TOP NEWS

লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি: এক গুচ্ছ প্রশ্ন ও নির্বাচন কমিশনকে খোলা চিঠি

——————————————————————————-
প্রতি,
মাননীয় নির্বাচন কমিশনার

আমি একজন ভারতীয় নাগরিক এবং পেশায় সাংবাদিক। বিগত দিনে IR হলেও একটি সুন্দর ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির জন্য বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের মতো নাগরিকেরাও নির্বাচন কমিশনের SIR- কে সমর্থন করেছে। ইতিমধ্যে প্রায় ৫৮ লাখ মানুষের নাম বাদ পড়েছে। প্রায় ৩৩ লক্ষ ভোটারের তথ্য ম্যাপিং হয়নি এবং তাদের শুনানির জন্য ডাকা হচ্ছে। কিছু প্রশ্ন থাকলেও এই পর্যন্ত সব ঠিক ছিল। কিন্তু এখন হঠাৎ সফটওয়ারের মাধ্যমে AI দিয়ে Logical Discrepancy বা যুক্তিগত অসঙ্গতি দেখিয়ে ২০০২ সালের সঙ্গে ম্যাপিং হওয়া সত্ত্বেও বাংলার বৈধ ভোটারদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। এই বিষয়ে বেশ কিছু প্রশ্ন ও দাবি নিচে তুলে ধরছি-

১) ২০০২ সালের সঙ্গে ২০২৫ সালের হুবহু মিলবে কেন? নির্বাচন কমিশনের কাগজ দিয়ে তো বিগত বছরে অনেকে সংশোধন করেছেন।

২) ২০০২ সালের পর কতজন সংশোধনের জন্য আবেদন করেছে? আর কতজনের সংশোধন হয়েছে, সেই তালিকা নির্বাচন কমিশন প্রকাশ করুক। এব্যাপারে কি কেউ RTI এর মাধ্যমে জানতে চেয়েছে?

৩) লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি বা যুক্তিগত অসঙ্গতি আসলে কী, কমিশন স্পষ্ট করুক। প্রত্যেকের তালিকা প্রকাশ করুক। আমরা মনে করি, Logical Discrepancy এর কোন Logic নেই।

৪) খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পরেও ২০০২ সালের সঙ্গে প্রজনি ম্যাপিং হওয়া ব্যাক্তিদের কেন ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ তালিকায় রাখা হল? এই বিষয়ে কি রাজনৈতিক দলগুলির সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে?

৫) বিহারে কি Logical Discrepancy ছিল? থাকলে কতজনের নাম ছিল এবং কতজনের শুনানী হয়েছে? যদি না থাকে তাহলে কেন ছিল না? আর এখনই বা কেন হচ্ছে?

৬) নির্বাচন কমিশন বলেছিল, ম্যাপিং হলে হিয়ারিং হবে না। এখন কেন শুনানি? রাজ্যের মুখ্যনির্বাচন কমিশনার মনোজ কুমার আগরওয়াল সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, নামের বানান ভুল বা মিডল নেম বা পদবী ২০০২ সালে এক রকম এবং পরে সংশোধন করেছে এমন হলেও সমস্যা নেই। তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, ২০০২ সালে একজনের নাম মনোজ আগরওয়াল, কিন্তু পরে মনোজ কুমার আগরওয়াল হয়েছে, এতে সমস্যা নেই। তাহলে এখন নাগরিকদের কেন শুনানিতে ডাকা হচ্ছে?

৭) প্রজনি ম্যাপিং সত্ত্বেও শুধুমাত্র Logical Discrepancy বা যুক্তিগত অসঙ্গতির কারণ দেখিয়ে ছয় সন্তানের অধিক যারা বাবার সঙ্গে লিঙ্ক করেছে তাদের শুনানিতে ডাকা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, অনেকের ছয় সন্তান নেই অথচ ডাকা হচ্ছে! এই হয়রানি কেন? এর আইনগত ভিত্তি কী?

৮) আন ম্যাপিং ভোটারদের শুনানিতে ডাকা হয়েছে এবং তাদের নাম তোলার জন্য নির্বাচন কমিশন নির্ধারিত ১৩টি ডকুমেন্টস এর একটি চাওয়া হচ্ছে। আবার প্রজনি ম্যাপিং হওয়া সত্ত্বেও শুধু কমিশনের অ্যাপ-এর ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিগত অসঙ্গতির কারণে শুনানীতে ডেকে ওই ১৩টির মধ্যে নথি চাওয়া হচ্ছে কেন? তাহলে ম্যাপিং ও আন ম্যাপিং সকলকে এক করে দেখছে কমিশন?

৯) যাদের লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি হিসাবে শুনানিতে ডাকা হচ্ছে তাদের কোন কোন ডকুমেন্টস দিতে হবে?

১০) কমিশনের AI দিয়ে তৈরি Logical Discrepancy কি ১০০ শতাংশ Logical ? তাতে কি ভুল নেই? সব কাজ কি AI করবে? তাহলে BLO, AERO – রা কী করবেন?

১১) ‘লজিক্যাল ডিস্ক্রিপেন্সি’ নির্বাচন কমিশনের অ্যাপ দ্বারা তৈরি। অতীতে বাংলায় ভোটার লিস্ট ছিল, কমিশন ইংরেজিতে ট্রান্সলেট করতে গিয়ে ভুল করেছে। এর দায় ভোটারের উপর চাপানো হচ্ছে কেন?

১২) বাংলার নিজস্ব একটা ধারা আছে। এখানকার মানুষের নাম, উচ্চারণ অন্য জায়গার মতো না হতেও পারে। সেখ বানান ইংরেজিতে sk,sekh,shaikh – বিভিন্ন ভাবে লেখা হয়। বন্দোপাধ্যায় ও ব্যানার্জি একই পদবী। কেউ bandopadhay, কেউ bondhopadhay, কেউ banarjee কেউ banarje লেখেন। কেউ নামের আগে সম্মানসূচক শ্রী, কেউ বা এমডি বা মো: লেখেন। আবার মোহাম্মদ, মুহাম্মদ, মো: লেখেন। আব্দুল বারি মন্ডলকে বাংলায় অনেকে আ: বারি মন্ডল লেখেন। আবার মন্ডল বানান, কেউ mondal লেখেন, কেউ বা mandal, রজত বানান Rajat হয় আবার Rojot হয়। নির্বাচন কমিশনের অ্যাপ-এ ভুল দেখাচ্ছে! কিছু ক্ষেত্রে শুধুমাত্র ২০০২ সালের বাংলা বানানে স্পেস ছিল না বলে হয়রানি? এইসব দোষ কার? নির্বাচন কমিশনের।

১৩) বয়সের কারণে যেসব Logical Discrepancy এসেছে সেটা বহুলাংশে ঠিক নয়। এদেশের কোটি কোটি মানুষের সেই সময় কোন জন্ম সার্টিফিকেট ছিল না, আর তখন জন্ম তারিখও নির্বাচন কমিশনের ভোটার তালিকায় ছিল না।

১৪) এদেশের বিরাট সংখ্যক মানুষ অর্ধশিক্ষিত, অশিক্ষিত, গরিব, মজুর, শ্রমিক। আগের দিনে কোন ডকুমেন্টস ছাড়াই মৌখিক কথায় ভোটের তালিকা তৈরি করেছে নির্বাচন কমিশন। তখনতো এতো কাগজ ছিল না। সাধারণ মানুষের কাছে ছিল শুধু ভোটার তালিকা। এখন কেন শুনানিতে ডাকা হচ্ছে?

১৫) প্রথমে Logical Discrepancy তালিকা আসার পর BLO খতিয়ে দেখে No Action required লিখে পাঠালেন। তারপর ফের সেই নামগুলো ফেরত এলো। এবার নথি আপলোড করে আন্ডার টেকিং দিলেন। তারপরেও ফের সেই নাম ফেরত এলো কেন? আর কতবার নথি দিতে হবে? আর ঠিক কী নথি দিতে হবে? কমিশনের লিখিত বক্তব্য নেই কেন?

১৬) যন্ত্র দিয়ে নাগরিকত্ব যাচাই অমানবিক। ২০০২ সালে নির্বাচন কমিশন নিজে ভুল করেছে। পরে অনেকে সংশোধন করেছে, আবার অনেকে দরকারে পরে ঠিক করবে। দেশের নাগরিকদের নামের কিছু ভুল হবেই, এতে কি বিদেশি প্রমাণ হয়?

১৭) Logical Discrepancy নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। এই ভয় কেন তৈরি হচ্ছে?

আমাদের দাবি:
১) ম্যাপিং বা প্রজনি ম্যাপিং হয়েছে এবং খসড়া তালিকায় নাম আছে এমন সমস্ত ভোটারের নাম ফাইনাল লিস্টে রাখতে হবে।

২) যদি খুব প্রয়োজন মনে হয় তাহলে Logical Discrepancy তালিকায় থাকা প্রজনি ম্যাপিং ভোটারদের থেকে শুধুমাত্র ২০০২ সালের বাবা, মা, ঠাকুর দা, ঠাকুর মা, দাদু, দিদার ভোটার লিস্ট এবং সেই সঙ্গে আধার, রেশন, বিদ্যুৎ বিল, প্যান কার্ড, ব্যাংকের বই, জমির দলিল যেকোন একটি নথি চাওয়া হোক। কোন ভাবেই আন ম্যাপিং-দের মতো ওই ১৩টি নথি চাওয়া যাবে না।

৩) কোন ভোটার নিয়ে সন্দেহ থাকলে কমিশন BLO কে জিজ্ঞেস করুক, দরকারে ভোটারের বক্তব্য শোনা হোক, বাড়ির অন্যদের, পাড়ার লোকদের বক্তব্য নেওয়া হোক, ICDS, আশাকর্মী থেকে তথ্য নেওয়া হোক, জানা হোক এরা ভারতীয় নাকি বিদেশি। BDO অফিসে গিয়ে শুনানী নয়, Logical Discrepancy তে যাদের নাম আছে তাদের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে, দরকারে বংশের অতীত ভোটার তালিকা দেখে, বাস্তব অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচন কমিশন তথ্য যাচাই করে ম্যানুয়ালি সমাধান করুক।

৪) বাবার নামে সমস্যা হলে মায়ের নাম দেখুন। সেটা না হলে ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, দাদু, দিদার নথি দেখুন। যেকোন দিক দিয়ে সমাধান করুন। লজিক্যাল ডিস্ক্রেপিন্সির নামে নাগরিককে যেন হয়রানি করা না হয়।

৫) সুপ্রিমকোর্টের নির্দেশে আধার কার্ড যখন জমা দিচ্ছে, তখন বাবা মায়ের কিছু একটা নথি নিলেই তো ঝামেলা মিটে যায়। কিছু জায়গায় আধার ছাড়াও বাকি ১১টি ডকুমেন্টস এর একটি চাওয়া হচ্ছে! আশাকরি বিষয়টি নির্বাচন কমিশন ভাববে।

৬) নির্বাচন কমিশনকে একজন ভোটার কী কী নথি জমা দিচ্ছে তার লিষ্ট সহ রিসিভ কপি দিতে হবে

৭) নির্বাচন কমিশন আরো তথ্য পেতে পারিবারিক রেজিস্টার, পুরাতন সেন্সাস, আর্থ সামাজিক সমীক্ষা রিপোর্ট , জমির দলিল, সরকারী অফিস গুলি থেকে চেয়ে নিক। পুরাতন ভোটার লিষ্ট তো কমিশনের কাছেই আছে। সেখান থেকে তথ্য নিতে পারে। সাধারন ভোটারদের হয়রানি বন্ধ হোক।

৮) যারা ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, দাদু, দিদা দিয়ে ম্যাপিং করেছে তাদের ক্ষেত্রে ২০০২ সালের তালিকা ও বাবা, মায়ের যেকোনো একজনের নথি নেওয়া হোক।

৯) নির্বাচন কমিশন যদি এতেও রাজি না হয়, তাহলে DNA টেস্টের ব্যবস্থা করুন! তখন বোঝা যাবে কার ছেলে কে, কার মেয়ে কে!

সম্মানিত নিবার্চন কমিশনার, আপনাদের উপর এদেশের গণতন্ত্র রক্ষার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। আপনারা স্বশাসিত সংস্থা। আপনারা নাগরিকদের গণতান্ত্রিক ভোটাধিকার রক্ষার প্রহরী। আমরা নির্বাচন কমিশনের আয়োজিত ভোটের মাধ্যমে জনপ্রতিনিধি নির্বাচন করি। ভারতের মতো বৃহত্তর গণতান্ত্রিক দেশে নাগরিকেরা আপনাদের প্রতি আস্থা রাখে। আমরা, আপনারা সকলেই দেশের কল্যাণ কামনা করি। দেশটা আমাদের, একে সুন্দর করার দায়িত্বও আমাদের। আমরা চাই, একজনও বৈধ ভোটারের নাম যেন বাদ না যায়, আবার কোন অবৈধ ভোটারের নাম যেন তালিকায় না থাকে। ভোটার তালিকা হোক স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ। স্বচ্ছ ভোটার তালিকা নিয়ে কারো মনে যেন প্রশ্ন তৈরি না হয়। ভালো থাকবেন।

বিনীত,
মোকতার হোসেন মন্ডল,
ভারতীয় নাগরিক, পেশায় সাংবাদিক ও লেখক
১৩ জানুয়ারি ২০২৬

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!