ডেইলি ডোমকল, জেনেভা: পারমাণবিক অস্ত্র পরীক্ষার বিষাক্ত ছোবল থেকে রেহাই পায়নি পৃথিবীর একটি মানুষও। ১৯৪৫ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে পরিচালিত ২,৪০০টিরও বেশি পারমাণবিক বিস্ফোরণের ফলে সৃষ্ট ক্যানসার ও অন্যান্য রোগে এ পর্যন্ত অন্তত ৪০ লক্ষ মানুষের অকাল মৃত্যু হয়েছে। সম্প্রতি ‘নরওয়েজিয়ান পিপলস এইড’ (NPA) নামক মানবিক সংস্থার এক বিশেষ রিপোর্টে এই ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে।
রিপোর্টে জানানো হয়েছে, ১৯৪৫ সালের পর থেকে এ পর্যন্ত নয়টি দেশ— রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, পাকিস্তান, ভারত, ইসরায়েল এবং উত্তর কোরিয়া— পারমাণবিক অস্ত্রের মালিকানা অর্জন করেছে। যদিও ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে কেবল উত্তর কোরিয়াই পরীক্ষা চালিয়েছে, কিন্তু গত শতাব্দীতে হওয়া পরীক্ষাগুলোর বিষক্রিয়া আজও বিশ্ববাসীকে তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। এনপিএ প্রধান রেমন্ড জোহানসেন বলেন, “অতীতের পারমাণবিক পরীক্ষাগুলো আজও মানুষ মারছে।” তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, এই রিপোর্ট পারমাণবিক অস্ত্রের পুনরায় ব্যবহার বা পরীক্ষা রোধে বিশ্ব সম্প্রদায়ের সংকল্পকে আরও দৃঢ় করবে।
৩৭ বছর বয়সী তাহিতিয়ান সংসদ সদস্য হিনামুয়েুরা ক্রস এই ভয়াবহতার এক জীবন্ত সাক্ষী। ১৯৯৬ সালে যখন ফ্রান্স তাদের শেষ পারমাণবিক পরীক্ষা চালায়, তখন ক্রসের বয়স ছিল মাত্র সাত। এর সতেরো বছর পর তিনি লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত হন। তার পরিবারে দাদি, মা এবং খালা— প্রত্যেকেই থাইরয়েড ক্যানসারে ভুগছেন। ক্রসের অভিযোগ, “তারা আমাদের বিষ খাইয়ে মেরেছে। আমাদের গিনিপিগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে।”
গবেষণায় দেখা গেছে, ১৯৮০ সাল পর্যন্ত বায়ুমণ্ডলে চালানো পরীক্ষাগুলোর কারণেই অন্তত ২০ লক্ষ মানুষের অতিরিক্ত ক্যানসার মৃত্যু হতে পারে। এছাড়া হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকেও সমপরিমাণ মানুষের অকাল মৃত্যুর আশঙ্কা রয়েছে। রিপোর্টের সহ-লেখক টিলম্যান রাফ সতর্ক করে বলেন, “আয়নাইজিং রেডিয়েশন ডিএনএ-র বন্ধন ছিঁড়ে ফেলে কোষকে ক্যানসার আক্রান্ত করে তোলে। এর এমন কোনো নিরাপদ মাত্রা নেই যা মানুষের ক্ষতি করে না।” বিশেষ করে ভ্রূণ, শিশু এবং মহিলারা এর শিকারে বেশি পড়ছেন। নারীদের ক্ষেত্রে রেডিয়েশনজনিত ক্যানসারের ঝুঁকি পুরুষদের তুলনায় ৫২ শতাংশ বেশি।
এনপিএ-র ৩০৪ পৃষ্ঠার এই রিপোর্টে পরমাণু শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর চরম গোপনীয়তা ও উদাসীনতার কঠোর সমালোচনা করা হয়েছে। ব্রিটিশ ও মার্কিন পরীক্ষার প্রভাব সংক্রান্ত তথ্য আজও গোপন রাখা হয়েছে। ফরাসিরা তাদের পারমাণবিক বর্জ্য ঠিক কোথায় পুঁতে রেখেছে, তা প্রকাশ করেনি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, অধিকাংশ রাষ্ট্রই দায় এড়াতে নামমাত্র ক্ষতিপূরণ প্রকল্প চালু রেখেছে, যা ভুক্তভোগীদের সহায়তায় কার্যকর নয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গত বছরের নভেম্বরে পুনরায় পারমাণবিক পরীক্ষা শুরুর ইঙ্গিত দেওয়ার পর বিষয়টি নতুন করে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়নের প্রভাষক ইভানা হিউজ সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “এটি অত্যন্ত বিপজ্জনক। অতীতের পরীক্ষাগুলো আমাদের শিখিয়েছে যে এর পরিণতি অত্যন্ত দীর্ঘস্থায়ী এবং ভয়াবহ।” ১৯৫৪ সালে মার্শাল আইল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ‘ব্রাভো’ পরীক্ষার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, সেই বিস্ফোরণ ছিল হিরোশিমার চেয়ে ১,০০০ গুণ শক্তিশালী। সেখানে চুন ও তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের ছাই আকাশ থেকে তুষারের মতো ঝরে পড়েছিল, যা শিশুরা সাধারণ তুষার ভেবে খেলেছিল।
রিপোর্টটি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর পরিবেশ পরিষ্কার করা এবং ভুক্তভোগীদের যথাযথ স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ওপর জোর দিয়েছে। সংসদ সদস্য ক্রস বলেন, “আমরা শুধু বুঝতে চাই আমাদের সাথে কী ঘটেছিল। আমরা এই ট্রমা থেকে মুক্তি চাই।”
