
——————————————————————————-
ইরফান সাদিক
মাদ্রাসা নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষের মধ্যে অকারণ গা-ঘিনঘিন ভাব আজ নতুন নয়। দুঃখজনক হলেও সত্য, এই তালিকায় কিছু স্বঘোষিত মুসলিম বুদ্ধিজীবীর নামও যুক্ত হয়েছে। তারা হয়তো আধুনিকতার দোহাই দেন, কিন্তু বাস্তব সমাজ, সংবিধান এবং শিক্ষার মৌলিক দর্শনকে উপেক্ষা করেই মাদ্রাসাকে একরকম ‘অপ্রয়োজনীয় বোঝা’ হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অবিবেচক নয়, সামাজিক দায়িত্বজ্ঞানহীনও।
প্রথমেই, পরিষ্কার করা দরকার, মাদ্রাসা মোটামুটি দুই ধরনের।
এক, খারিজী বা স্বশাসিত মাদ্রাসা। যেখানে কুরআন, হাদিস, ফিকাহ, আরবি ভাষা মুখ্য বিষয় হলেও বহু মাদ্রাসায় আধুনিক বিষয় যেমন গণিত, ইংরেজি, বিজ্ঞানও পড়ানো হয়। দারুল উলুম দেওবন্দ, দারুল উলুম নাদওয়াতুল উলামা থেকে শুরু করে ছোট-বড় মিলিয়ে ভারতে প্রায় ৩০ হাজারের বেশি রেজিস্টার্ড খারিজী মাদ্রাসা রয়েছে, এর বাইরে অসংখ্য অনিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানও আছে।
দুই, সরকারি ও সরকার-পোষিত মাদ্রাসা। পশ্চিমবঙ্গে সিনিয়র মাদ্রাসা, জুনিয়র মাদ্রাসা, হাই মাদ্রাসা, এমএসকে এবং এডেড মাদ্রাসাগুলি রাজ্য সরকারের স্বীকৃত। এখানে পশ্চিমবঙ্গ বোর্ড অফ মাদ্রাসা এডুকেশনের অধীনে বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ভৌত বিজ্ঞান, জীবন বিজ্ঞান, ইতিহাস, ভূগোলের পাশাপাশি আরবি সাহিত্য, ইসলামি শিক্ষা, হাদিস ও ফিকাহ পড়ানো হয়।
এবার আসি মাদ্রাসার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে। বাস্তবতা হলো, মাদ্রাসায় পড়াশোনা করে মূলত দুই ধরনের শিক্ষার্থী। একাংশ মধ্যবিত্ত বা সম্ভ্রান্ত পরিবারের, কিন্তু বড় অংশই আর্থিকভাবে পিছিয়ে পড়া পরিবারের সন্তান। যাদের জন্য বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করা প্রায় অসম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীণ এলাকায় আজও প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দারিদ্র্য ও অনিশ্চিত জীবনের সঙ্গে যুক্ত। সেখানে মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়, সামাজিক নিরাপত্তার শেষ আশ্রয়।
মাদ্রাসায় যে ইসলামি নৈতিক মূল্যবোধ শেখানো হয়, তার একটি অংশ যদি সাধারণ শিক্ষা ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা যেত, তবে আধুনিক শিক্ষার পাশাপাশি শিষ্টাচার, পারিবারিক দায়িত্ববোধ, সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা ও মানবিকতা আরও দৃঢ় হতো। তবে এটাও সত্য, অনেক সরকারি মাদ্রাসায় জেনারেল বিষয়ের ভিত দুর্বল। এর পেছনে প্রধান কারণ হলো শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরের দুর্বলতা, শিক্ষক সংকট, অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক উদাসীনতা। কিন্তু এই সীমাবদ্ধতা মাদ্রাসা বন্ধের যুক্তি হতে পারে না, বরং সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা আরও জোরালো করে।
যে রাজ্যে একের পর এক সরকারি স্কুল বন্ধ হচ্ছে বা একীভূত করা হচ্ছে, সেখানে সরকারি মাদ্রাসাও একই বিপদের মুখে। অথচ মাদ্রাসা সংবিধান স্বীকৃত শিক্ষা ব্যবস্থা। সংবিধানের ৩০ নম্বর অনুচ্ছেদ সংখ্যালঘুদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার নিশ্চিত করেছে। সেই অধিকারকে দুর্বল করা মানে সংবিধানকেই প্রশ্নের মুখে ফেলা। সবচেয়ে মারাত্মক এবং বিষাক্ত মিথ্যা অভিযোগ হলো, “মাদ্রাসায় জঙ্গি বা সন্ত্রাসবাদ শেখানো হয়।” এই অভিযোগের পক্ষে আজ পর্যন্ত কোনও আদালত-স্বীকৃত প্রমাণ নেই। পশ্চিমবঙ্গের মাদ্রাসাগুলিতে পাঠ্যক্রম সরকার অনুমোদিত, শিক্ষক নিয়োগ সরকারী নিয়মে হয়, পাঠ্যপুস্তক বোর্ড অনুমোদিত। তাহলে সন্ত্রাসবাদ শেখানোর সুযোগ কোথায়? বাস্তবে এই অভিযোগ একটি উগ্র ডানপন্থী রাজনৈতিক হাতিয়ার, যা এখন কিছু মানুষের নিত্যদিনের বিদ্বেষী ভাষায় পরিণত হয়েছে। এই বিদ্বেষ শুধু মাদ্রাসাকে নয়, সামাজিক ভ্রাতৃত্বকেও গভীর সংকটে ফেলছে।
আজ মাদ্রাসার নিয়ন্ত্রণ কিছু তথাকথিত মুসলিম প্রতিনিধির হাতে চলে যাওয়ায় প্রশ্ন তোলাও জরুরি। কিন্তু মাদ্রাসার অস্তিত্বই যদি না থাকে, তবে তার কুফল ভোগ করবে হাজার হাজার দরিদ্র পরিবার। হয়তো ডিগ্রিধারী শিক্ষিত মানুষ বাড়বে, কিন্তু মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের বেহেশত, বৃদ্ধ বাবা-মার দায়িত্ব সন্তানের এই মানবিক শিক্ষায় গড়ে ওঠা সুশিক্ষিত নাগরিকদের আমরা হারাবো। মাদ্রাসা বন্ধের হাততালি দেওয়া মানে নিজের সমাজের ভবিষ্যতের গালে চড় মারা। দরকার বিদ্বেষ নয়, দরকার সংস্কার, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আলোচনা। মাদ্রাসা সমস্যার উৎস নয়, বরং অবহেলা আর রাজনৈতিক অসৎ উদ্দেশ্যই আজকের আসল সমস্যা।
(সামাজিক মাধ্যম থেকে সংগৃহীত)
