
——————————————————————————-
বাংলার প্রতিটি অবিজেপি দলের কর্মী, সমর্থক, নেতা, এমনকি বিজেপিরও বাঙালি সমর্থকদের প্রতি আবেদন, এবার অন্তত বাংলাকে বাঁচাতে আওয়াজ তুলুন। কারণ, যা হচ্ছে, তার কোনোটাই বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ভীষণ সুসংগঠিত। বহুবার লিখেছি, আরও একবার সময়সারণীটা লিখি। দেশজুড়ে বাঙালি ঠ্যাঙানো কখন শুরু হল, মনে করে দেখুন। অপারেশন সিঁদুর চলার পর্যায়েই। ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে হঠাৎ খুঁজে পাওয়া যেতে শুরু করল “বাঙালি অর্থাৎ বাংলাদেশীদের”। এটা এমনি এমনি হয়না। একটা যুদ্ধোন্মাদনা তৈরি হয়েছিল পাকিস্তানকে নিয়ে। গোদি মিডিয়া প্রাণপনে মিথ্যাচার করছিল, আসলে হাওয়া তুলছিল। ওসব মেটার পর পুরো উন্মাদনাটাই সরিয়ে দেওয়া হল বাংলাদেশের দিকে। বাংলাদেশ হল নয়া পাকিস্তান, আর পশ্চিমবঙ্গ হল জিহাদিদের আস্তানা, নয়া কাশ্মীর। দীর্ঘদিন ধরেই চেষ্টাটা চলছিল। রোবট নামিয়ে জিহাদি খোঁজা, সন্দেশখালিতে শেখেদের অত্যাচার, বেঙ্গল ফাইলসের প্রচার, এগুলো জলে গিয়েছিল। কিন্তু যুদ্ধোন্মাদনাটা লেগে গেল। ঠ্যাঙানি শুরু হল সর্বভারতীয় স্তরেই। শুরু হল বস্তিতে হানা। বাঙালি মাত্রেই সম্ভাব্য বাংলাদেশী প্রচার। ডিটেনশন ক্যাম্প চালু হল। নতুন একটা কথা চালু হল, পুশব্যাক।
এই নিয়ে তুমুল হইচই হবার কথা ছিল। হলনা। গোদি মিডিয়ায় এসে বসলেন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবীরা। কেউ বললেন, বাঙালি ঠ্যাঙানো হচ্ছেনা, আসল কারণটা অর্থনৈতিক। কেউ বললেন, ডেমোগ্রাফি বদলে যাচ্ছে। কেউ বললেন, ব্যাটাদের অন্য রাজ্যে কাজ করতে যেতে হয় কেন আগে দেখতে হবে। কেউ বললেন এটা কোনো ইস্যু না, আসল ইস্যু অন্য কিছু। রোহিঙ্গাদের দেখা যেতে শুরু করল চারদিকে। লোকে ফিসফাস করতে শুরু করল বাংলাদেশীতে এবং রোহিঙ্গায় ছেয়ে যাচ্ছে পশ্চিমবঙ্গ। করাচি দখলের মতোই তৈরি হয়ে গেল আরও একটা বাস্তবতার নির্মাণ। এটা আরও গায়ের কাছে, আরও অলীক, কিন্তু হল।
পরের ধাপে এই প্রচারের হাত ধরেই এল এসআইআর। এত রোহিঙ্গা ঢুকে পড়েছে, তাড়াতে তো হবে। যুক্তির হিসেবে সেটাই পরবর্তী স্টেশন। টিভির দাদাঠাকুররা বলতে শুরু করলেন, এত ভয়ের কী আছে, এসআইআর তো প্রথম হচ্ছেনা, মাঝে মাঝেই হয়। আর তারপরই দেখা গেল শহরে গ্রামে নানা বস্তি ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। সর্বত্র বাংলাদেশীরা থাকত। দিনের বেলায় লোকে বাড়ি বন্ধ রেখে কাজ করতে গেছে, বিহারে ভোট দিতে গেছে, কে দেখতে যাচ্ছে পরীক্ষা করে। দরজা বন্ধ, বস্তি ফাঁকা, এসে গেল টিভিতে। এবং পলক ফেলতে না ফেলতেই দেখা গেল সীমান্তে ভিড়। দলে দলে বাংলাদেশী পালাচ্ছে। কোনো একটা চেকপোস্টে একশজন লোক অপেক্ষা করছেন, সেটা তো হয়েই থাকে, কিন্তু কে দেখবে পরীক্ষা করে। গোদি মিডিয়ার গলার জোর অসীম, সব প্রতিষ্ঠিত সত্য হয়ে গেল।
এইভাবেই তৈরি হয়ে গেল বাঙালি তাড়ানোর মতাদর্শগত ভিত্তি। বাঙালি ঠ্যাঙানো বাড়ল, সীমান্ত দিয়ে ঠেলে পাঠানো বাড়ল, চলতে থাকল এসআইআর। সবই আইনী, সবই বৈধ। আমাদের মতো এক আধজন এটা বাঙালির উপর আক্রমণ, নাগাড়ে বলে যাচ্ছিলেন, গোদি মিডিয়ার সামগ্রিক প্রচারযন্ত্রের কাছে কতটুকু, কিন্তু সেটাও বন্ধ করার আপ্রাণ চেষ্টা হল। কোথাও কোনো পাল্টা স্বর যেন শোনা না যায়। সেটা খানিকটা কাজও করল। পুশব্যাক, ঠ্যাঙানো, এসব নিয়ে বাঙালি প্রতিবাদীরা মোটামুটি চেপে গেলেন, পাছে কেউ তৃণমূল বলে দেয়, তার চেয়ে বাঙালি মরুক। এসআইআরের শুনানিটা চেপে যাওয়া সম্ভব হলনা। ওটাতেও “ভয় পাবেন না, আতঙ্ক ছড়াবেন না” বলা শুরু হয়েছিল, কিন্তু তাতে ভদ্রলোক এমনকি খ্যাতনামারাও ডাক পেতে শুরু করলেন। ততদিনে গুজরাতি কোম্পানি বুঝে গেছে, যা খুশি করা যায়, কিস্যু হবেনা। হলও না। এক বা দেড়কোটি লোককে এক কথায় “নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করো” বলে লাইনে দাঁড় করিয়ে দিলে যা হবার কথা, তার তুলনায় যা হল, তা ফুসকুড়ির মতো।
ফলে যখন লোকে লাইনে দাঁড়াচ্ছে, তখনও তৃণমূলের ডিজিটাল যোদ্ধার সমাবেশ চলছে, সিপিএমের চলছে ভেনেজুয়েলা মিছিল। কোনোটাতেই দোষের কিছু নেই, কিন্তু বাঙালির জাতীয় বিপর্যয় হচ্ছে একটা, সেরকম কোনো চৈতন্য দেখা যায়নি। ফাঁক বুঝে এইবার বাঙালি-ঠ্যাঙানো, এসআইআর এর সঙ্গে নামিয়ে দেওয়া হল ইডিকে। যা খুশি করা যায় ততক্ষণে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। গোদি মিডিয়ায় জল্পনা চলছে সবুজ ফাইলে কী আছে। এবং অবিশ্বাস্য হলেও সত্য সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মমতাকেই গ্রেপ্তারের দাবী তুলে ফেললেন। যেন বাঙালির উপরে কিচ্ছু হচ্ছেনা, এবং হবার কোনো সম্ভাবনাও নেই।
এত কিছু হবার পর শেষ পর্যায়ে সকলের টনক নড়েছে। তবুও খুবই সামান্য। কেবলমাত্র এসআইআরের দিকে। সিপিএম এবং মুখ্যমন্ত্রী উভয়েই কালকে জ্বালাময়ী সাংবাদিক সম্মেলন করেছেন। মহম্মদ সেলিম নির্বাচন কমিশনের অনাচারের কথা বললেন। মমতাও। বললেন, বিজেপির গাড়িভর্তি নাম বাদ দেওয়ার ফর্মের কথা। বললেন, গোবলয়ের মাইক্রো অবসার্ভারদের কথা। বললেন শুধু বাদ দেওয়া নয়, বিহার ঝাড়খন্ড থেকে ভুয়ো ভোটার আনা হবে। এতদিন দুই পক্ষই স্বপ্নের জগতে ছিল। একদল বলছিল, এত আক্রমণ করলে মানুষ জবাব দেবে। অন্যপক্ষ বলছিল, এত আক্রমণ করছে, নির্ঘাত সেটিং আছে। আসলে ওসব কিচ্চু না। যাদের ক্ষোভ আছে, তারা বাদ যাবে, আর গোবলয় থেকে লোক এনে লিস্টি ভর্তি করা হবে। এই তো হিসেব।
এবং এর পরেও বলছি, ওঁরা এখনও পুরোটা বোঝেননি। বোঝেননি, যে, এইটা একটা পুরোদস্তুর পরিকল্পনার অংশ। আনতাবড়ি কিচ্ছু হচ্ছে না। চারদিকে দেখতেই পাচ্ছেন কিছুদিন ধরেই হিন্দিকে রাষ্ট্রভাষা বলার প্রকোপ বেড়েছে। সেটাও এমনি হয়নি। এক কোটি বাঙালি বাদ যাবে, সে জায়গায় গোবলয় এসে বসবে, বাংলা হবে হিন্দুস্তান, বাঙালিরা যাক বাংলাদেশে, ভোট-টোটের আর কোনো মানে থাকবেনা, এই তো পুরোদস্তুর ব্যাপার।এবং এই পুরো আক্রমণ কোনো একটা দল বা গোষ্টীর পক্ষে থামানো সম্ভব না। সংস্কৃতি, রাজনীতি, এমনকি প্রযুক্তিতে সর্বাত্মক প্রতিরোধ দরকার।
এসব কথা অনেকদিন ধরে বলছি। তবু আরেকবার বলি। সজোরে এবং চিৎকার করে। বাংলার প্রতিটি অবিজেপি দলের কর্মী, সমর্থক, নেতা, এমনকি বিজেপিরও বাঙালি সমর্থকদের প্রতি আবেদন, এবার অন্তত বাংলাকে বাঁচাতে আওয়াজ তুলুন। প্রতিটি বাংলাবাদী সংগঠন আওয়াজ তুলুক। রাজনৈতিক নেতারা একসঙ্গে বসে আটকানোর নীতি-কৌশল ঠিক করুন। জল এতদূর গড়াতে দেওয়া হয়েছে, যে, এ ছাড়া আর কোনো উপায় নেই কিন্তু।
যাঁরা পড়লেন, এবং একমত হলেন, তাঁদের কাছেও একটা অনুরোধ, এই বার্তাটা ছড়িয়ে দিন। এত তাড়াতাড়ি লিখলাম, নিশ্চয়ই বানান, বাক্যগঠনে ভুল আছে। তবু ছড়ান। ইচ্ছে হলে এই লেখা কপি করুন, নাম দিয়ে, নাম ছাড়া, নিজের মতো করে লিখে, যেমন খুশি করে, যাকে পারুন পাঠান। যে কজন সুস্থ লোক আছেন, সুস্থ কিন্তু আপাত-বধির, রাজনৈতিক নেতা থেকে সাংস্কৃতিক কর্মী, শত্রু, বন্ধু, প্রত্যেকের কাছে পৌঁছনো দরকার। গোদি মিডিয়ার থেকে অনেক বেশি জোরে।
(সৌজন্যে: সৈকত বন্দ্যোপাধ্যায়-এর ফেসবুক।)
