ডেইলি ডোমকল, তিরুবনন্তপুরম: ‘দ্য কেরালা স্টোরি’ সিনেমার সিক্যুয়েল বা দ্বিতীয় পর্বের ঘোষণা ঘিরে আবারও পারদ চড়ছে দক্ষিণের রাজনীতিতে। ‘কেরালা স্টোরি ২’ নিয়ে বৃহস্পতিবার এই সিনেমার তীব্র নিন্দা করলেন মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়ন। চলচ্চিত্রটিকে ঘৃণা ছড়ানোর হাতিয়ার বলে মন্তব্য করেছেন তিনি। বিজয়ন বলেন, রাজ্যের ধর্মনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি নষ্ট করতেই পরিকল্পিতভাবে এই ধরনের সিনেমা তৈরি করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ‘এক্স’-এ মুখ্যমন্ত্রী লিখেছেন, এই সিনেমার সিক্যুয়েল মুক্তির খবর অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা উচিত। বিজয়নের কথায়, “প্রথম পর্বের সাম্প্রদায়িক অ্যাজেন্ডা এবং নির্লজ্জ মিথ্যাচার মানুষ আগেই ধরে ফেলেছে। কেরালা আবারও ঘৃণা ছড়ানোর এই ঘৃণ্য প্রচেষ্টাকে প্রত্যাখ্যান করবে।” তিনি বিস্ময় প্রকাশ করে আরও বলেন, যেখানে সৃজনশীল শিল্পকে অনেক সময় বাধা দেওয়া হয়, সেখানে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে তৈরি এই ধরনের “মনগড়া কাহিনী” কীভাবে ছাড়পত্র পায়।
মুখ্যমন্ত্রী বিজয়ন এর আগে মুক্তি পাওয়া প্রথম সিনেমাটি নিয়েও সরব হয়েছিলেন। তাঁর দাবি, এই সিনেমাগুলো রাজ্যকে সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হিসেবে চিত্রিত করার একটি অপচেষ্টা। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সমাজকে বিভক্তকারী বিষাক্ত কাজগুলো যখন প্রদর্শনের সুযোগ পায়, তখন ‘বিফ’-এর মতো চলচ্চিত্র কেন চলচ্চিত্র উৎসবে নিষিদ্ধ করা হয়? মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পারস্পরিক সম্মতিতে হওয়া বিয়েকেও কেরালায় জোরপূর্বক ধর্মান্তর বা সাম্প্রদায়িকতার উদাহরণ হিসেবে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। কেরালার সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা-মুক্ত ঐতিহ্য এবং ভ্রাতৃত্ববোধকে যারা সহ্য করতে পারছে না, তারাই এই ষড়যন্ত্রের নেপথ্যে রয়েছে বলে তোপ দেগেছেন বিজয়ন। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, “কেরালা হলো ধর্মীয় সম্প্রীতি ও টেকসই উন্নয়নের মডেলে এগিয়ে থাকা একটি রাজ্য। একে সন্ত্রাসবাদের কেন্দ্র হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টাকে আমাদের সম্মিলিতভাবে রুখে দিতে হবে।” এইকসঙ্গে কেরালাবাসীকে মিথ্যা প্রচারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ থেকে ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শ বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
কেরালার মন্ত্রী এম বি রাজেশ এই ছবিটির তীব্র সমালোচনা করে অভিযোগ করেছেন, এটি রাজ্যকে কলঙ্কিত করার এবং কেরালার সামাজিক রেকর্ডকে ভুলভাবে উপস্থাপন করার একটি পরিকল্পিত প্রচেষ্টা। শুক্রবার এক সংবাদ সংস্থার সঙ্গে কথা বলার সময় মন্ত্রী রাজেশ বলেন, “যারা কেরালা সম্পর্কে এই ধরনের মিথ্যা গল্প প্রচার করছে, তারা আসলে কেরালার প্রকৃত ইতিহাস ও বর্তমান জানে না।”
তিনি রাজ্যের উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরে বলেন, ২৪০ বছরের পুরনো বিখ্যাত ‘লন্ডন টাইমস’ সম্প্রতি শিরোনাম করেছে যে কেরালা চরম দারিদ্র্য দূর করতে সক্ষম হয়েছে। গত ১০ বছরে কেরালা সরকার ৫ লক্ষ ঘর তৈরি করে দিয়েছে। রাজেশের কথায়, “দরিদ্র বা সংখ্যালঘুদের ঘর বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া কেরালার গল্প নয়, ঘর তৈরি করে দেওয়াটাই আসল গল্প।” মণিপুরের হিংসার প্রসঙ্গ টেনে মন্ত্রীর দাবি, মণিপুরের অশান্তির সময় সেখান থেকে পালিয়ে আসা মানুষদের কেরালা আশ্রয় দিয়েছে। আরএসএস আদর্শের মানুষজন কেরালার এই ভালোবাসার সংস্কৃতি বোঝেন না বলেই কেরালাবাসী তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন।
এদিকে পিডিপি বিধায়ক আগা সৈয়দ মুনতাজির মেহদি-ও ছবিটির সমালোচনা করে বলেন, একসময় বিনোদন জগত সামাজিক সমস্যা তুলে ধরার মাধ্যম ছিল। কিন্তু এখন তাকে মুসলিমদের অপমান করার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনরাই বিজয়নও তোপ দেগে বলেছিলেন, এই ছবির সিক্যুয়েল রাজ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার একটি চেষ্টা।
অন্যদিকে, ছবিটির সেন্সর সার্টিফিকেট বাতিলের দাবি জানিয়ে কেরালা হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেছেন কান্নুর জেলার বাসিন্দা শ্রীদেব নাম্বুদিরি। তাঁর অভিযোগ, এই ছবিতে কোনো ভিত্তি ছাড়াই একটি আস্ত রাজ্যকে নেতিবাচকভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শুক্রবার সেন্ট্রাল বোর্ড অফ ফিল্ম সার্টিফিকেশন এবং ছবির নির্মাতাদের নোটিশ জারি করেছে। আগামী মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি মামলার পরবর্তী শুনানি।
বিপুল অমৃতলাল শাহ এবং অমরনাথ ঝায়ের লেখা ও কামাখ্যা নারায়ণ সিং পরিচালিত এই ছবিতে হিন্দু মহিলাদের ধর্মান্তরিত করার বিষয়টিকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। ছবিতে মুখ্য ভূমিকায় রয়েছেন উল্কা গুপ্তা, অদিতি ভাটিয়া এবং ঐশ্বর্য ওঝা। আগামী ২৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ ছবিটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়ার কথা রয়েছে। তবে মুক্তির আগেই রাজনৈতিক বিতর্ক এবং আইনি জটিলতা ছবিটিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে। উল্লেখ্য, সিনেমার প্রথম পর্বটি নিয়ে দেশজুড়ে প্রবল বিতর্ক তৈরি হলেও ৭১তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে এটি সেরা পরিচালনা এবং সেরা সিনেমাটোগ্রাফির পুরস্কার জিতেছিল।
