——————————————————————————-

আব্দুল গনি
(মানবাধিকার কর্মী)
মুর্শিদাবাদ: বাংলার অন্যতম সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদ। পরিযায়ী ও বিড়ি শ্রমিকের জেলা মুর্শিদাবাদ। শিক্ষায় পিছিয়ে পড়া জেলা মুর্শিদাবাদ। কর্মসংস্থানে পিছিয়ে পড়া জেলা মুর্শিদাবাদ। এই জেলার বহু মানুষের জীবনজীবিকা নির্ভর করে ভিনরাজ্যে রাজমিস্ত্রি, কলকারখানা ও ফেরিওয়ালার কাজ করে। কারণ তারা জানে, এই জেলায় থাকলে পেটে ভাত জুটবে না। তাই পরিবারকে ছেড়ে মন না চাইলেও ভয়কে সঙ্গী করে তাদের ভিনরাজ্যে পাড়ি দিতে হয়। হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে বছরের পর বছর বাইরে পড়ে থেকে পরিবারকে স্বাচ্ছন্দ্যে রাখেন তারা।
ভিনরাজ্যে কর্মরত শ্রমিকরা প্রত্যেকদিন নানান ভাবে হেনস্থা ও নির্যাতনের শিকার হন। কখনো দুর্ঘটনায় মৃত্যু, কখনো পিটিয়ে মেরে দেওয়া হয় তাদের। তারা মুসলিম হলে তাদের কপালে মার জোটে, তারা বাংলা বললে তাদের ‘বাংলাদেশি’ বলে হেনস্থা চলে। ভিনরাজ্যে কার্যত যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয় পরিযায়ী শ্রমিকদের। আর্থিক স্বচ্ছলতা না থাকায় তাদের পরিবার ও সন্তানরা এক অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ নিয়ে বেঁচে থাকেন। মুর্শিদাবাদের ছেলে-মেয়েরা উচ্চশিক্ষার জন্য বাইরে গিয়ে বৈষম্যের মুখোমুখি হন। শুধুমাত্র ‘মুর্শিদাবাদ’ ও ‘মুসলিম’ হওয়ার কারণে তাদের ঘরভাড়া পর্যন্ত দেওয়া হয় না। আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থানসহ সমস্ত দিক থেকে এই জেলাকে পিছিয়ে রাখা হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
স্বাধীনতার ৭৬ বছর পরেও জেলার কোনও রাজনৈতিক নেতা বা মন্ত্রী বা কোনও রাজনৈতিক দল এই জেলার কথা ভাবেনি। তারা অসংগঠিত শ্রমিকদের কথা ভাবেনি। নিজের জেলায় শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার কথা কেউ ভাবেনি। তাদের আর্থিক স্বচ্ছলতার কথা কেউ ভাবেনি। তাদের পরিবার ও সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা কেউ ভাবেনি। তারা মাথা উঁচু করে বাঁচবে সেই কথাও কেউ ভাবেনি। এক সময়ের বাংলা, বিহার ও উড়িশার রাজধানী মুর্শিদাবাদের এই শৌচনীয় অবস্থা একদিনে হয়নি। সু-পরিকল্পনা ও সুকৌশলে এই জেলাকে আর্থ সামাজিক উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কর্মসংস্থানসহ সমস্ত দিক থেকে ‘তালাবন্দি’ করে রাখা হয়েছে। এই দায় কি রাজনৈতিক দল বা নেতারা ঝেড়ে ফেলতে পারেন?
হুমায়ন কবির: বারবার দলবদল। মেরুকরণের রাজনীতি। উসকানিমূলক ও বিতর্কিত চোখা চোখা কথা বলে সংবাদমাধ্যমে ভেসে থাকেন হুমায়ন। কখনও পুলিশ-প্রশাসন, কখনও দলের নেতাদের আক্রমণ করে কু-কথার ফুলঝুরি। প্রতিবারই তাঁর মূল টার্গেট থাকে ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি। দীর্ঘ সময় ধরে রাজনীতির ময়দানে থাকা হুমায়ন কবিরের রাজনীতিতে হাতেখড়ি কংগ্রেসে হলেও এপর্যন্ত সব দল করা হয়ে গেছে তাঁর। সংখ্যালঘু ও মুসলিমদের ‘শত্রু’ নামক দলটি করতেও দ্বিধাবোধ করেননি তিনি। আজ দল থেকে সাসপেন্ড হয়ে তৃণমূলকে ‘সংখ্যালঘু শোষণকারী’ বলছেন, মমতার থেকে বাংলায় বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী অনেক ভালো বলছেন। আজ বিজেপিকে সাম্প্রদায়িক দল বলছেন। অথচ তার রাজনৈতিক জীবনে আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে রয়েছে এই দলগুলিই।
দীর্ঘসময় ধরে রাজনীতির ময়দানে থেকে এই পিছিয়ে পড়া জেলার জন্য কোনটা কাজটা করেছেন হুমায়ন? দু’বার বিধায়ক নির্বাচিত হয়ে কেনো একটা পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি জোরালো ভাবে তুলতে পারেননি তিনি? শাসক দলের বিধায়ক হয়ে এই জেলার উন্নয়নের জন্য বিধানসভায় কোন দাবিটি জোরালো ভাবে তুলেছেন তিনি? এই জেলায় কলকারখানা করার জন্য ক’দিন মুখ্যমন্ত্রীর দরবারে গেছেন তিনি? সামশেরগঞ্জ ও জলঙ্গিতে ভাঙন এবং সীমান্তে কৃষকদের সমস্যা নিয়ে কটা কথা বলেছেন তিনি? শাসক দলে থেকে একদিনও সাহস হয়নি এটা বলার, যে তৃণমূলকে ২০টির বেশি আসন দিয়েছে মুর্শিদাবাদ, কেনো পিছিয়ে থাকবে এই জেলা? পিছিয়ে পড়া জেলা আরও পিছিয়ে পড়ুক, পিছিয়ে পড়া জেলা উচ্ছেনৈ যাক। তাতে হুমায়নের কিচ্ছুটি যায় আসেনা। আজ যায় আসে না বলেই নতুন করে জেলা তথা রাজ্যজুড়ে ধর্মের জিগির তুলে দিয়ে বাবরি তৈরির ঘোষণা করেছেন তিনি। ৬ ডিসেম্বর তার ভিত্তিপ্রস্তরস্থাপন হয়েছে। ভিত্তিপ্রস্তরকে ঘিরে বহু মানুষের সমাগম, উন্মাদনা ও উচ্ছ্বাস দেখলাম। কিন্তু মানুষের এই উন্মাদনা দেখে আমি হবাক হয়নি। কারণ তাদের মধ্যে জাগিয়ে তোলা হয়েছে ধর্মের আবেগ।
বাবরি মসজিদ: আজ দেশজুড়ে যখন একাধিক ঐতিহাসিক মসজিদ, মাদ্রাসা, মাজার ও কবরস্থানকে বুলডোজার চালিয়ে ভেঙে গুড়িয়ে দিচ্ছে গেরুয়া শিবির। তখন কি এগুলোকে বাঁচাতে সচেষ্ট হয়েছেন হুমায়ন? মসজিদ ও মাদ্রাসাগুলিকে গেরুয়া শিবিরের হাত থেকে বাঁচাতে ক’বার আদালতের দারস্থ হয়েছেন তিনি? হঠাৎ এই মানুষটির মনে ধর্মপ্রেম, মুসলিমপ্রীতি কেনো জাগল? কেনো বাবরি তৈরি করতে উঠে পড়ে লাগল? মুর্শিদাবাদের একাধিক সমস্যা থাকার পরও কেনো হঠাৎ একেবারে বাবরি মসজিদ গড়ার ‘সংকল্প’ নিলেন? বিজেপিকে তোল্লাই দিতেই হুমায়নের এহেন তৎপরতা নয় তো? হুমায়ন যখন বাবরি মসজিদ ধ্বংসকারীদের সাথে হাত মিলিয়ে লোকসভার মত বড় নির্বাচনে লড়েছিলেন, তখন তাঁর বাবরি আবেগ কোথায় ছিল? এই উত্তরগুলি খুঁজবেন না?
হুমায়নের বাবরি মসজিদ তৈরির ঘোষণার পিছনে রয়েছে প্রবল রাজনৈতিক অভিসন্ধি। মুর্শিদাবাদে বাবরি তৈরির পিছনে লুকিয়ে রয়েছে প্রবল ‘ক্ষমতা’ দখলের খেলা। হুমায়ন অনেক আগেই অনুমান করেছিলেন, তৃণমূল তাঁকে ছেটে ফেলবে। ইতিমধ্যে তৃণমূল থেকে সাসপেন্ড হয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক নেতা হওয়ার সুবাদে হুমায়ন জানেন, রাজনীতিই তাঁর একমাত্র সম্বল। কংগ্রেস, বিজেপি, তৃণমূল ঘুরে বর্তমানে দলহীন হুমায়ন। এই দলগুলিতে ক্যামব্যাগ করার সুযোগ ও পরিস্থিতি কোনোটিই নেই তাঁর। তাই নতুন দল তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। একইসঙ্গে ঘোষণা করেছেন, রাজ্যজুড়ে একশোর বেশি আসনে প্রার্থী দেবে তাঁর নতুন দল। স্বাভাবিক ভাবেই নতুন দল করে একশোর বেশি আসনে প্রার্থী দিতে গেলে প্রয়োজন নতুন দলের ননস্টপ (লাগাতার) প্রচার। হুমায়নের নিজের যা ভাবমূর্তি তা নিয়ে রাজ্যের কোণায় কোণায় পৌঁছানো কার্যত অসম্ভব। দ্রুত রাজ্যের কোণায় কোণায় পৌঁছাতে গেলে একমাত্র বির্তকির্ত, উস্কানিমূলক, কুরুচিকর মন্তব্য এবং বিতর্কিত বিষয় নিয়ে মাঠে নেমে পড়া। অর্থাৎ নেগেটিভ ননস্টপ প্রচারই পারে তাঁর নতুন দলকে রাজ্যের কোণায় কোণায় পৌঁছে দিতে। তাই হুমায়নের হাঁতিয়ার বিতর্কিত ‘বাবরি মসজিদ’। যেদিন থেকে তিনি বাবরি তৈরির ঘোষণা দিয়েছেন, সেদিন থেকে মিডিয়ায় মধ্যমণি হয়ে রয়েছেন হুমায়ন। এক চুটকিতে দেশ, রাজ্য, জেলা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতেও জায়গা করে নিয়েছেন তিনি। নেগেটিভ ননস্টপ প্রচারে সফল হুয়ামন। ঠিক যেভাবে, রাতদিন সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা, বিদ্বেষ ও বিষোদগার করে বাংলার পদ্ম ফুলকে ফুঁটিয়ে তুলেছেন প্রাক্তন রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ। বর্তমানে এই কাজ করে চলেছেন শুভেন্দু অধিকারী।
বাবরি তৈরি করে হুমায়ন ও তাঁর দল এরাজ্যের সংখ্যালঘুদের বড় মুসলমান, মুসলিমপ্রেমী ও ‘মসিহা’ হতে সচেষ্ট। সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্মের জিগির ও উন্মাদনা জাগিয়ে দিয়ে ভোটজয়ের স্বপ্ন দেখছেন তিনি। এটাই প্রধান লক্ষ হুয়ামনের। ভালো করে লক্ষ্য করুন, যখন তিনি মুখে বাবরির কথা বলছেন, একইসঙ্গে বলছেন মুসলমান ভোট, মুসলিম ভোটের শতাংশ, ৪০টি মুসলিম সিট ইত্যাদি। তিনি একটি বারের জন্যও বাবরি মসজিদ কে ধর্মীয় স্থানে রাখছেন না। অথার্ৎ হুমায়নের কাছে ‘বাবরি বনাম মুসলিম ভোট’ সমার্থক।
বর্তমান পরিস্থিতিতে মুর্শিদাবাদে বাবরি তৈরির ঘোষণা আগুনে ঘিঁ ঢালার সমান। কেনো বলছি? বিজেপির দিলীপ ঘোষ, অর্জুন সিং, সজল ঘোষ, সুকান্ত, শৌমিকরা ময়দানে নেমে পড়েছেন। বাবরি তৈরি নিয়ে বাংলার বিজেপি নেতাদের মন্তব্য একবার দেখে আসুন। দিলীপ বলেছেন, “ভারতবর্ষে বাবরি হবে না”, অর্জুন বলেছেন, “বাবরের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে তাঁকে”, সুকান্ত বলেছেন, “বাংলায় রাম মন্দিরও হবে”। মুর্শিদাবাদে রাম মন্দির নির্মাণের ঘোষণা দিলেন বিজেপি নেতা সাখারভ সরকার। আগামী দিনে এই বাবরিকে ঘিরে পরিস্থিতি অন্যদিকে মোড় নেবে। বাবরিকে ঘিরে জেলায় নতুন করে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় শান দেওয়া হবে। ৬ ডিসেম্বর বাবরির ভিত্তিপ্রস্তরস্থাপন করে বিজেপির হাতে নতুন অস্ত্র তুলে দেওয়ার কাজটি সুকৌশলে সেরে ফেললেন হুমায়ন।
মুর্শিদাবাদ বা বেলডাঙার মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষরা মসজিদের অভাব অনুভব করেন না। মুর্শিদাবাদের মানুষ মসজিদের কমতি অনুভব করেন না। কিন্তু মুর্শিদাবাদের মানুষ কর্মসংস্থানের অভাব অনুভব করেন, পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অভাব অনুভব করেন, উন্নত চিকিৎসা ও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের অভাব অনুভব করেন। এই সমস্ত অভাববোধ হুমায়নের মনকে নাড়ায় না। কারণ এতে তাতে তাঁর রাজনৈতিক লাভ ‘শূণ্য’।
বাবরি তৈরি করে হুমায়ন নিজের লক্ষ্য ও টার্গেট পূরণ করে নেবেন ঠিকি। কিন্তু বাবরি তৈরি হলে এই জেলার মানুষ কি পাবে? ভিনরাজ্যে কর্মরত মুর্শিদাবাদের শ্রমিকদের আরও বেশি বেশি করে নির্যাতন, নিপীড়ন, হেনস্থা, ঘৃণা, বিদ্বেষ ও গণপিটুনির শিকার হবেন। সংখ্যালঘু ও মুসলিমদের দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক করতে আরও পা বাড়াবে বিজেপি, সংখ্যালঘু ও মুসলিমদের ওপর আক্রমণ আরও বাড়বে, সংখ্যালঘু ও মুসলিমদের দেশ থেকে বিতাড়ণ আরও বাড়বে। হুমায়নে ভর করে আরও নির্মমতা চালিয়ে যাবে। যেমনটা মুর্শিদাবাদে ওয়াকফ আন্দোলনকে ঘিরে হিংসার ঘটনার পর ভিনরাজ্যে কর্মরত জেলার শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। পুণরায় এই ঘটনার পুনরাবৃত্তির ঘটলে সবটার জন্যই দায়ী থাকবেন হুমায়ন।
দেশজুড়ে বিজেপির ধর্মীয় উন্মাদনা, ধর্মীয় রাজনীতি ও হিন্দু-মুসলিমের রাজনীতি যদি ভুল হয় থাকে। তাহলে দ্বৈত কন্ঠে বলতে হবে, হুমায়নের বাবরি রাজনীতিও ভুল। তিনি স্পষ্ট মুসলিম সমাজের আবেগ নিয়ে ছেলে খেলা করছেন। “মন্দির, মসজিদ নিয়ে কেন মাতামতি বারবার? কোটি কন্ঠে আওয়াজ উঠুক— চাই রুটি, রুজি, শিক্ষা, নিশ্চিন্তে বাঁচার অধিকার। ধর্ম থাকুক অন্তরে, অন্তরে। ধর্ম আসুক উদারতার পথ ধরে।”
(মতামত লেখকের একান্ত ব্যক্তিগত ও নিজস্ব। মতামতের জন্য সম্পাদক দায়ী নয়।)
