নিজস্ব সংবাদদাতা, ইসলামপুর: নামেই প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র, কিন্তু পরিষেবার হাল তলানিতে। রানিনগর-১ ব্লকের হুড়শী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র এখন কার্যত ধুঁকছে কর্মী সংকটে। সরকারি খাতায় বেড বরাদ্দ থাকলেও পর্যাপ্ত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে সেই পরিষেবা সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। মাত্র দু’জন চিকিৎসক আর একজন নার্স দিয়ে কোনোমতে টিকে আছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি। নেই কোনো সাফাইকর্মী কিংবা জিডিএ স্টাফ, ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের পাশাপাশি ব্যাহত হচ্ছে জরুরি চিকিৎসাও। গ্রামীণ এলাকার কয়েক হাজার মানুষের ভরসার এই কেন্দ্রটি আজ নিজেই ‘অসুস্থ’, যা নিয়ে ক্ষোভে ফুঁসছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এক স্থানীয় বাসিন্দার প্রশ্ন, পরিকাঠামো থাকা সত্ত্বেও কেন পরিষেবা মিলছে না।
জানা গিয়েছে, হাসপাতালে চিকিৎসক মাত্র দু’জন। নেই জিডিএ স্টাফ-সাফাইকর্মী। নার্সের সংখ্যা মাত্র একজন। পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে এভাবেই ধুঁকছে ইসলামপুরের হুড়শী প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র। ফলে স্বাস্থ্যদপ্তরের তরফে বেড বরাদ্দ হলেও পরিকাঠামো এবং পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবে তা ব্যবহার করে যাচ্ছে না। গ্রামীণ এলাকায় প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের এই অবস্থায় ক্ষুদ্ধ এলাকার মানুষেরা।
ইসলামপুর থানার বেকিবাগান পুলিস ক্যাম্পের বিপরীতে রাস্তার পাশেই অবস্থিত ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। সত্তরের দশকে এলাকার স্বাস্থ্য পরিষেবার কথা মাথায় রেখে হাসপাতালটি তৈরি হয়েছিল। হুড়শী অঞ্চল ছাড়াও আশেপাশের লোচনপুর, দেবাইপুর, রানিতলা, দুর্গাপুর পমাইপুরসহ ইসলামপুরের চরের বিস্তীর্ণ এলাকার মানুষের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য ভিড় করতেন ওই হাসপাতালে। চিকিৎসক-রোগীদের ভিড়ে গমগম করত হাসপাতাল চত্বর। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই এলাকায় সন্ত্রাস-মারামারির মত ঘটনায় হাসপাতাল ছাড়তে থাকে একের পর এক চিকিৎসকরা। আর এতেই ক্রমেই গরিমা হারাতে থাকে ওই হাসপাতাল। সেই সময় পরিস্থিতি এমন গিয়ে দাঁড়ায় যে মাঝখানে বন্ধ হয়ে যায় ওই হাসপাতাল। এরপরে ২০০০ সালের পরে পুনরায় খোলা হয় হাসপাতাল। এরপরে সেই থেকে বর্তমান সময়ে পর্যন্ত শুধুমাত্র বহির্বিভাগই চালু আছে হাসপাতালে। তবে তা চালু থাকলেও বিভিন্ন সময়ে কখনও চিকিৎসক, কখনও স্বাস্থ্যকর্মীর মত অভাবে ধুঁকতে থাকে হাসপাতালটি।
এমনকি গত কয়েকবছরে পরিস্থিতি এতটাই খারাপ হয়ে পড়ে যে, জিডিএ- স্টাফের অভাবে হাসপাতালে মাঝেমধ্যেই ব্যান্ডেজ বাঁধার কাজ করতে হয় হাসপাতালের একজন অস্থায়ী সাফাইকর্মীকেই। হাসপাতাল সূত্রের খবর, এই পরিস্থিতির উন্নতিকরণের জন্য গত মাসেকয়েক আগে স্বাস্থ্য দপ্তরের তরফে হাসপাতালের জন্য বেশ কয়েকটি বেড ও অন্যান্য কিছু চিকিৎসার সরঞ্জাম বরাদ্দ করা হয়। কিন্তু বেশ কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও তা আজও কাজে লাগানো যায়নি। বেডগুলির কয়েকটি পড়ে রয়েছে হাসপাতালের গুদামে কয়েকটি আবার অস্থায়ীভাবে নিয়ে যাওয়া হয়েছে ইসলামপুর গ্রামীণ হাসপাতালে। কর্তৃপক্ষের দাবি, ওই বেডগুলি চালু করতে হলে আরও স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন। কিন্তু সমস্যা সেখানেই। আর এই স্বাস্থ্যকর্মীর অভাবের কারণেই কোনওভাবেই সেগুলির পরিষেবা নিতে পারছে না লোকজন।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, শুধুমাত্র বহির্বিভাগেই প্রতিদিন গড়ে শতাধিক রোগীর আনাগোনা হয়। অনেক সময় কিছু জরুরি রোগীও হাসপাতালে আসে। কিন্তু সেখানে সেভাবে পরিষেবা না মেলায় তাঁদের দৌড়াতে হয় প্রায় ২০ কিমি দূরত্বে ইসলামপুর গ্রামীণ হাসপাতালে অথবা ঘুরপথে যেতে হয় রানিনগর গ্রামীণ হাসপাতালে।
লুৎফর শেখ নামের এক বাসিন্দা বলেন, আমাদের এখান থেকে ইসলামপুর হাসপাতাল প্রায় ২০ কিমি কাছাকাছি। রাতবিরোতে বাড়ির লোক অসুস্থ হলে ভীষণ সমস্যায় পড়তে হয়। যদি হাসপাতালটিতে জরুরি পরিষেবা চালু হয়, তাহলে আমাদের এদিকের হাজার হাজার লোক উপকৃত হবে। মাস কয়েক আগে শুনেছিলাম হাসপাতালটি বড় করার জন্য বেড বরাদ্দ হয়েছে। এরপরে অনেকদিন কেটে গেলেও সেসবের আর খবর নেই।
যদিও রানিনগর ১ ব্লকের বিএমওএইচ হাসানুল হাসিন বলেন, ওই বেডগুলি ব্যবহার করতে হলে আরও উন্নত পরিকাঠামো ও পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যকর্মীর প্রয়োজন। এই মুহূর্তে ওই হাসপাতালে কোনও জিডিএ স্টাফ, সাফাইকর্মী নেই। নার্সের সংখ্যাও মাত্র একটা। এইভাবে ওই বেডগুলির মাধ্যমে ইন্ডোর পরিষেবা চালু করা সম্ভব নয়। পুরো বিষয় নিয়ে আমরা ঊর্ধ্বতন কতৃপক্ষকে জানিয়েছি।
