TOP NEWS

একচ্ছত্র ক্ষমতা ও তিন দশকের নেতৃত্ব: কেমন ছিল খামেনি অধ্যায়?

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা নিহত হয়েছেন—এমন ঘোষণার পর মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি এক অনিশ্চিত সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। শনিবারের এই হামলাকে বিশ্লেষকেরা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের জন্য ‘ওয়াটারশেড’ বা মোড় ঘোরানো মুহূর্ত হিসেবে বর্ণনা করছেন। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের চূড়ান্ত রাজনৈতিক, সামরিক ও আদর্শিক কর্তৃত্ব ধরে রাখা ৮৬ বছর বয়সী এই ধর্মীয় নেতার মৃত্যু ইরানের ক্ষমতার কাঠামো ও আঞ্চলিক সমীকরণে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে।

খামেনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান ও সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক। তাঁর সিদ্ধান্ত প্রেসিডেন্ট ও পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তকেও ছাপিয়ে যেত। সশস্ত্র বাহিনী, বিচারব্যবস্থা, পররাষ্ট্রনীতি—সবক্ষেত্রেই তাঁর প্রভাব ছিল নিরঙ্কুশ। ১৯৮৯ সালে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা -এর মৃত্যুর পর তিনি সর্বোচ্চ নেতার দায়িত্ব নেন এবং এরপর থেকে ইরান-ইরাক যুদ্ধ-পরবর্তী পুনর্গঠন, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা, কূটনৈতিক একঘরে অবস্থা, অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা ও ওয়াশিংটন–তেল আবিবের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান সংঘাত—সবকিছুর মধ্য দিয়ে দেশকে নেতৃত্ব দেন। সমর্থকদের কাছে খামেনি ছিলেন বিদেশি চাপের বিরুদ্ধে ইরানের সার্বভৌমত্বের অটল রক্ষক। সমালোচকদের দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন এমন এক অনমনীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতীক, যা সংস্কার ও ভিন্নমতকে স্থান দেয়নি।

শৈশব, ধর্মীয় শিক্ষা ও প্রারম্ভিক রাজনীতি

১৯৩৯ সালের ১৯ এপ্রিল ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় শহরে এক সাধারণ ধর্মীয় পরিবারে জন্ম নেন আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি মাশহাদের সেমিনারিতে ইসলামি শিক্ষায় মনোনিবেশ করেন এবং পরে উচ্চতর ধর্মতাত্ত্বিক প্রশিক্ষণ নেন। কবিতা ও সাহিত্যেও তাঁর গভীর আগ্রহ ছিল। ষাটের দশকের শুরুতে তিনি খামেনির নেতৃত্বে শাহবিরোধী আন্দোলনে যোগ দেন। ১৯৬৩ সাল থেকে শাহের শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সংগঠিত করা ও সরকারবিরোধী লিফলেট বিতরণের অভিযোগে একাধিকবার গ্রেপ্তার হন। শাহের গোয়েন্দা সংস্থা তাঁকে আটক করে এবং কয়েক দফা নির্বাসনে পাঠায়। ১৯৭৮-৭৯ সালে গণআন্দোলনে রাজতন্ত্র দুর্বল হলে রাজনৈতিক বন্দী ও নির্বাসিতরা জনজীবনে ফেরেন। খামেনি মাশহাদসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ সংগঠিত করে খোমেনির বিপ্লবী এজেন্ডার পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তোলেন।

ক্ষমতায় আরোহন ও সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে উত্থান

১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর খামেনি বিপ্লবী কাউন্সিলে যোগ দেন এবং দ্রুত নতুন ক্ষমতার কাঠামোয় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন। তিনি উপ-প্রতিরক্ষামন্ত্রী, তেহরানের জুমার নামাজের ইমাম ও সংসদ সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট হত্যার পর খামেনি প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন এবং ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৮১ সালেই এক মসজিদে ভাষণ দেওয়ার সময় টেপরেকর্ডারের ভেতরে লুকানো বোমা বিস্ফোরণে তিনি প্রাণে বেঁচে যান, তবে তাঁর ডান হাত স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর ইরানের বিশেষজ্ঞ পরিষদ তাঁকে সর্বোচ্চ নেতা নিয়োগ দেয়। পরে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে এই পদকে রাজনৈতিক ব্যবস্থার শীর্ষে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। শুরুতে আপসপ্রার্থী নেতা হিসেবে দেখা হলেও সময়ের সঙ্গে তিনি নির্বাহী ও আইনসভা উভয় শাখার ওপর সর্বোচ্চ নেতার কার্যালয়ের ক্ষমতা দৃঢ় করেন।

অভ্যন্তরীণ রাজনীতি: সংস্কার বনাম রক্ষণশীলতা

খামেনির আমলে ইরানের রাজনীতি সংস্কারপন্থী ও রক্ষণশীল ধারার টানাপোড়েনে দুলেছে। ১৯৯৭ সালে সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট -এর বিজয়ে জনমনে আশার সঞ্চার হলেও পশ্চিমের সঙ্গে সম্পর্ক উন্মুক্ত করার উদ্যোগে খামেনি সীমা টেনে দেন। রক্ষণশীল প্রেসিডেন্ট তাঁর নীতির সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিলেন, যদিও ২০০৯ সালের বিতর্কিত নির্বাচনের পর দেশজুড়ে বিক্ষোভ দেখা দেয়।

পরে প্রেসিডেন্ট কূটনৈতিক সম্পৃক্ততার পথে হাঁটেন এবং পারমাণবিক আলোচনায় অগ্রগতি আনেন। আর প্রেসিডেন্ট খামেনির নীতির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখেন। ২০২২ সালে নৈতিকতা পুলিশের হেফাজতে মৃত্যুর পর দেশজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে, যা সামাজিক ক্ষোভকে উন্মোচিত করে। ২০২৫ সালের শেষ দিকে অর্থনৈতিক সংকটকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রতিবাদও পরে সরকারবিরোধী গণআন্দোলনে রূপ নেয়। সহিংস দমন-পীড়নে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয় বলে ইরানি কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে।

পারমাণবিক কর্মসূচি ও পশ্চিমের সঙ্গে টানাপোড়েন

খামেনির শাসনামলের অন্যতম কেন্দ্রীয় ইস্যু ছিল ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি। পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কঠোর নিষেধাজ্ঞা ইরানের অর্থনীতিকে চাপে ফেলে। ২০১৫ সালে ইরান ও বিশ্বশক্তির মধ্যে (জেসিপিওএ) স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে পারমাণবিক কার্যক্রম সীমিত করার বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পথ খোলে।

খামেনি আলোচনায় অনুমোদন দিলেও ওয়াশিংটনের প্রতি সংশয় বজায় রাখেন। ২০১৮ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিলে এবং নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করলে চুক্তি কার্যত ভেঙে পড়ে। এরপর ইরানও ধাপে ধাপে প্রতিশ্রুতি কমিয়ে আনে।

মৃত্যুর আগে ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পরোক্ষ পারমাণবিক আলোচনা চলছিল। যুক্তরাষ্ট্র স্থায়ী বিধিনিষেধ ও সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুদে সীমা চাইছিল; ইরান সমৃদ্ধকরণের অধিকার ছাড়তে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবি তোলে। খামেনি বরাবরই পারমাণবিক কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ বলে দাবি করেছেন এবং নিষেধাজ্ঞাকে ‘অর্থনৈতিক জবরদস্তি’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

আঞ্চলিক জোট ও ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’

ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সমর্থন খামেনেইর আদর্শিক অবস্থানের কেন্দ্রে ছিল। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর তিনি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কড়া ভাষায় অবস্থান নেন এবং বিভিন্ন দেশকে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নের আহ্বান জানান খামেনি।

ইরানের কৌশলের অন্যতম স্তম্ভ ছিল আঞ্চলিক মিত্রদের সমর্থন—লেবাননে , ইরাক ও ইয়েমেনের সশস্ত্র গোষ্ঠীসহ এক জোট, যাকে তেহরান ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বলে বর্ণনা করে। এই নেটওয়ার্কের লক্ষ্য ছিল ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব মোকাবিলা করা।

যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের সঙ্গে চূড়ান্ত সংঘাত

খামেনি দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। গত বছর ইসরায়েলের বিমান হামলার জবাবে তেহরানের পাল্টা আক্রমণের পর আঞ্চলিক উত্তেজনা তীব্র হয়। তিনি তেল আবিবের সঙ্গে আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার অঙ্গীকার করেন।

খামেনির মৃত্যুর ঘোষণা দিয়ে ট্রাম্প বলেন, উন্নত গোয়েন্দা ও নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে তাঁকে এড়ানোর সুযোগ ছিল না এবং ইসরায়েলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে এই অভিযান পরিচালিত হয়েছে। তিনি ইরানি জনগণকে “নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধার”-এর আহ্বানও পুনর্ব্যক্ত করেন।

উত্তরাধিকার ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

খামেনির মৃত্যু মধ্যপ্রাচ্যের আধুনিক ইতিহাসের এক প্রভাবশালী অধ্যায়ের সমাপ্তি। তাঁর নেতৃত্ব ইরানের আদর্শিক পরিচয়, আঞ্চলিক জোট ও পশ্চিমের সঙ্গে দীর্ঘ সংঘাতকে সংজ্ঞায়িত করেছে। এখন প্রশ্ন—কে হবেন তাঁর উত্তরসূরি এবং ক্ষমতার রদবদল কীভাবে সামাল দেবে তেহরান?

নেতৃত্ব পরিবর্তনের এই সন্ধিক্ষণে ইরানকে একদিকে উত্তরাধিকার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে, অন্যদিকে তীব্র আঞ্চলিক উত্তেজনা ও নাজুক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। খামেনি-পরবর্তী ইরান কোন পথে হাঁটবে—সংঘাত, সমঝোতা, নাকি নতুন কোনো রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস—তা নির্ধারণ করবে শুধু তেহরানের ভবিষ্যৎ নয়, গোটা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিও।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!