TOP NEWS

৮ সাংবাদিক খুন, ১১৭ জন নাগরিককে গ্রেফতার: মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট

(Photo Courtesy: AI)

ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর ভয়াবহ আঘাতের ছবি নিয়ে চাঞ্চল্যকর রিপোর্ট প্রকাশ্যে এলো। রিপোর্ট অনুযায়ী, চলতি বছরে দেশে মোট ১৪,৮৭৫টি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে আটজন সাংবাদিক ও একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার নিহত হয়েছেন। পাশাপাশি, ১১৭ জন নাগরিককে গ্রেফতার করা হয়েছে, যাদের মধ্যে আটজন সাংবাদিক।

মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘন

মঙ্গলবার “ফ্রি স্পিচ ইন ইন্ডিয়া ২০২৫: বিহোল্ড দ্য হিডেন হ্যান্ড” শীর্ষক এক রিপোর্ট প্রকাশ করেছে দ্য ফ্রি স্পিচ কালেক্টিভ (এফএসসি)। রিপোর্টে বলা হয়েছে, “চলতি বছরে নথিভুক্ত ঘটনাগুলির মধ্যে রয়েছে মোট নয়টি হত্যাকাণ্ড। এর মধ্যে আটজন সাংবাদিক ও একজন সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার রয়েছে। এছাড়াও ১১,৩৮৫টি সেন্সরশিপের ঘটনা এবং ২০৮টি ‘ল’ফেয়ার’ বা আইনি হয়রানির মামলা সামনে এসেছে। একাধিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে একসঙ্গে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়েছে।” দেশজুড়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতায় কেন্দ্রের হস্তক্ষেপকে ‘গণহারে সেন্সরশিপ ও আইনি দমন’ বলে উল্লেখ করেছে এফএসসি। রিপোর্টটি প্রকাশ্যে আসতেই ভারতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সেন্সরশিপের পরিসংখ্যান

ফ্রি স্পিচ কালেক্টিভ (এফএসসি)–এর ট্র্যাকার অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের ঘটনাগুলির মধ্যে ছিল ৪০টি হামলা, ১৯টি হয়রানির অভিযোগ, ৩,০৭০টি ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণ, ১০টি নীতিগত পদক্ষেপ এবং ১৭টি হুমকির ঘটনা। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে, এফএসসি ট্র্যাকার যে সেন্সরশিপের পরিসংখ্যান তুলে ধরেছে, তার মধ্যে রয়েছে চলতি বছরের মে মাসে ভারতে ‘এক্স’ (পূর্বতন টুইটার)–এ আট হাজারের বেশি অ্যাকাউন্ট বন্ধ করতে সামাজিক মাধ্যমটিকে নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রের মোদি সরকার। জুলাই মাসে আরও দু’হাজারের বেশি অ্যাকাউন্টে একই ধরনের পদক্ষেপ করা হয়। তবে ঠিক কি কারণে অ্যাকাউন্টগুলি বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে! তা স্পষ্ট করেনি কেন্দ্র। তবে এই ধরণের দমন নিপীড়নের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে বলে মনে করছে সংস্থাটি।

কনটেন্ট সরানোর সরকারি নির্দেশ

রিপোর্ট অনুযায়ী, কর্নাটক হাইকোর্টে ‘সহযোগ পোর্টাল’ সংক্রান্ত মামলায় ‘এক্স’ যে হলফনামা জমা দিয়েছে, তা থেকে এই আশঙ্কার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। ওই নথি অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুনের মধ্যে ‘এক্স’ মোট ২৯,১১৮টি কনটেন্ট সরানোর সরকারি নির্দেশ পেয়েছিল, যার মধ্যে ২৬,৬৪১টি নির্দেশ তারা মেনে নিয়েছে। এছাড়াও রিপোর্টে জানানো হয়েছে, অন্যান্য ইন্টারনেট নিয়ন্ত্রণের ঘটনা মিলিয়ে মোট ৩,০৭০টি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ইন্টারনেট শাটডাউন, বিভিন্ন অ্যাপ ব্লক করা। ২০২৫ সালের জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রকের জারি করা ৭৮৫টি ব্লকিং অর্ডার, যা বিভিন্ন অনলাইন মধ্যস্থতাকারী সংস্থার উদ্দেশে পাঠানো হয়েছিল। এই তথ্যগুলি সামনে আসার পর দেশে ডিজিটাল অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে উদ্বেগ আরও গভীর হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।

সংবাদকর্মী ও ইনফ্লুয়েন্সারকে হত্যা

সংবাদ ও মতপ্রকাশের কারণে সাংবাদিক ও সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সারদের হত্যা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সবচেয়ে গুরুতর লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছে ফ্রি স্পিচ কালেক্টিভ (এফএসসি)। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৫ সালে যাঁদের হত্যা করা হয়েছে, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন উত্তরপ্রদেশের সাংবাদিক রাঘবেন্দ্র বাজপেয়ী ও লক্ষ্মী নারায়ণ সিং, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের শাদাব দে, ছত্তিশগড়ের মুকেশ চন্দ্রাকার, হরিয়ানার ধর্মেন্দ্র সিং চৌহান, কর্নাটকের বাসবরাজ কানাকোন্ড, ওডিশার চ. নরেশ, উত্তরাখণ্ডের রাজীব প্রতাপ সিং এবং পঞ্জাবের সোশ্যাল মিডিয়া ইনফ্লুয়েন্সার কাঞ্চন কুমারি। রিপোর্ট বলছে, গ্রামীণ জেলাগুলিতে কর্মরত সাংবাদিকরাই সবচেয়ে বেশি সরাসরি শারীরিক হামলার শিকার হয়েছেন। স্থানীয় দুর্নীতি, প্রশাসনিক গাফিলতি এবং বেআইনি কার্যকলাপ নিয়ে রিপোর্ট করার কারণেই তাঁদের উপর হামলা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বহু ক্ষেত্রেই পুলিশ এই হত্যাকাণ্ডগুলিকে সাংবাদিকতার বাইরে অন্য উদ্দেশ্যের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছে। যদিও প্রবল চাপ ও প্রতিবাদের ফলে সঠিক তদন্ত শুরু করতে বাধ্য হয়েছে প্রশাসন।

রিপোর্টে দাবি করা হয়েছে, সাংবাদিক মুকেশ চন্দ্রাকারের দেহ একটি সেপটিক ট্যাংক থেকে উদ্ধার করা হয়। পরে সাংবাদিকদের তীব্র প্রতিবাদে তদন্ত শুরু করে পুলিশ এবং অভিযুক্তদের গ্রেফতার করে। এছাড়াও ‘দিল্লি উত্তরাখণ্ড লাইভ’ নামে একটি ইউটিউব চ্যানেল চালানো রাজীব প্রতাপ সিংয়ের দেহ ভাগীরথী নদী থেকে উদ্ধার হয়। আর তাঁর গাড়িটি নদীর পাড় থেকে উদ্ধার হয়। স্থানীয় একটি সরকারি হাসপাতালে মদ্যপান করার একটি ভিডিও সম্প্রচার করার কয়েক দিন পরই এই ঘটনা ঘটে। যদিও পুলিশ দাবি করেছিল, প্রতাপ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে রাস্তা থেকে নদীতে পড়ে যান। এই সব ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের নিরাপত্তা এবং মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এফএসসি।

গ্রেফতার ও হামলা

সৎ ও সাহসী সাংবাদিকতা করে গ্রেফতার হয়েছেন অনেকেই। রিপোর্টে বলা হয়েছে, কাশ্মীরের সাংবাদিক ইরফান মেহরাজ এবং ঝাড়খণ্ডের রূপেশ কুমার এখনও জেলবন্দি রয়েছেন। তাঁদের বিরুদ্ধে অবৈধ কার্যকলাপ (প্রতিরোধ) আইন, ১৯৬৭ (ইউএপিএ) প্রয়োগ করা হয়েছে। ইরফান মেহরাজ ২০২৩ সালের মার্চ মাস থেকে এবং রূপেশ কুমার ২০২২ সালের জুলাই মাস থেকে জেলে রয়েছেন।

সরকারি রোষানলে শুধুমাত্র সাংবাদিকরাই রয়েছেন, তা নয়। সামাজিক মাধ্যমে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও মন্তব্য শেয়ার করে গ্রেফতার হয়েছেন বহু সাধারণ নাগরিক। এই সংক্রান্ত একাধিক ঘটনা নথিভুক্ত করেছে ফ্রি স্পিচ কালেক্টিভ। সংস্থাটির তথ্য অনুসারে, পুণেতে ফিলিস্তিনপন্থী বিক্ষোভকারীদের ওপর শারীরিক নির্যাতন, দিল্লিতে পিপলস ট্রাইব্যুনালের একটি সাংবাদিক সম্মেলনে বাধা দেওয়ার মত ঘটনাগুলি হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীর দ্বারা ঘটানো হয়েছে। তামিলনাড়ুর তিরুনেলভেলিতে অবৈধ খনিজ উত্তোলন সংক্রান্ত একটি পিপলস ট্রাইব্যুনাল শুনানির সময় আইনজীবী ও নাগরিক অধিকারকর্মী ভি. সুরেশের ওপর খনি-মাফিয়ার হামলা চালানো হয়। ফ্রি স্পিচ কালেকটিভ (এফএসসি)-এর তথ্য অনুযায়ী, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা লঙ্ঘনের সর্বাধিক ঘটনা রিপোর্ট করা হয়েছে গুজরাটে (১০৮টি)। এর পরেই রয়েছে উত্তর প্রদেশ (৮৩), কেরালা (৭৮), আসাম (৬২) এবং জম্মু ও কাশ্মীর (৫১)। রিপোর্টে এই পরিসংখ্যান তুলে ধরে দেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এফএসসি।

প্রসঙ্গত, ২০১৮ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে গঠিত হয় ফ্রি স্পিচ কালেকটিভ। এই সংগঠনটি মূলত মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা ও প্রসারে কাজ করে। সংগঠনের বহু সদস্য দীর্ঘদিন ধরেই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরে সাংবাদিকদের অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংক্রান্ত নানা ঘটনা নথিভুক্ত করে আসছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!