নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: দেশের বিভিন্ন রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর ক্রমবর্ধমান হিংসা, নিগ্রহ ও হয়রানির ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হস্তক্ষেপ চেয়ে আবেদন জানালেন মুর্শিদাবাদের ডোমকলের সাংবাদিক, আইনজীবী ও সমাজকর্মীরা। সম্প্রতি রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো এক স্মারকলিপিতে তাঁরা বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা, মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা সুনিশ্চিত করার জন্য জরুরি নির্দেশ জারির আবেদন জানিয়েছেন। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়েছে, গত ২৪ ডিসেম্বর ওড়িশার সম্বলপুরে মুর্শিদাবাদের বাসিন্দা তরুণ পরিযায়ী শ্রমিক জুয়েল রানাকে ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ বলে অভিযোগ তুলে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। ওই ঘটনায় আরও দুই পরিযায়ী শ্রমিক গুরুতর আহত হন।
আইনজীবী মাসুম রহমান ডেইলি ডোমকল-কে বলেন, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। ওড়িশা ছাড়াও গুজরাট, মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা ও দিল্লিসহ একাধিক রাজ্যে বাংলাভাষী পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপর একই ধরনের হিংসা, বেআইনি আটক ও হয়রানির অভিযোগ সামনে এসেছে। পরিযায়ী শ্রমিকরা এদেশের নাগরিক। দেশের সংবিধান প্রত্যেককে স্বাধীনভাবে কাজের ও বসবাসের অধিকার দেয়। সেখানে প্রতিনিয়ত পরিযায়ী শ্রমিকদের সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। মানবাধিকার লঙ্ঘিত হওয়ার প্রশ্নে প্রতিবাদ হওয়া জরুরি। সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে রাষ্ট্রপতিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
আবেদনে বলা হয়েছে, এই শ্রমিকরা ভারতের বৈধ নাগরিক এবং সংশ্লিষ্ট রাজ্যগুলির অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। তবুও শুধুমাত্র ভাষাগত পরিচয়ের কারণে তাঁদের ভিনদেশি সন্দেহে হেনস্থা করা হচ্ছে, যা মানবিক মর্যাদা ও সাংবিধানিক অধিকারের চরম লঙ্ঘন। রাষ্ট্রপতির দৃষ্টি আকর্ষণ করে আবেদনকারীরা সংবিধানের একাধিক অনুচ্ছেদের উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, — অনুচ্ছেদ ১৯(১)(ই) ও ১৯(১)(গ)— দেশের যে কোনও প্রান্তে বসবাস ও পেশা গ্রহণের অধিকার ভয়, হুমকি ও হিংসার মাধ্যমে কার্যত কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। অনুচ্ছেদ ২১— জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার গুরুতরভাবে লঙ্ঘিত হচ্ছে, যখন মানুষ শুধুমাত্র কাজের জন্য ভিনরাজ্যে যাওয়ায় প্রাণ হারাচ্ছেন। অনুচ্ছেদ ১৪— আইনের চোখে সমতার অধিকার ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

স্মারকলিপিতে রাষ্ট্রপতির কাছে চারটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপের আবেদন জানানো হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
১) পরিযায়ী শ্রমিকদের সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে কেন্দ্র সরকারকে কড়া নির্দেশ দেওয়া।
২) পরিযায়ী শ্রমিকদের জীবন, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষায় বিশেষ আইন বা নীতিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ।
৩) সব হিংসার ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দোষীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা।
৪) ভাষা বা আঞ্চলিক পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে সচেতনতা অভিযান চালানো।
সমাজকর্মী তমাল বিশ্বাস বলেছেন, “এই ধরনের ঘটনাগুলি সংবিধানের সাম্য, ন্যায় ও জাতীয় সংহতির মূল আদর্শকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। পরিযায়ী শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ ভারতের স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে না।” আবেদনকারীরা আশা প্রকাশ করেছেন, সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে রাষ্ট্রপতি এই গুরুতর জাতীয় ইস্যুতে মানবিক ও দৃঢ় পদক্ষেপ নেবেন।
