ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: ফেব্রুয়ারি ২৮ তারিখে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে সমন্বিত ‘প্রি-এম্পটিভ’ সামরিক হামলা চালায়। এর জবাবে ইরান ইসরায়েলের সামরিক স্থাপনা এবং পশ্চিম এশিয়াজুড়ে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোর দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ‘কামিকাজে’ ড্রোন হামলা চালায়। এই সংঘাত আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে, বিশেষ করে চীনের ভূমিকা ও স্বার্থ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা -এর হত্যাকাণ্ড “একটি সার্বভৌম দেশের নেতাকে প্রকাশ্য হত্যার শামিল, যা আন্তর্জাতিক আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং শাসন পরিবর্তনের অগ্রহণযোগ্য প্রচেষ্টা।” একই সঙ্গে বেইজিং অবিলম্বে সামরিক অভিযান বন্ধের আহ্বান জানায় এবং ইরানে অবস্থানরত চীনা নাগরিকদের দেশ ছাড়ার পরামর্শ দেয়।
চীন–ইরান সম্পর্কের মূল ভিত্তি: তেল
চীন ও ইরানের সম্পর্কের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো জ্বালানি বাণিজ্য। বিশ্বের অন্যতম বড় জ্বালানি আমদানিকারক চীন বর্তমানে ইরানের প্রায় ৮০ শতাংশ তেল রপ্তানি গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরান তার তেল কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় বেইজিং এই সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই তেল বাণিজ্যই দুই দেশের সম্পর্কের কেন্দ্রবিন্দু। সামরিক সহযোগিতা থাকলেও তা তুলনামূলকভাবে সীমিত এবং সতর্কতার সঙ্গে পরিচালিত হয়।
নিষেধাজ্ঞার জটিলতা
ইরান বহু বছর ধরেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং অস্ট্রেলিয়া ইরানের কাছে অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তি সরবরাহের ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পাশাপাশি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ২০২৫ সালের আগস্টে ‘স্ন্যাপব্যাক’ ব্যবস্থার মাধ্যমে পুরনো নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহালের পথও খোলা রাখে।
এই পরিস্থিতিতে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে এসব নিষেধাজ্ঞা ভঙ্গ করা থেকে বিরত থেকেছে। তবে গত বছরের জুনে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে সংঘটিত ‘বারো দিনের যুদ্ধ’-এর পর আঞ্চলিক উত্তেজনা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীন ও ইরানের সামরিক সহযোগিতা কিছুটা বেড়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
চীনের জন্য এটি এক ধরনের কৌশলগত লাভ। একদিকে তারা কম দামে ইরানের তেল নিশ্চিত করতে পারে, অন্যদিকে পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রকে ব্যস্ত রাখার একটি কৌশলগত চাপও বজায় থাকে—কিন্তু এতে চীনের নিজস্ব সেনা মোতায়েনের প্রয়োজন পড়ে না।
চীনা অস্ত্র ব্যবস্থার ব্যবহার
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানা গেছে, ইরান চীন থেকে উন্নত বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কিনেছে। এর মধ্যে রয়েছে HQ-9, HQ-16 এবং স্বল্পপাল্লার HQ-17AE মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। তবে মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার সময় এসব প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনা বা নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোকে পুরোপুরি রক্ষা করতে পারেনি বলে জানা গেছে।
অন্যদিকে চীনের YLC-8B অ্যান্টি-স্টেলথ রাডার তুলনামূলকভাবে ভালো পারফরম্যান্স দেখিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। নিম্ন-ফ্রিকোয়েন্সিতে কাজ করার কারণে এই রাডারগুলো স্টেলথ প্রযুক্তি ব্যবহার করা বিমানকে আগের রুশ রাডারের তুলনায় দূর থেকে শনাক্ত করতে পেরেছিল।
আক্রমণাত্মক অস্ত্র কেনার পরিকল্পনা
প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার পাশাপাশি ইরান আক্রমণাত্মক অস্ত্রশস্ত্রেও চীনের দিকে ঝুঁকছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান চীনের CM-302 সুপারসনিক অ্যান্টি-শিপ ক্রুজ মিসাইল কেনার জন্য একটি চুক্তি চূড়ান্ত করার পথে রয়েছে। যদিও বেইজিং এই দাবি অস্বীকার করেছে।
প্রায় ২৯০ কিলোমিটার পাল্লার এই ক্ষেপণাস্ত্র সমুদ্রপৃষ্ঠের খুব কাছ দিয়ে দ্রুতগতিতে উড়তে পারে, যা জাহাজের রাডার এড়িয়ে যেতে সক্ষম। এর লক্ষ্য হতে পারে পারস্য উপসাগর বা আরব সাগরে অবস্থান করা মার্কিন যুদ্ধজাহাজ বা বিমানবাহী রণতরী।
ড্রোন ও স্যাটেলাইট সহায়তার অভিযোগ
মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তরের ২০২৫ সালের ‘চায়না মিলিটারি পাওয়ার রিপোর্ট’-এ দাবি করা হয়, চীনের কিছু বেসরকারি স্যাটেলাইট কোম্পানি ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এবং ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীদের গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ করেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবং -এর মতো প্রতিষ্ঠান ইরানের সঙ্গে স্যাটেলাইট সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করেছে।
২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মার্কিন ট্রেজারি বিভাগের অফিস অফ ফরেন অ্যাসেটস কন্ট্রোল (OFAC) আটটি চীনা কোম্পানিকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় যুক্ত করে। অভিযোগ ছিল, তারা হুথি গোষ্ঠীকে সামরিক সরঞ্জাম ও দ্বৈত ব্যবহারযোগ্য প্রযুক্তি সরবরাহ করেছে। চীন অবশ্য এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, আঞ্চলিক স্বার্থের কারণে পরোক্ষ সহযোগিতার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
যৌথ সামরিক মহড়া
চীন, ইরান এবং রাশিয়া সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একাধিক যৌথ নৌ মহড়া চালিয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে ষষ্ঠবারের মতো তিন দেশ হরমুজ প্রণালিতে যৌথ নৌ মহড়া পরিচালনা করে। তার আগে ২০২৫ সালের মার্চে ওমান উপসাগরে অনুরূপ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। এই মহড়াগুলোর উদ্দেশ্য মূলত আঞ্চলিক সমুদ্রপথে সামরিক উপস্থিতি ও সমন্বয় প্রদর্শন করা।
সতর্ক কৌশল
সবকিছু মিলিয়ে চীন পশ্চিম এশিয়ায় একটি অত্যন্ত সতর্ক ও ঝুঁকিহীন কৌশল অনুসরণ করছে। বেইজিং নিজেকে ‘দায়িত্বশীল বড় শক্তি’ হিসেবে তুলে ধরতে চায় এবং প্রকাশ্যে ইরানের সঙ্গে সামরিক জোটের কথা উল্লেখ করা থেকে বিরত থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীন ইরানকে জ্বালানি নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখে। তবে তারা ইরানের পারমাণবিক অস্ত্র কর্মসূচিকে প্রকাশ্যে সমর্থন করে না এবং ইরানের জন্য সরাসরি যুদ্ধে জড়ানোর কোনো ইচ্ছাও দেখায়নি।
পশ্চিম এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘ সামরিক জড়িয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়েই বেইজিং একটি ভারসাম্যপূর্ণ কৌশল বজায় রাখার চেষ্টা করছে—যেখানে অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত করা হয়, কিন্তু সরাসরি সংঘাতে জড়ানোর ঝুঁকি কম রাখা হয়।
