TOP NEWS

আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা: যুদ্ধের নতুন অস্ত্র এখন এআই!

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ আর শুধু মোবাইলে ছবি এডিট করা, ভাষা অনুবাদ করা বা দৈনন্দিন কাজের সহকারী হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে এআই এখন এমন এক শক্তিতে পরিণত হয়েছে, যা কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লক্ষ্য নির্ধারণ করে আঘাত হানতে সক্ষম। সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার ঘটনায় এই প্রযুক্তির শক্তি আবারও সামনে এসেছে।

ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে ইরানের একাধিক সামরিক স্থাপনা ও বাঙ্কারে হামলা চালানো হয়। এই অভিযানে ব্যবহৃত হয়েছিল উন্নত এআই-ভিত্তিক যুদ্ধ বিশ্লেষণ ব্যবস্থা, যা যুদ্ধক্ষেত্রের বিপুল তথ্য বিশ্লেষণ করে দ্রুত আক্রমণের পরিকল্পনা তৈরি করতে সাহায্য করে।

যুদ্ধের নতুন মুখ: এআই

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের ফলে সামরিক কৌশল ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। আগে কোনো লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করতে বা হামলার পরিকল্পনা করতে যেখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় লাগত, সেখানে এখন এআই কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই সেই কাজ সম্পন্ন করতে পারে। এআই-চালিত সেন্সর ড্রোন, স্যাটেলাইট এবং বিভিন্ন নজরদারি ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগ্রহ করা হাজার হাজার ডেটা বিশ্লেষণ করে। এরপর সিস্টেম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সম্ভাব্য লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং হামলার বিভিন্ন বিকল্প তৈরি করে দেয়।

‘ম্যাভেন’ সিস্টেমের ভূমিকা

এই অভিযানের কেন্দ্রে ছিল ‘ম্যাভেন স্মার্ট সিস্টেম’ নামে একটি এআই-ভিত্তিক রিয়েল-টাইম যুদ্ধ বিশ্লেষণ প্ল্যাটফর্ম। এটি তৈরি করেছে মার্কিন প্রযুক্তি সংস্থা। ম্যাভেন এমন একটি সিস্টেম যা যুদ্ধক্ষেত্রে যানবাহন, অস্ত্র বা ভবনের মতো লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত ও শ্রেণিবিন্যাস করতে পারে। ড্রোনের ভিডিও, স্যাটেলাইট ছবি এবং বিভিন্ন সেন্সর থেকে তথ্য নিয়ে এটি দ্রুত বিশ্লেষণ করে। এর ফলে লক্ষ্য নির্ধারণের সময় ঘণ্টা থেকে কমে এক মিনিটেরও কমে নেমে এসেছে।

মার্কিন সামরিক সূত্র অনুযায়ী, ফেব্রুয়ারির ওই অভিযানের সময় ম্যাভেন হাজারেরও বেশি সম্ভাব্য হামলার বিকল্প তৈরি করে দেয়। যদিও চূড়ান্ত হামলা মানুষের নির্দেশেই চালানো হয়েছিল, কিন্তু যে বিশ্লেষণ করতে মানুষের কয়েক দিন লাগতে পারত, সেটি এআই কয়েক মিনিটেই সম্পন্ন করে।

‘গোথাম’: নজরদারির শক্তিশালী হাতিয়ার

ম্যাভেনের পাশাপাশি মার্কিন প্রতিরক্ষা ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো বহু বছর ধরে ব্যবহার করছে আরেকটি সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম ‘গোথাম’। এটিও তৈরি করেছে। গোথাম মূলত জটিল গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণ, সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলা এবং হুমকি শনাক্ত করার কাজে ব্যবহৃত হয়। এই সফটওয়্যার বিভিন্ন তথ্যসূত্র একত্রিত করে সম্ভাব্য অপরাধী বা সন্দেহভাজনদের নেটওয়ার্ক বিশ্লেষণ করতে পারে।

তবে এর নজরদারি ক্ষমতা নিয়ে বিতর্কও রয়েছে। তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, এই সফটওয়্যার একজন মানুষের পারিবারিক সম্পর্ক, ব্যবসায়িক যোগাযোগ, ফোন নম্বর, ইমেল, এমনকি পূর্ববর্তী ঠিকানাও বিশ্লেষণ করতে সক্ষম। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু আইন প্রয়োগকারী সংস্থা অপরাধী শনাক্ত করতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে।

‘ল্যাটিস’: যুদ্ধক্ষেত্রের তাৎক্ষণিক চিত্র

এআই-নির্ভর সামরিক প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ নাম ‘ল্যাটিস’। এটি তৈরি করেছে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি সংস্থা। ল্যাটিস এমন একটি সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্ম যা হাজার হাজার সেন্সর ও ডেটা উৎসকে একত্র করে যুদ্ধক্ষেত্রের একটি রিয়েল-টাইম চিত্র তৈরি করে। এর মাধ্যমে সামরিক বাহিনী দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে এবং কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে হামলার নির্দেশ দেওয়া সম্ভব হয়। কোম্পানির দাবি, এই প্রযুক্তি ডেটাকে দ্রুত সিদ্ধান্তে এবং সিদ্ধান্তকে দ্রুত পদক্ষেপে রূপান্তর করতে সক্ষম—যা মানুষের সক্ষমতার চেয়েও দ্রুত।

‘হাইভমাইন্ড’: মানবহীন যুদ্ধবিমান

এআই-চালিত যুদ্ধ প্রযুক্তির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্ভাবন ‘হাইভমাইন্ড’, যা তৈরি করেছে প্রতিরক্ষা সংস্থা। এই প্রযুক্তি এমন স্বয়ংক্রিয় এআই পাইলট তৈরি করেছে, যা কোনো মানব নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই ড্রোন বা যুদ্ধবিমান পরিচালনা করতে পারে। এমনকি যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে গেলেও বা শত্রু পক্ষ জ্যামিং করলেও এই সিস্টেম নিজে থেকেই মিশন সম্পন্ন করতে পারে। হাইভমাইন্ড একাধিক ড্রোনকে একসঙ্গে সমন্বয় করে পরিচালনা করতে পারে, যা ‘ড্রোন সোয়ার্ম’ বা ড্রোন ঝাঁক হিসেবে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহার করা সম্ভব।

নৈতিক প্রশ্নও বাড়ছে

যুদ্ধক্ষেত্রে এআই ব্যবহারের সঙ্গে সঙ্গে নৈতিক প্রশ্নও সামনে আসছে। সমালোচকদের মতে, যদি মেশিন কোনো লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে হামলার সুপারিশ করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের দায়িত্ব কার—মানুষের নাকি প্রযুক্তির? তবে এআই-চালিত প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির প্রবক্তারা মনে করেন, জীবন-মৃত্যুর মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করা উচিত। তাদের মতে, এআই ব্যবহার করলে ভুল কমতে পারে এবং সামরিক বাহিনী দ্রুত ও নির্ভুল সিদ্ধান্ত নিতে পারে।

যুদ্ধের ভবিষ্যৎ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এআই-নির্ভর যুদ্ধ প্রযুক্তি আগামী দিনে আরও বিস্তৃত হবে। ড্রোন, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র, রিয়েল-টাইম ডেটা বিশ্লেষণ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মিলিয়ে যুদ্ধক্ষেত্র এক নতুন যুগে প্রবেশ করছে।
একসময় যে প্রযুক্তি মানুষের ছবি সুন্দর করার জন্য ব্যবহৃত হত, আজ সেই প্রযুক্তিই যুদ্ধক্ষেত্রে লক্ষ্য নির্ধারণ করে আকাশ থেকে বোমা ফেলতে সাহায্য করছে—এটাই আধুনিক যুদ্ধের নতুন বাস্তবতা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!