
——————————————————————————-
ঝুমুর রায় চণ্ডালিকা
১. ভূমিকা: একটি রিপোর্ট, একটি ধস, একটি রাষ্ট্রীয় নীরবতা
হিন্ডেনবার্গ রিপোর্ট আর শুধু একটি আর্থিক নথি নয়; এটি ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থার নৈতিক অবস্থানের একটি আয়না। ২০২৩ সালে প্রথম রিপোর্ট প্রকাশের পর বলা হয়েছিল—এটি সাময়িক ধাক্কা, বাজার নিজেই সামলে নেবে। কিন্তু ২০২৬ সালে ফের একই রিপোর্ট, একই অভিযোগ, একই ধস—প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার বেশি বাজারমূল্য উধাও—এই যুক্তিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে। এটি দেখিয়ে দিয়েছে যে সমস্যাটি বাজারের নয়, সমস্যাটি কাঠামোগত।
২. আদানিকে বাঁচাতে ভারত শেষ হল
একটি গণতান্ত্রিক দেশে কোনো কর্পোরেট গোষ্ঠী সংকটে পড়লে তদন্ত হয়, জবাবদিহি হয়, আইন কাজ করে। কিন্তু ভারতের ক্ষেত্রে দেখা যায় উল্টো চিত্র। যখনই আদানি গোষ্ঠী সংকটে পড়ে, তখনই রাষ্ট্রীয় যন্ত্র নীরব হয়ে যায়। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো সক্রিয় না হয়ে নিষ্ক্রিয় দর্শকের ভূমিকা নেয়।
এখানে প্রশ্ন উঠছে— রাষ্ট্র কি একজন শিল্পপতির ঝুঁকি নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছে? যদি তাই হয়, তবে রাষ্ট্রীয় ক্ষতির দায় কে নেবে? আদানি গোষ্ঠীকে বাঁচাতে গিয়ে কার্যত ভারতের আর্থিক বিশ্বাসযোগ্যতা জলাঞ্জলি দেওয়া হয়েছে।
৩. এটি শুধু শেয়ারবাজার ধস নয়, এটি রাষ্ট্রীয় বিশ্বাসযোগ্যতার ধ্বস
শেয়ারবাজারে উত্থান-পতন স্বাভাবিক। কিন্তু যখন বারবার একই অভিযোগ সামনে আসে— ১) শেয়ার কারসাজি ২) অফশোর শেল কোম্পানির ব্যবহার ৩) অস্বচ্ছ হিসাব ৪) নিয়ন্ত্রক সংস্থার নিষ্ক্রিয়তা
তখন এটি বাজারের ঝুঁকি থাকে না, এটি রাষ্ট্রীয় নীতির প্রশ্ন হয়ে ওঠে। আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীরা টাকা তুলে নিচ্ছে, কারণ তারা দেখছে—এই দেশে নিয়ম সবার জন্য সমান নয়।ফলে ভারতের অর্থনীতি ধীরে ধীরে একটি বিশ্বাসহীন অর্থনীতিতে পরিণত হচ্ছে।
৪. গুটিকয়েক মানুষের হাতে ভারতের সব সম্পত্তি
আজ ভারতের বন্দর, বিমানবন্দর, বিদ্যুৎ, কয়লা, গ্যাস, পরিবহন—একটির পর একটি রাষ্ট্রীয় সম্পদ বেসরকারিকরণের নামে গুটিকয়েক কর্পোরেট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এটি মুক্ত বাজার নয়, এটি পরিকল্পিত কেন্দ্রিকরণ।
১৪০ কোটি মানুষের দেশের সম্পদ আজ এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে যেন এটি কয়েকজন ধনকুবেরের ব্যক্তিগত সম্পত্তি। এই ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ নেই, আছে শুধু ঝুঁকি।এটাই কর্পোরেট রাষ্ট্রের মূল বৈশিষ্ট্য।
৫. দেশ ডুবুক, তবুও ‘জয়শ্রী রাম’—এই রাজনীতির কাঠামো
যখনই প্রশ্ন ওঠে—
চাকরি কোথায়?
কৃষকের দাম কোথায়?
টাকার মান কেন পড়ছে?
তখন উত্তর আসে না অর্থনীতি থেকে। উত্তর আসে ধর্মীয় স্লোগান থেকে। ধর্মীয় আবেগকে ব্যবহার করে অর্থনৈতিক ব্যর্থতা ঢেকে ফেলা হয়।
এই রাজনীতিতে দেশ ডুবলেও সমস্যা নেই, যতক্ষণ মানুষ প্রশ্ন না করে। ধর্ম এখানে বিশ্বাস নয়, এটি একটি রাজনৈতিক ঢাল।
৬. হিন্দু–মুসলিম তাস: কর্পোরেট লুটের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র
যে সমাজ ধর্ম নিয়ে ব্যস্ত, সে সমাজ হিসাব চায় না। এই কারণেই অর্থনৈতিক সংকটের সময় হিন্দু–মুসলিম বিভাজন সবচেয়ে বেশি উস্কে দেওয়া হয়। বিভাজিত জনগণ কখনোই কর্পোরেট লুটের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে পারে না। এটি কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটি একটি পরীক্ষিত রাজনৈতিক কৌশল।
৭. সবকিছুর মূলে জাতপাত
ভারতের সামাজিক কাঠামো আজও বর্ণব্যবস্থার উত্তরাধিকার বহন করে। অর্থনৈতিক সুযোগ, শিক্ষা, চাকরি—সবকিছুতেই জন্মভিত্তিক বৈষম্য কাজ করে। কর্পোরেট পুঁজির সঙ্গে এই বর্ণভিত্তিক ক্ষমতার জোট শোষণকে আরও মজবুত করেছে।জাতপাত শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি একটি অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা।
৮. শূদ্র, দলিত ও আদিবাসী: সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত শ্রেণি
এই ব্যবস্থায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় শূদ্র, দলিত ও আদিবাসী জনগোষ্ঠী। কারণ তাদের কাছে পুঁজি নেই, ক্ষমতা নেই, মিডিয়া নেই। তাদের শ্রম নেওয়া হয়, কিন্তু তাদের স্বার্থ রক্ষা করা হয় না।এই রাষ্ট্র তাদের কণ্ঠস্বরকে পরিকল্পিতভাবে প্রান্তে ঠেলে দেয়।
৯. কৃষক: রাষ্ট্রের হিসাবের বাইরের মানুষ
ভারতের কৃষক আজ রাষ্ট্রের কাছে অদৃশ্য। প্রতিদিন কৃষক আত্মহত্যা করলেও শেয়ারবাজার বন্ধ হয় না। MSP নিয়ে আন্দোলন করলে কৃষককে দেশদ্রোহী বলা হয়, কিন্তু কর্পোরেট ঋণ মকুব হলে সেটিকে অর্থনৈতিক সংস্কার বলা হয়।এই দ্বিচারিতা প্রমাণ করে—এই রাষ্ট্র কৃষকের নয়।
১০. প্রান্তিক জনগোষ্ঠী ও উন্নয়নের মিথ
উন্নয়নের নামে আদিবাসীর জমি নেওয়া হয়, বন কাটা হয়, মানুষ উচ্ছেদ হয়। বলা হয়—দেশ এগোচ্ছে। কিন্তু এই উন্নয়নের লাভ যায় কর্পোরেটের ঘরে, আর ক্ষতি বহন করে প্রান্তিক মানুষ।এটি উন্নয়ন নয়, এটি শোষণের পুনর্বিন্যাস।
১১. নিয়ন্ত্রক সংস্থার নীরবতা
একটি রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা SEBI, RBI, ED—এই সংস্থাগুলোর কাজ ছিল জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, তারা কর্পোরেট স্বার্থের সামনে নীরব।এই নীরবতা কোনো ভুল নয়, এটি একটি কাঠামোগত ব্যর্থতা।
১২. গণতন্ত্র থেকে কর্পোরেট রাষ্ট্রে রূপান্তর
গণতন্ত্র মানে প্রশ্ন করার অধিকার। কিন্তু আজ প্রশ্ন করলেই দেশদ্রোহীর তকমা দেওয়া হয়। কর্পোরেট সমালোচনা মানেই রাষ্ট্রবিরোধিতা—এই ধারণা গণতন্ত্রের মৃত্যু নির্দেশ করে।ভারত ধীরে ধীরে একটি কর্পোরেট রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে।
১৩. হিন্ডেনবার্গ রিপোর্ট
শত্রু নয়, সতর্ক সংকেত হিন্ডেনবার্গ কোনো বিদেশি ষড়যন্ত্র নয়। এটি একটি সতর্ক সংকেত—যে সংকেত বলছে, এই পথ চলতে থাকলে ভারতের অর্থনীতি, সমাজ ও গণতন্ত্র একসঙ্গে ভেঙে পড়বে।
এখন,প্রশ্ন একটাই—ভারত কার?
এই প্রতিবেদন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে নয়। এটি একটি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে। প্রশ্নটি সহজ— ভারত কি জনগণের দেশ, না গুটিকয়েক কর্পোরেটের সম্পত্তি? এই প্রশ্নের উত্তর না দিলে, পরবর্তী ধস শুধু শেয়ারবাজারে নয়—সমাজের ভিতরেও নেমে আসবে।
(সংগৃহীত)
