নিজস্ব সংবাদদাতা, কলকাতা ও বহরমপুর: আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের রণকৌশল সাজাতে এবং সংখ্যালঘু ও সীমান্তবর্তী জেলা হিসেবে মুর্শিদাবাদের গুরুত্ব অনুধাবন করে জেলাবাসীকে বড় উপহার দিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। বৃহস্পতিবার রাজ্য বাজেটের দিনই বিধানসভায় এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা ঘোষণা করা হলো—মুর্শিদাবাদ জেলায় স্থাপিত হতে চলেছে দ্বিতীয় একটি বিশ্ববিদ্যালয়। এই নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম রাখা হয়েছে ‘মুর্শিদাবাদ হাজারদুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়’। একইসঙ্গে, এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে গড়ে তোলা হবে একটি ‘ঐতিহাসিক উৎকর্ষ কেন্দ্র’। রাজ্য মন্ত্রিসভার বৈঠকে এই প্রস্তাব অনুমোদিত হয়েছে এবং চলতি অধিবেশনেই এই সংক্রান্ত বিল পেশ করা হতে পারে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে।
শিক্ষার মানচিত্রে নতুন দিগন্ত
মুর্শিদাবাদ জেলায় ইতিমধ্যেই একটি বিশ্ববিদ্যালয় (মুর্শিদাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়) রয়েছে। সরকারি তরফে জানানো হয়েছে, জেলার বিশাল আয়তন এবং ক্রমবর্ধমান ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। হাজারদুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা স্থানীয় শিক্ষার মানচিত্রে এক নতুন দিগন্ত খুলে দেবে বলেই আশাবাদী শিক্ষা মহল। কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এই ঘোষণার নেপথ্যে কেবল শিক্ষার প্রসার দেখছেন না, বরং এর পেছনে লুকিয়ে থাকা গভীর রাজনৈতিক অঙ্ককেও বিশ্লেষণ করছেন। ভোটের ঠিক আগে এই ঘোষণা রাজ্যের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের একটি অত্যন্ত কৌশলী পদক্ষেপ হিসেবেই মনে করা হচ্ছে।
রাজনৈতিক সমীকরণ ও ‘হুমায়ুন ফ্যাক্টর’
মুর্শিদাবাদ রাজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যালঘু প্রধান জেলা। ভৌগোলিক অবস্থান এবং জনসংখ্যার বিন্যাসের কারণে এই জেলার রাজনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। বর্তমানে মুর্শিদাবাদের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য সবচেয়ে বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছেন দলেরই প্রাক্তন নেতা ও বর্তমান বিধায়ক হুমায়ুন কবির। নিজের নতুন দল গঠন এবং জেলায় তার ক্রমবর্ধমান দাপট তৃণমূলের ভাতের রাজনীতিতে বড়সড় প্রভাব ফেলছে। হুমায়ুন কবিরের নিজস্ব জনভিত্তি শাসক দলের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে সামনে এসেছে। এই পরিস্থিতিতে জেলায় উন্নয়নমূলক কাজের খতিয়ান তুলে ধরে ভোটারদের মন জয় করা তৃণমূলের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছে। ‘মুর্শিদাবাদ হাজারদুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়’ স্থাপন সেই লক্ষ্যেই একটি বড় পদক্ষেপ।
পরিযায়ী শ্রমিক ইস্যু ও ‘উন্নয়ন কার্ড’
সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিযায়ী শ্রমিকদের উপর হামলা এবং নিরাপত্তা নিয়ে শাসক দল কিছুটা ব্যাকফুটে রয়েছে। মুর্শিদাবাদের বহু মানুষ কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে যান। সেই শ্রমিকদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং কর্মসংস্থানের প্রশ্নে বিরোধী দলগুলি রাজ্য সরকারকে চেপে ধরছে। এই আবহে, শিক্ষার অধিকার এবং নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সুযোগ তৈরি করে তৃণমূল জনমানসে তাদের ‘উন্নয়ন’ ভাবমূর্তি ফেরাতে চাইছে।
ঐতিহাসিক উৎকর্ষ কেন্দ্রের গুরুত্ব
নতুন বিশ্ববিদ্যালয়টির নাম ‘হাজারদুয়ারি’ রাখার পেছনেও একটি বড় প্রতীকী বার্তা রয়েছে। মুর্শিদাবাদ বাংলার ইতিহাসের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ, বিশেষ করে নবাবী আমলের সাক্ষী। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি ‘ঐতিহাসিক উৎকর্ষ কেন্দ্র’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা জেলার পর্যটন এবং ঐতিহাসিক গবেষণার ক্ষেত্রে এক নতুন দ্বার উন্মোচন করতে পারে। এটি জেলার মানুষের আবেগ এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের একটি কৌশলগত প্রয়াস বলেও মনে করা হচ্ছে।
জনমানসে প্রভাব: প্রশ্ন ও সম্ভাবনা
বাজেটের দিন রাজ্য সরকারের এই ঘোষণা নিঃসন্দেহে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে। উচ্চশিক্ষার সুযোগ বৃদ্ধি পাওয়ায় ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকরা খুশি। কিন্তু, এই নতুন প্রতিষ্ঠান কত দ্রুত বাস্তব রূপ পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহলের মতে, এই ঘোষণা ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য একটি ‘ইমেজ বুস্টার’ হিসেবে কাজ করবে। তবে, মুর্শিদাবাদের মানুষ উন্নয়ন না কি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি—কোনটিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন, তা নির্বাচনের বাক্সে স্পষ্ট হবে। আপাতত, হাজারদুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘোষণা মুর্শিদাবাদের শিক্ষা ও রাজনীতির অঙ্গনে বড়সড় আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
