সন্দেহের বশে ২২ বছর কারাবাস: নির্দোষ অর্জুন জানিকে খালাস দিলো সুপ্রিম কোর্ট
ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: কোনো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ ছাড়া স্রেফ সন্দেহের বশে একজন মানুষকে জীবনের ২২টি বছর কারান্তরালে কাটাতে হলো—ওড়িশার একটি জোড়া হত্যা মামলার চূড়ান্ত রায়ে এমনটাই পর্যবেক্ষণ দেশের শীর্ষ আদালতের। ২০০৪ সালের এক নারী হত্যা মামলায় অভিযুক্ত অর্জুন জানি নামের এক ব্যক্তিকে খালাস দিয়ে সুপ্রিম কোর্ট স্পষ্ট জানিয়েছে, প্রমাণের অভাব এবং পুলিশের চরম গাফিলতির কারণে একজন নির্দোষ মানুষের জীবন থেকে মূল্যবান ২২টি বছর হারিয়ে গেছে। বিচারপতি এস কে সিং, বিচারপতি জে বি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি কে বিনোদ চন্দ্রনের সমন্বয়ে গঠিত তিন বিচারপতির বেঞ্চ ওড়িশার নিম্ন আদালতের দেওয়া সাজা বাতিল করে এই রায় ঘোষণা করেন।
রায়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে শীর্ষ আদালত পর্যবেক্ষণ করেছে যে:
“কেবলমাত্র সন্দেহের ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা, তৃতীয় ডিগ্রির শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে জবানবন্দি আদায় করা এবং তার ওপর ভিত্তি করে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা ন্যায়বিচারের মূল নীতির সম্পূর্ণ পরিপন্থী।” ২০০৪ সালে ওড়িশার কোরাপুট জেলায় কমলা, সোনবাড়ি ও রত্নাই নামের তিন নারীর নির্মম হত্যাকাণ্ড ঘটে। প্রসিকিউশন পক্ষ এই ঘটনার একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ওপর ভিত্তি করে অর্জুন জানিকে অভিযুক্ত করেছিল। সেই প্রত্যক্ষদর্শী দাবি করেছিলেন, তিনি রাত ১টার দিকে অর্জুনকে রত্নাইয়ের ওপর আক্রমণ করতে দেখেন। তবে জেরায় উঠে আসে, ঘটনার রাতে একই পথ দিয়ে যাতায়াত করলেও তিনি অন্য দুই নারীর মৃতদেহ দেখতে পাননি। এছাড়া বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে ঘটনা বর্ণনা করার সময় তাঁর বয়ানও ছিল অসঙ্গতিপূর্ণ।
তদন্তপ্রক্রিয়ার বেশ কিছু মারাত্মক ত্রুটি তুলে ধরে সুপ্রিম কোর্ট। পুলিশ কীভাবে অন্য কাউকে বাদ দিয়ে সরাসরি অর্জুনের ওপর সন্দেহ আনল, তার কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। উপরন্তু, এক সাক্ষী আদালতে স্বীকার করেন যে, স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য পুলিশ অর্জুনকে মারধর করেছিল—আইনানুযায়ী যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র (পাথর) উদ্ধারের ক্ষেত্রেও সাক্ষী ও তদন্তকারী কর্মকর্তার বয়ানে বড় ধরনের অসঙ্গতি পাওয়া যায়। নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পর অর্জুন হাইকোর্টে আপিল করেন। কিন্তু ৩,১৫৭ দিন বিলম্ব হওয়ার কারণে হাইকোর্ট কোনো শুনানি ছাড়াই সেই আপিল খারিজ করে দেয়। ততদিনে অর্জুন ১২ বছর জেলে কাটিয়ে ফেলেছেন। পরবর্তীতে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানাতেও ৩,৭০৩ দিন দেরি হয়। তবে সুপ্রিম কোর্ট এই বিলম্ব মার্জনা করে জানায়, হাইকোর্টের মনে রাখা উচিত ছিল যে এটি জেলখানা থেকে পাঠানো একটি আপিল এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি ইতিমধ্যেই দীর্ঘকাল কারাগারে বন্দী রয়েছেন।
শীর্ষ আদালত পুনর্ব্যক্ত করে, কেবল মাত্র একজন প্রত্যক্ষদর্শীর সাক্ষ্যের ভিত্তিতে সাজা দেওয়া সম্ভব, তবে শর্ত থাকে যে সেই সাক্ষ্য অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্য, ধারাবাহিক ও সার্বিক পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে। কিন্তু এই মামলায় প্রসিকিউশন পক্ষ যুক্তিসঙ্গত প্রমাণের উর্ধ্বে গিয়ে অপরাধ প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। দীর্ঘ ২২ বছর পর অর্জুন জানিকে সব অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়ার পাশাপাশি, কোরাপুট জেলার লিগ্যাল সার্ভিসেস অথরিটিকে স্থানীয় জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় তাঁর সামাজিক পুনর্বাসন ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
