ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের নতুন রাজ্যপাল হিসেবে বৃহস্পতিবার সকালে শপথ নিলেন আর এন রবি। কলকাতার রাজ ভবনে অনুষ্ঠিত এক সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠানে তিনি রাজ্যের ২২তম রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এদিন শপথবাক্য পাঠ করান কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি সুজয় পাল। শপথগ্রহন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এছাড়াও ছিলেন বিধানসভার স্পিকার বিমান ব্যানার্জী, রাজ্যের মন্ত্রী ও কলকাতার মেয়র ফিরহাদ হাকিম এবং বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান বিমান বসু, রাজ্যের মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী-সহ একাধিক শীর্ষ আমলা ও পুলিশ আধিকারিক। তবে অনুষ্ঠানে বিজেপির কোনও নেতাকে দেখা যায়নি।
উল্লেখ্য, গত ৫ মার্চ প্রাক্তন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস পদত্যাগ করার পর কেন্দ্র সরকার আর. এন. রবিকে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে নিয়োগ করে। এর আগে তিনি নাগাল্যাণ্ড, মেঘালয় এবং তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল
তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল থাকাকালীন আর. এন. রবির কার্যকালের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য ছিল জনসংযোগ বাড়ানো। প্রচলিত দূরত্ব বজায় রাখার পরিবর্তে তিনি রাজভবনকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষের জন্য আরও উন্মুক্ত করার উদ্যোগ নেন। এই সময়ে তিনি এক লক্ষেরও বেশি ছাত্র-ছাত্রীকে সরাসরি সম্বোধন করেন এবং জাতি গঠনে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকার উপর জোর দেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাবর্তনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রায় ৫০ হাজার সনদপত্র বিতরণ করেন। রাজভবনে তিনি এই উদ্দেশ্যে ২৪টি বিশেষ অধিবেশনও আয়োজন করেন।
আইপিএস থেকে রাজ্যপাল
১৯৫২ সালে বিহারের পাটনায় জন্মগ্রহণ করেন আর এন রবি। ১৯৭৪ সালে পদার্থবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করার পর ১৯৭৬ সালে তিনি আইপিএস পদে যোগ দেন। কর্মজীবনে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থায় (সিবিআই) কাজ করার পাশাপাশি সংগঠিত অপরাধ চক্রের বিরুদ্ধে একাধিক দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে নেতৃত্ব দেন। পরে গোয়েন্দা ব্যুরোতেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
তাঁর কর্মজীবনের বড় অংশ কেটেছে সন্ত্রাসবাদ ও বিদ্রোহপ্রবণ এলাকায়। বিশেষ করে জম্মু ও কাশ্মীর, উত্তর-পূর্ব ভারত এবং মাওবাদী প্রভাবিত অঞ্চলে তিনি দায়িত্ব পালন করেন। দক্ষিণ এশিয়ায় মানব অভিবাসনের গতিবিধি এবং সীমান্তবর্তী জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সমাজতত্ত্ব নিয়েও তিনি দীর্ঘদিন গবেষণা করেছেন।
সংঘাত সমাধানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
জাতিগত বিদ্রোহে আক্রান্ত বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত নিরসনে আর. এন. রবির ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তিনি একাধিক সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনকে মূলধারায় ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আন্তর্জাতিক স্তরে সন্ত্রাসবিরোধী সহযোগিতা ও গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও ভারতের নীতিনির্ধারণে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। সরকারি চাকরি থেকে ২০১২ সালে অবসর নেওয়ার পর তিনি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে নিয়মিত কলাম লিখতেন।
নাগা শান্তি আলোচনায় কেন্দ্রের দূত
২০১৪ সালের আগস্টে কেন্দ্র সরকার তাকে নাগা শান্তি আলোচনার জন্য বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ করে। এই দায়িত্বে থেকে তিনি আলোচনার প্রক্রিয়ায় বড় পরিবর্তন আনেন। আলোচনাকে বিদেশভিত্তিক পরিসর থেকে সরিয়ে স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করে তোলেন। এর ফলে দীর্ঘ সাত দশকের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনের অবসান ঘটাতে বিভিন্ন বিদ্রোহী গোষ্ঠী ভারতের সংবিধানের আওতায় সমঝোতার পথে এগিয়ে আসে। ২০১৮ সালের অক্টোবরে তিনি দেশের উপ জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৯ সালের ১ আগস্ট থেকে ২০২১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিনি নাগাল্যান্ডের রাজ্যপাল ছিলেন। এরপর ২০২১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর তামিলনাড়ুর ২৬তম রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে তিনি রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধানের ভূমিকা পালন করবেন।
