাজিদ বাবু না থাকলে হয়তো আমাদের রোগীকে বাঁচানোই যেত না।” সাজিদ হোসেন মণ্ডলের এই মানবিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন সর্বস্তরের মানুষ। এই ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল— মানুষের চেয়ে বড় কিছু নেই, আর রক্তের কোনও রঙ বা ধর্ম নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!