ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: পাকিস্তানের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান আদিয়ালা জেলে চরম স্বাস্থ্য সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। আদালতের নির্দেশিত এক আইনজীবীর প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দীর্ঘ মেয়াদে নির্জন কারাবাসের ফলে ইমরান খানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি প্রায় ৮৫ শতাংশ কমে গেছে। তার সহযোগীদের দাবি, পাকিস্তানের ক্ষমতাধর সামরিক প্রতিষ্ঠানের নির্দেশে ইচ্ছাকৃতভাবে এবং অমানবিক উপায়ে তার সাথে এই আচরণ করা হচ্ছে।
দৃষ্টিশক্তি হ্রাস ও চিকিৎসার চরম অবহেলা
সুপ্রিম কোর্ট কর্তৃক নিযুক্ত অ্যামিকাস কিউরি (আদালতের বন্ধু) সালমান সফদারের তৈরি করা বিস্তারিত প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ইমরান খানের ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি মাত্র ১৫ শতাংশ অবশিষ্ট রয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে জেলে বন্দি ইমরান খান বারবার চোখের সমস্যার কথা জেল কর্তৃপক্ষকে জানালেও তারা মাসের পর মাস তা উপেক্ষা করেছে।
ইমরান খান অ্যামিকাস কিউরিকে জানান, গত বছরের অক্টোবর পর্যন্ত তার দৃষ্টিশক্তি স্বাভাবিক ছিল। এরপর থেকে তিনি দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যাওয়ার সমস্যা অনুভব করেন এবং বারবার জেল সুপারিনটেনডেন্টকে জানান। কিন্তু কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অবশেষে ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলার পর পিআইএমএস (PIMS) হাসপাতালের একজন চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞকে ডাকা হয়। পরীক্ষায় জানা যায়, চোখের ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে এই গুরুতর ক্ষতি হয়েছে। ইনজেকশন ও সীমিত চিকিৎসার পরেও তার ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি আর আগের অবস্থায় ফেরেনি।
নির্জজন কারাবাস ও মানসিক যাতনা
সালমান সফদার নিজ চোখে ইমরান খানের শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তিনি জানান, প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী তার দৃষ্টিশক্তি হারানো এবং সময়মতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ না পাওয়ার কারণে প্রচণ্ড মানসিক কষ্টে রয়েছেন। তার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়ছিল এবং তিনি বারবার টিস্যু দিয়ে তা মুছছিলেন, যা তার শারীরিক অস্বস্তির প্রমাণ। প্রতিবেদনে আরও নিশ্চিত করা হয়েছে, ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে প্রায় দুই বছর চার মাস ধরে ইমরান খানকে নির্জন কারাবাসে (Solitary Confinement) রাখা হয়েছে। ৭৩ বছর বয়সী এবং একাধিক স্বাস্থ্য সমস্যায় আক্রান্ত হওয়া সত্ত্বেও তাকে তার ব্যক্তিগত চিকিৎসকের সাথে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না।
পরিবার ও আইনি সহায়তা থেকে বিচ্ছিন্ন
ইমরান খানের পরিবার ও আইনজীবীদের সাথে যোগাযোগের ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আদালতের নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও তার বোনদের নিয়মিত দেখা করতে দেওয়া হয়নি। সম্প্রতি জেলের সুপারিনটেনডেন্ট পরিবর্তনের পর সপ্তাহে একবার মাত্র ৩০ মিনিটের জন্য তার স্ত্রীর সাথে দেখা করার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। গত এক বছরে তার ছেলেদের সাথে মাত্র দুবার টেলিফোনে কথা বলার সুযোগ হয়েছে।
সালমান সফদার সতর্ক করে জানিয়েছেন, গত পাঁচ মাস ধরে ইমরান খানকে তার প্রধান আইনজীবী বা আইনি দলের সদস্যদের সাথে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছে না। এটি তার আইনি লড়াই করার ক্ষমতাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে।
প্রতিবেদনে উদ্বেগ
প্রতিবেদনের উপসংহারে সতর্ক করে বলা হয়েছে, অবিলম্বে বিশেষজ্ঞ চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ এবং তার পরিবার ও আইনজীবীদের সাথে সাক্ষাতের সুযোগ না দিলে ইমরান খানের স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি হবে। ইমরান খানের সমর্থকদের মতে, এই প্রতিবেদন প্রমাণ করে যে পাকিস্তানের সামরিক নেতৃত্বাধীন ‘ডিপ স্টেট’ (Deep State) একজন জনপ্রিয় বেসামরিক নেতাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে ফেলার জন্য কারাবাসকে একটি অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করছে। ইমরান খান নিজেই আক্ষেপ করে বলেছেন, তিনি কেবল বেঁচে থাকার জন্য ন্যূনতম প্রয়োজনীয়টুকু আশা করেন, কিন্তু সেটিও তাকে দেওয়া হচ্ছে না।
