ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ, থমকে জীবনের চাকা: ‘বেনাগরিক’ হওয়ার আতঙ্কে দিন কাটছে রফিকুলের
(রফিকুল সেখ। || Image: Daily Domkal)
কিবরিয়া আনসারী
ডোমকল: দিনমজুরির কাজ করেন। কখনও আবার ঝালমুড়ি বিক্রি করে সংসারের চুলা জ্বালান। প্রতিদিনের আয়ের ওপর নির্ভর করেই চলে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ছোট্ট সংসার। জীবনের সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল দু’বেলা খাবারের ব্যবস্থা করা। কিন্তু গত প্রায় ছয় মাসে সেই লড়াইয়ের চেয়েও বড় এক সংকট নেমে এসেছে তাঁর জীবনে। এখন তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—তিনি কি এই দেশের নাগরিক?
ডোমকল পুরসভার নতুনপাড়া মোল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা রফিকুল সেখের জীবন আজ যেন এক অনিশ্চয়তার দোলাচলে। বয়স ও অসুস্থতার কারণে শরীর আগের মতো আর সাড়া দেয় না। তবুও কাজ করে কোনো রকমে সংসার চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়ায় তাঁর নাম বাদ পড়ার পর থেকে বদলে গেছে সবকিছু। শুধু ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কাই নয়, নিজের দেশেই ‘বেনাগরিক’ বা অবৈধ ঘোষিত হয়ে যাওয়ার ভয় এখন প্রতিদিন তাঁকে তাড়া করে বেড়াচ্ছে।
রফিকুলের অভিযোগ, প্রশাসনিক জটিলতার এমন এক ঘূর্ণাবর্তে তিনি আটকে পড়েছেন, যার কারণ আজও তাঁর কাছে স্পষ্ট নয়। জানা গিয়েছে, তাঁর বাবাকে আরও ছয়জন ব্যক্তি তাঁদের বাবা হিসেবে দাবি করেছেন বলে এসআইআর প্রক্রিয়ায় প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁকে নোটিশ দেওয়া হয়। সেই নোটিশ পাওয়ার পর নিয়ম মেনে শুনানিতে হাজির হন তিনি। পরিবারের পরিচয়, বংশপরিচয় এবং নাগরিকত্বের দাবির সমর্থনে প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিপত্রও জমা দেন। কিন্তু সেই শুনানির পরও শেষ পর্যন্ত চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় তাঁর নাম রাখা হয়নি। শুধু রফিকুল নন, তাঁর ২৪ বছর বয়সী মেয়ে শিউলি খাতুনের নামও বাদ পড়ে যায়। পরিবারের দাবি, সমস্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার পরও কেন তাঁদের নাম বাদ দেওয়া হল, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা তাঁরা পাননি। রফিকুল সেখ বলেন, “২০০২ সালের ভোটার তালিকায় আমার মায়ের নাম রয়েছে। আমাদের পরিবারের সমস্ত নথিপত্র জমা দিয়েছি। তারপরও আমার আর মেয়ের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। এখন সবাই সন্দেহের চোখে দেখে। কেউ কেউ কটূক্তিও করে। কয়েক মাস ধরে শুধু অফিসে অফিসে ঘুরছি। মনে হচ্ছে বেঁচে থাকার জন্যই যুদ্ধ করতে হচ্ছে।”
তাঁর কণ্ঠে ক্ষোভের পাশাপাশি স্পষ্ট অসহায়তাও ফুটে ওঠে। তিনি জানান, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার পর তাঁর পরিবারের রেশন পরিষেবাও বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে সীমিত আয়ের সংসারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী সংগ্রহ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একদিকে কাজের অনিশ্চয়তা, অন্যদিকে সরকারি সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবারটি এখন চরম আর্থিক সংকটের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। রফিকুলের পরিবারের এক সদস্য বলেন, সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ায় হঠাৎ করেই তাঁর নাম বাদ পড়ে। অথচ বহু বছর ধরে তাঁরা একই এলাকায় বসবাস করছেন। স্থানীয়ভাবে সকলেই তাঁদের চেনেন। তবুও ঠিক কোন ভিত্তিতে তাঁর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তা এখনও পরিষ্কার নয়।
পরিবারের দাবি, নথিপত্রে সামান্য অসঙ্গতি কিংবা প্রশাসনিক বিভ্রান্তির কারণে বহু সাধারণ মানুষ আজ একই ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। রফিকুলও সেই পরিস্থিতির শিকার। প্রশাসনের এক দপ্তর থেকে অন্য দপ্তরে ঘুরেও তাঁরা কোনো নির্দিষ্ট সমাধানের পথ খুঁজে পাচ্ছেন না। রফিকুলের প্রতিবেশীরাও জানান, দীর্ঘদিন ধরে তিনি ওই এলাকার স্থায়ী বাসিন্দা। দিনমজুরি ও ছোটখাটো ব্যবসা করে কোনো রকমে সংসার চালান। তাঁকে নিয়ে আগে কখনও কোনো বিতর্ক ছিল না। কিন্তু ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর পরিস্থিতি বদলে গেছে। অনেকেই এখন প্রশ্ন তুলছেন তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে। এই সামাজিক সন্দেহ ও অপমানই রফিকুলকে সবচেয়ে বেশি মানসিকভাবে ভেঙে দিয়েছে।
স্থানীয়দের একাংশের মতে, ভোটার তালিকা সংশোধনের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় যদি প্রকৃত নাগরিকদের নামও বাদ পড়ে যায়, তাহলে তা শুধু প্রশাসনিক সমস্যা নয়, সামাজিক সংকটও তৈরি করে। কারণ ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার সঙ্গে সঙ্গে একজন মানুষের পরিচয়, সম্মান এবং সরকারি পরিষেবা পাওয়ার অধিকার—সবকিছুই প্রশ্নের মুখে পড়ে। রফিকুলের ক্ষেত্রে সেই বাস্তবতাই যেন আরও নির্মম হয়ে উঠেছে। বয়সের ভারে ন্যুব্জ শরীর নিয়ে প্রতিনিয়ত সরকারি দপ্তরে ছুটতে হচ্ছে তাঁকে। কখনও ব্লক অফিস, কখনও নির্বাচন সংক্রান্ত দপ্তর, আবার কখনও নথিপত্র সংগ্রহের জন্য অন্যত্র যেতে হচ্ছে। প্রতিটি যাত্রাই তাঁর কাছে বাড়তি অর্থব্যয়ের পাশাপাশি শারীরিক কষ্টের কারণ হয়ে উঠছে। মানবাধিকার কর্মী আব্দুল গনির কথায়, আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে যে সময়, অর্থ এবং মানসিক শক্তির প্রয়োজন, তা তাঁদের মতো দরিদ্র পরিবারের পক্ষে বহন করা অত্যন্ত কঠিন। প্রতিদিনের উপার্জন বন্ধ রেখে দপ্তরে দপ্তরে ঘোরার অর্থ, সেদিন পরিবারের খাবারের ব্যবস্থাও অনিশ্চিত হয়ে পড়া।
এই ঘটনার আরেকটি মানবিক দিক হলো মানসিক চাপ। রফিকুলের পরিবারের দাবি, গত কয়েক মাস ধরে তাঁরা কার্যত আতঙ্কের মধ্যে বসবাস করছেন। নিজের দেশেই ‘পরবাসী’ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তাঁদের প্রতিদিন তাড়া করে বেড়াচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার পর আত্মীয়-স্বজন ও পরিচিতদের নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। সামাজিক মর্যাদাও ধাক্কা খেয়েছে বলে তাঁদের অভিযোগ।
ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য প্রকৃত ভোটারদের তালিকা হালনাগাদ করা হলেও, রফিকুলের মতো প্রান্তিক মানুষের অভিযোগ—এই প্রক্রিয়ায় সামান্য প্রশাসনিক বিভ্রান্তি বা তথ্যগত অসঙ্গতির বোঝা তাঁদেরই বহন করতে হচ্ছে। আইন ও প্রশাসনের জটিলতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা না থাকায় তাঁরা আরও বেশি অসহায় হয়ে পড়ছেন। বর্তমানে রফিকুলের একটাই লক্ষ্য—আবার নিজের এবং মেয়ের নাম ভোটার তালিকায় ফিরিয়ে আনা। তাঁর বিশ্বাস, তিনি ভারতের বৈধ নাগরিক এবং প্রয়োজনীয় সমস্ত নথিও তাঁর কাছে রয়েছে। তবুও কেন এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, সেই প্রশ্নের উত্তর আজও তাঁর অজানা।
ডোমকলের এক প্রান্তিক মানুষের এই ঘটনা শুধু একটি পরিবারের দুর্ভোগের কথাই নয়; বরং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার জটিলতার মধ্যে পড়ে কীভাবে একজন সাধারণ নাগরিকের জীবন, জীবিকা, সামাজিক মর্যাদা এবং মানসিক শান্তি একসঙ্গে বিপন্ন হতে পারে, তারও একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি।
