ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ভারত ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের আবহে ফের একবার অস্বস্তি তৈরি করল ধর্মীয় স্বাধীনতা সংক্রান্ত মার্কিন কেন্দ্রীয় কমিশনের (USCIRF) বার্ষিক রিপোর্ট। ২০২৬ সালের জন্য প্রকাশিত এই রিপোর্টে ভারতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং ধর্মীয় স্বাধীনতার পরিস্থিতি “অত্যন্ত উদ্বেগজনক” বলে দাবি করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস উইং (R&AW) এবং রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (RSS) মতো সংগঠনের ওপর “টার্গেটেড স্যাংশন” বা লক্ষ্যভিত্তিক নিষেধাজ্ঞা জারির সুপারিশও করেছে এই কমিশন। ভারত সরকার সোমবার এই রিপোর্টকে কঠোর ভাষায় প্রত্যাখ্যান করেছে। বিদেশ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে, এই রিপোর্ট সম্পূর্ণ “উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট”।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক কমিশন (USCIRF) একটি স্বাধীন ও দ্বিপাক্ষিক ফেডারেল সংস্থা। ২০২৬ সালের রিপোর্টে তারা ভারতকে ‘কান্ট্রি অফ পার্টিকুলার কনসার্ন’ বা বিশেষ উদ্বেগের দেশ (CPC) হিসেবে তালিকাভুক্ত করার জন্য মার্কিন সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে।
মার্কিন রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভারতের আরঅ্যান্ডএডাব্লিউ (R&AW) এবং আরএসএস (RSS)-এর মতো সংস্থাগুলো ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনায় পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জড়িত। তাই এই সংস্থাগুলোর পদাধিকারীদের সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা এবং তাদের আমেরিকায় প্রবেশ নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন ভবিষ্যতে নয়াদিল্লিকে যে নিরাপত্তা সহায়তা বা দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য সুবিধা দেবে, তা ভারতের ধর্মীয় স্বাধীনতার উন্নতির সাথে যুক্ত করা উচিত। অর্থাৎ, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে এই সুবিধাগুলো বন্ধ করার ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। ২০২৫ সালে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ধর্মান্তর বিরোধী আইন আরও কঠোর করা হয়েছে বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়া সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপাসনালয় লক্ষ্য করে সরকারি পদক্ষেপ এবং মুসলিম ও খ্রিস্টান শরণার্থীদের ওপর কড়াকড়ির অভিযোগ আনা হয়েছে।
রিপোর্টে ২০২৫ সালের ২২ এপ্রিল জম্মু ও কাশ্মীরের পাহলগামে পর্যটকদের ওপর হওয়া ভয়াবহ জঙ্গি হামলার উল্লেখ রয়েছে। লস্কর-ই-তৈবার শাখা সংগঠন ‘দ্য রেজিস্ট্যান্স ফ্রন্ট’ এই হামলা চালায় যাতে ২৬ জন পর্যটক নিহত হন। রিপোর্ট অনুযায়ী, বন্দুকধারীরা পর্যটকদের ‘কালমা’ পড়তে বলে এবং যারা তা পারেনি তাদের হত্যা করা হয়। এই ঘটনার পর ভারতে মুসলিম বিরোধী মনোভাব তীব্র হয়েছে বলে দাবি করেছে ইউএসসিআইআরএফ।
ভারতের কড়া প্রতিক্রিয়া: “আয়নায় মুখ দেখুন”
বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল সোমবার এক সাংবাদিক সম্মেলনে ইউএসসিআইআরএফ-এর এই রিপোর্টকে সরাসরি খারিজ করেছেন। জয়সওয়াল বলেন, “আমরা ইউএসসিআইআরএফ-এর সাম্প্রতিক রিপোর্টটি দেখেছি। আমরা এর উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং পক্ষপাতদুষ্ট চরিত্রায়নকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করছি।” তিনি আরও যোগ করেন, গত কয়েক বছর ধরে এই কমিশন বস্তুনিষ্ঠ তথ্যের বদলে প্রশ্নবিদ্ধ উৎস এবং বিশেষ আদর্শগত বয়ানের ওপর ভিত্তি করে ভারতের একটি বিকৃত ছবি তুলে ধরছে। এতে কমিশনের নিজস্ব বিশ্বাসযোগ্যতাই নষ্ট হচ্ছে।
নয়াদিল্লি পাল্টা আক্রমণ শানিয়ে বলেছে, ভারতের সমালোচনা করার আগে ইউএসসিআইআরএফ-এর উচিত আমেরিকার ভেতরে হিন্দু মন্দিরের ওপর ক্রমবর্ধমান হামলা এবং ভাঙচুরের ঘটনার দিকে নজর দেওয়া। জয়সওয়াল বলেন, “আমেরিকায় ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের ওপর ভীতি প্রদর্শন এবং ক্রমবর্ধমান অসহিষ্ণুতা নিয়ে কমিশনের উদ্বিগ্ন হওয়া উচিত।” রিপোর্টে ভারতের বিরুদ্ধে বিদেশে (বিশেষত আমেরিকায়) সংখ্যালঘুদের ওপর দমনপীড়ন চালানোর যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাকে ভারত “ভিত্তিহীন” বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর প্রভাব
ইউএসসিআইআরএফ-এর চেয়ারপারসন ভিকি হার্টজলার এক বিবৃতিতে বলেন, “চীন গির্জার সদস্যদের গ্রেফতার করছে, ভারত ও পাকিস্তানে গণপিটুনির ঘটনা বাড়ছে, বার্মায় উপাসনালয়ে বোমা মারা হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য হলো বিশ্বজুড়ে ধর্মীয় স্বাধীনতা সুনিশ্চিত করা।”
তবে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউএসসিআইআরএফ-এর সুপারিশ মার্কিন বিদেশ দপ্তরের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। অতীতেও বহুবার এই কমিশন ভারতকে ‘সিপিসি’ তালিকায় রাখার সুপারিশ করলেও বাইডেন বা ট্রাম্প প্রশাসন কৌশলগত কারণে তা কার্যকর করেনি। ভারত বর্তমানে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে আমেরিকার অন্যতম প্রধান প্রতিরক্ষা সহযোগী। ফলে আরঅ্যান্ডএডাব্লিউ বা আরএসএস-এর ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির মতো চরম পদক্ষেপ নেওয়া ওয়াশিংটনের পক্ষে কঠিন হতে পারে।
ভারতের ধর্মীয় জনতাত্ত্বিক পরিসংখ্যান এবং আইনি বিতর্ক
ইউএসসিআইআরএফ তাদের রিপোর্টে যে দাবিগুলো করেছে, তার বিপরীতে ভারতের জনতাত্ত্বিক ও আইনি প্রেক্ষাপটটি বোঝা জরুরি। রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, ভারতে উত্তরপ্রদেশ, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের মতো রাজ্যে বলপূর্বক ধর্মান্তর রুখতে যে আইন আনা হয়েছে, তাকেই ইউএসসিআইআরএফ “সংখ্যালঘু বিরোধী” হিসেবে দেখছে। অন্যদিকে, ভারত সরকারের দাবি এই আইনগুলো সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং প্রতারণার মাধ্যমে ধর্মান্তর রুখতে প্রয়োজনীয়।
রিপোর্টিতে পাহলগাম হামলার বর্ণনা যেভাবে দেওয়া হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। লস্কর-ই-তৈবার মতো পাকিস্তানি মদতপুষ্ট জঙ্গি সংগঠনের নারকীয় হত্যাকাণ্ডকে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধের কারণ হিসেবে দেখালেও, ভারতের অভ্যন্তরীণ সাম্প্রদায়িক উত্তেজনার জন্য কেবল সরকারকে দায়ী করা হয়েছে বলে মনে করছে নয়াদিল্লি। মার্কিন কমিশনের এই রিপোর্ট এমন এক সময়ে এল যখন ভারত ও আমেরিকা প্রযুক্তি (iCET), মহাকাশ গবেষণা এবং প্রতিরক্ষা উৎপাদনে রেকর্ড স্তরের সহযোগিতা করছে। রণধীর জয়সোয়ালের বয়ানে স্পষ্ট যে, ভারত এখন আর এই ধরণের একতরফা রিপোর্টের চাপে নতি স্বীকার করতে রাজি নয়। বরং আমেরিকার নিজস্ব মানবাধিকার রেকর্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলে নয়াদিল্লি বুঝিয়ে দিয়েছে যে, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে।
পরিশেষে, ইউএসসিআইআরএফ-এর ২০২৬ সালের বার্ষিক রিপোর্ট ভারত-মার্কিন সম্পর্কের চিরচেনা এক অস্বস্তিকে পুনরায় সামনে নিয়ে এল। একদিকে আমেরিকা ভারতকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্র হিসেবে বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে তাদেরই একটি সরকারি কমিশন ভারতের গণতান্ত্রিক কাঠামো এবং ধর্মীয় সহনশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। এখন দেখার বিষয়, হোয়াইট হাউস এবং মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট এই স্বাধীন কমিশনের সুপারিশগুলোকে কতটা গুরুত্ব দেয়, নাকি ভারতের সাথে ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অংশীদারিত্বকে প্রাধান্য দিয়ে এই রিপোর্টকে ঠান্ডা ঘরে পাঠিয়ে দেয়।
