“ভারতে ভিন্নমতের জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে”: বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া

ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: দেশে নাগরিক অধিকার, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ ও মুক্তচিন্তার জায়গা দিন দিন সংকুচিত হয়ে আসছে বলে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেন সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া। সাধারণ নাগরিক আচরণকে পর্যন্ত যেভাবে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে এবং সাংবিধানিক অধিকার প্রয়োগের জন্য মানুষকে যে আইনি হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে, তা নিয়ে তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। শনিবার ভোপালের ‘ন্যাশনাল ল ইনস্টিটিউট ইউনিভার্সিটি’-তে আয়োজিত পঞ্চম বিচারপতি জি.পি. সিংহ স্মারক বক্তৃতায় বক্তব্য রাখার সময় এই পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন সুপ্রিম বিচারপতি।

সম্প্রতি ঘটা একাধিক ঘটনার উদাহরণ টেনে বিচারব্যবস্থা ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন বিচারপতি ভূঁইয়া। গঙ্গায় নৌকায় বসে রমজানের ইফতারের সময় চিকেন বিরিয়ানি খাওয়ার অপরাধে ১৪ জন মুসলিম যুবককে গ্রেফতার করার তীব্র সমালোচনা করে তিনি। বিচারপতি ভূঁইয়া বলেন, “আমি নিশ্চিত, চিকেন বিরিয়ানি খাওয়া কোনো অপরাধ হতে পারে না। গঙ্গা নদীর ওপর বিরিয়ানি খাওয়া নিষিদ্ধ করে এমন কোনো আইন দেশে নেই। অথচ এই সামান্য কারণে ওই যুবকদের তিন মাস জেল খাটতে হয়েছে।” তাঁর কথায়, অনেক ক্ষেত্রে আদালত অপরাধের তীব্রতা না বুঝে দেরিতে জামিন দিচ্ছে এবং এমন কঠোর শর্ত আরোপ করছে, যা পরোক্ষভাবে নাগরিকদের মুক্তচিন্তা ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ প্রকাশ করাকে নিরুৎসাহিত করছে।

২০২৫ সালে বোম্বে হাইকোর্ট কর্তৃক গাজায় ইসরাইলি বর্বরতার প্রতিবাদে একটি মিছিলের অনুমতি না দেওয়ার সিদ্ধান্তের কঠোর সমালোচনা করেন বিচারপতি ভূঁইয়া। উল্লেখ্য, সিপিআই(এম)-এর পক্ষ থেকে ওই সমাবেশের অনুমতি চেয়ে বোম্বে হাইকোর্টে আবেদন করা হলে আদালত প্রশ্ন তুলেছিল, ‘ভারতে কি কোনো সমস্যা নেই যে বহুদূরের বিষয় নিয়ে প্রতিবাদ করতে হবে?’ এদিন এই প্রসঙ্গে সুপ্রিম বিচারপতি বলেন, “বিষয়টি শুনে আমি বেশ তাজ্জব হয়েছিলাম। ভারত দীর্ঘদিন ধরেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাদের সাথে পূর্ণ কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে যেখানে গাজা যুদ্ধ নিয়ে আলোচনা চলছে, সেখানে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা গবেষকদের বিশ্ব রাজনীতির এসব বিষয় নিয়ে প্রশ্ন তোলা ও পড়ার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত।” তিনি স্পষ্ট করে বলেন, “বিতর্ক ও ভিন্নমতই হলো গণতন্ত্রের আসল নির্যাস।” বিচার ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা তুলে ধরে বিচারপতি বলেন, বিচারকদের নিজেদের প্রশংসা করার চেয়ে সাধারণ মানুষের আস্থাই সবচেয়ে বড় কথা। সেই জন্য মহিলাদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং ধর্মীয় ও সামাজিক সংখ্যালঘু ও পিছিয়ে পড়া শ্রেণিকে বিচারব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।

প্রসঙ্গত, বিচারপতি উজ্জ্বল ভূঁইয়া অতীতেও একাধিকবার ধর্ম ও জাতিভিত্তিক বৈষম্য নিয়ে সরব হয়েছেন। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে দিল্লির একটি মর্মান্তিক সামাজিক বৈষম্যের কথা তুলে ধরেছিলেন তিনি। যেখানে তাঁর মেয়ের এক মুসলিম বান্ধবী কেবল ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে দিল্লিতে বাড়ি ভাড়া পাননি। একই সাথে অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্রে একজন দলিত মহিলাকে রাঁধুনি হিসেবে নিয়োগ দেওয়ায় সেখানে খাবার বয়কটের উদাহরণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছিলেন, সংবিধানে সাম্যের অধিকার থাকা সত্ত্বেও সামাজিক কুসংস্কার কতটা গেড়ে বসে রয়েছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!