নিজস্ব সংবাদদাতা, রানিনগর: ভোটার তালিকায় সংশোধনী বা এসআইআর (SIR) সংক্রান্ত কাজের পাহাড়প্রমাণ চাপ, আর তার ওপর নির্বাচন কমিশনের ঘনঘন নির্দেশ বদল— এই দুইয়ের যাঁতাকলে পিষ্ট মুর্শিদাবাদের বিএলও-রা। কমিশনের ‘তুঘলকি’ নির্দেশের প্রতিবাদে মঙ্গলবার রানিনগর-২ ব্লকের বিডিও-র কাছে স্মারকলিপি জমা দেন প্রায় ৬০ জন বুথ স্তরের আধিকারিক (বিএলও)। দাবি পূরণ না হলে একযোগে গণইস্তফা দেবেন বলে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন তাঁরা। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে ফের কমিশনের ভূমিকায় বড়সড় প্রশ্ন উঠেছে।
কেন ক্ষুব্ধ বিএলও-রা?
নির্বাচন কমিশনের অপরিকল্পিত এসআইআর প্রক্রিয়ার দিকেই আঙুল তুলেছেন বিএলও-রা। তাঁদের দাবি, কাজের কোনো নির্দিষ্ট নিয়ম বা সময়সূচি নেই। কখনও গভীর রাতে হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশ আসছে, তো কখনও ফোনের মাধ্যমে বদলে দেওয়া হচ্ছে আগের সিদ্ধান্ত। কাহারপাড়া বুথের বিএলও সফিউল ইসলাম নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, “১১ জানুয়ারি আমাকে ৯২টি নোটিশ দিয়ে ১৫ তারিখের মধ্যে কাজ শেষ করতে বলা হয়েছিল। কিন্তু ১২ তারিখ রাতে হঠাৎ জানানো হয় ১৪ তারিখের মধ্যেই সব শেষ করতে হবে। এভাবে বারবার কথা বদলালে আমরা ভোটারদের কাছে মুখ দেখাতে পারছি না। মানুষ আমাদের অপরাধী ভাবছেন এবং হুমকি দিচ্ছেন।”
‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ নাকি ভৌতিক পরিস্থিতি?
আন্দোলনকারী বিএলও-দের দাবি, ‘যৌক্তিক অসঙ্গতি’ বা ‘Logical Errors’ সংশোধনের নামে এক অদ্ভুত পরিস্থিতি তৈরি করা হয়েছে। তাঁদের বক্তব্য— ২০০২ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত যে নামের বাংলা বানান ঠিক ছিল, এআই (Artificial Intelligence) দিয়ে তা ইংরেজি করতে গিয়ে ব্যাপক ভুল করা হয়েছে। এখন সেই ভুল সংশোধনের দায় চাপানো হচ্ছে তাঁদের ওপর। বিএলও সফিকুল ইসলাম জানান, একেকটি ভোটারের বাড়িতে ১৫ থেকে ২০ বার পর্যন্ত যেতে হচ্ছে। কখনও বাবা-ছেলের বয়সের তফাত ১৫ বছর দেখানোর অজুহাতে, তো কখনও নামের ভুলের জন্য। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, তথ্যে কোনো ভুলই নেই, তাও বারবার ভেরিফিকেশনের নির্দেশ আসছে।
মানসিক অবসাদ ও নিরাপত্তার অভাব
এসআইআর-এর কাজে মানসিক অবসাদ ও নিরাপত্তার অভাব নিয়ে উদ্বেগপ্রকাশ করেছেন বিএলও ইমরান আলি। তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে অনেকেই বয়স্ক এবং অসুস্থ। এই তুঘলকি নির্দেশের চাপে কেউ যদি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে কোনো চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেন, তবে তার দায় কে নেবে?” নির্বাচন কমিশনের এই অব্যবস্থার ফলে ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের, যা অনেক সময় ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনের নিরাপত্তাকে বিঘ্নিত করছে।
প্রশাসনের ভূমিকা
বিএলও-দের স্মারকলিপি গ্রহণের পর রানিনগর-২ ব্লকের বিডিও কৃষ্ণ নির্মাল্য ভট্টাচার্য বলেন, “ওনারা মূলত কাজের চাপ ও সমস্যার কথা জানাতে এসেছিলেন। আমি তাঁদের আশ্বস্ত করেছি এবং শান্তভাবে কাজ করতে বলেছি। যে যে সমস্যার কথা ওনারা জানিয়েছেন, তা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।” এদিকে বর্তমানে বিএলও-দের এই গণইস্তফার হুঁশিয়ারিতে মুর্শিদাবাদ জেলা জুড়ে নির্বাচনী কাজের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে। এখন দেখার, কমিশন তাদের এই ‘এআই বিভ্রাট’ ও ‘অনিয়ম’ কাটিয়ে উঠতে কী ব্যবস্থা নেয়।
