ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল এক সপ্তাহ আগে ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক হামলা শুরু করার পর থেকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে বারবার পরিবর্তন দেখা গেছে। কখনও তিনি বলেছেন, উদ্দেশ্য ইরানের জনগণকে নিজেদের দেশ পুনরুদ্ধারে সহায়তা করা; কখনও বলেছেন “তাৎক্ষণিক ইরানি হুমকি” ধ্বংস করা; আবার কখনও ইরানে শাসন পরিবর্তনের কথা বলেছেন। এমনকি এক পর্যায়ে তিনি নিজেই ইরানের পরবর্তী নেতা নির্বাচনে ভূমিকা রাখতে চান বলে মন্তব্য করেন। আর সপ্তম দিনে এসে ট্রাম্প ইরানের কাছে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করেছেন। অন্যদিকে, ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারাও ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা অনেক ক্ষেত্রেই প্রেসিডেন্টের বক্তব্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগন এই সামরিক অভিযানের নাম দিয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’। অভিযানের প্রথম দিনেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সমন্বিত হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনেই নিহত হন বলে জানানো হয়। এর জবাবে তেহরান ইসরায়েল এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা কয়েকটি দেশের দিকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পরও ট্রাম্পের প্রকৃত লক্ষ্য কী—তা স্পষ্ট নয়। তার নিজের বক্তব্যই ইঙ্গিত দিচ্ছে যে পরিকল্পনা নিয়ে এখনও অনিশ্চয়তা রয়েছে।
প্রথম দিন: ‘ইরানের হুমকি প্রতিহত করার লড়াই’
২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প তার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশালে আট মিনিটের এক ভিডিও বার্তায় অভিযানের ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ইরানের দীর্ঘদিনের আগ্রাসনের জবাব দিতেই এই হামলা। ট্রাম্প অভিযোগ করেন, তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে অস্বীকার করেছে এবং এমন ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে যা মার্কিন সেনা ও মিত্রদের জন্য হুমকি। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র শিল্প “মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দেবে” এবং দেশটির নৌবাহিনী “সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেবে”। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জনগণের উদ্দেশেও আহ্বান জানান।
“তোমাদের স্বাধীনতার সময় এসে গেছে,”—বলে ট্রাম্প ইরানিদের নিজ সরকারের বিরুদ্ধে উঠে দাঁড়াতে আহ্বান জানান। তবে হামলার কয়েক ঘণ্টা পরই তার বক্তব্যে ভিন্ন সুর শোনা যায়। সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, তার সামনে একাধিক বিকল্প রয়েছে। “আমি চাইলে দীর্ঘ অভিযান চালিয়ে পুরো বিষয়টি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারি, আবার দুই-তিন দিনের মধ্যেই শেষ করে ইরানকে বলতে পারি—‘কয়েক বছর পরে আবার দেখা হবে, যদি তোমরা আবার ক্ষেপণাস্ত্র বা পারমাণবিক কর্মসূচি শুরু করো,’” বলেন ট্রাম্প। একই দিন জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের মিশন জাতিসংঘ সনদের ৫১ নম্বর অনুচ্ছেদ—যা আত্মরক্ষার অধিকার দেয়—উল্লেখ করে হামলার আইনি ভিত্তি তুলে ধরার চেষ্টা করে।
দ্বিতীয় দিন: ‘তাৎক্ষণিক হুমকি’ দাবিতে ফাটল
যুদ্ধের দ্বিতীয় দিনে কংগ্রেস সদস্যদের সঙ্গে বন্ধদ্বার বৈঠকে ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, এমন কোনো গোয়েন্দা তথ্য ছিল না যে ইরান আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হামলার পরিকল্পনা করছিল। এই স্বীকারোক্তি সরাসরি হোয়াইট হাউসের সেই দাবি দুর্বল করে দেয়, যেখানে বলা হয়েছিল ইরানের “তাৎক্ষণিক হুমকি” প্রতিহত করতেই হামলা চালানো হয়েছে।
তৃতীয় দিন: শাসন পরিবর্তন কি লক্ষ্য?
২ মার্চ প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ যুদ্ধকে একটি সীমিত সামরিক অভিযান হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করেন। তিনি বলেন, “অপারেশন এপিক ফিউরির লক্ষ্য অত্যন্ত স্পষ্ট—ইরানের আক্রমণাত্মক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা, ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদন ব্যবস্থা ধ্বংস করা, তাদের নৌবাহিনী ও নিরাপত্তা অবকাঠামো ভেঙে দেওয়া, যাতে তারা কখনও পারমাণবিক অস্ত্র না পায়।” হেগসেথ আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সরকার উৎখাতের চেষ্টা করছে না। “এটি কোনো তথাকথিত রেজিম-চেঞ্জ যুদ্ধ নয়। তবে সরকার বদলে গেছে, আর পৃথিবী এর জন্য ভালো অবস্থায় আছে,”—মন্তব্য করেন তিনি।
তবে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও যুদ্ধের সময় নির্ধারণ নিয়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেন। রুবিও বলেন, ওয়াশিংটন জানত ইসরায়েল ইরানের ওপর হামলা চালাতে যাচ্ছে এবং তাতে ইরান মার্কিন বাহিনীর ওপর পাল্টা আঘাত হানবে। তাই আগাম হামলা চালানো হয়েছে।
চতুর্থ দিন: নিজের কর্মকর্তাকেই খণ্ডন ট্রাম্পের
৩ মার্চ সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প রুবিওর ব্যাখ্যা প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, সিদ্ধান্তটি তার একক সিদ্ধান্ত ছিল এবং এটি ইসরায়েলের পরিকল্পনার কারণে নয়। “আলোচনা যেভাবে এগোচ্ছিল, তাতে আমার মনে হয়েছে তারা আগে আক্রমণ করতে পারে। তাই আমি তা হতে দিতে চাইনি,”—বলেন ট্রাম্প। পরে রুবিও তার মন্তব্যের ব্যাখ্যা দিয়ে বলেন, তার বক্তব্য ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
পঞ্চম দিন: ‘আমরা মাত্র শুরু করেছি’
৪ মার্চ পেন্টাগনের আরেকটি ব্রিফিংয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ জানান, অল্প সময়ের মধ্যেই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিমানবাহিনী ইরানের আকাশ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেবে। তিনি বলেন, “আমরা ইরানের আকাশে উড়ব, তাদের রাজধানীর ওপর দিয়ে উড়ব। ইরানের নেতারা প্রতিদিন আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখবে শুধু মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান।” হেগসেথ আরও বলেন, “ইরানি শাসনব্যবস্থা শেষ হয়ে গেছে—তারা এখনই না জানলেও খুব শিগগিরই বুঝবে। আমরা মাত্র চার দিনেই তাদের সামরিক সক্ষমতা ধ্বংস করার কাজ শুরু করেছি।”
ষষ্ঠ দিন: ইরানের নতুন নেতা বাছাইয়ে ট্রাম্প?
৫ মার্চ ট্রাম্প আবারও নতুন মন্তব্য করেন। তিনি জানান, ইরানের নতুন নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় তিনি ব্যক্তিগতভাবে যুক্ত থাকতে চান। অ্যাক্সিওসকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, নিহত সর্বোচ্চ নেতা খামেনেইর ছেলে মোজতবা খামেনেইকে তিনি গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। “ওরা সময় নষ্ট করছে। খামেনেইর ছেলে খুবই দুর্বল। ভেনেজুয়েলার মতো এখানেও আমাকে নেতৃত্ব নির্বাচনে যুক্ত থাকতে হবে,”—বলেন ট্রাম্প। তিনি আরও বলেন, “আমরা এমন একজনকে চাই, যিনি ইরানে শান্তি ও স্থিতি আনতে পারবেন।”
সপ্তম দিন: ‘নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ’
৬ মার্চ সকালে ট্রুথ সোশালে ট্রাম্প সরাসরি ইরানের কাছে “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” দাবি করেন। তিনি লেখেন, “ইরানের সঙ্গে কোনো চুক্তি হবে না—শুধু নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এরপর আমরা একটি ভালো ও গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচন করব।” পোস্টে তিনি আরও দাবি করেন, আত্মসমর্পণের পর যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরান পুনর্গঠনে সহায়তা করবে। “ইরানের সামনে দারুণ ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে। মেক ইরান গ্রেট এগেইন (MIGA!),”—লেখেন ট্রাম্প।
তবে হোয়াইট হাউসের প্রেস সচিব ক্যারোলিন লেভিট পরে বলেন, প্রেসিডেন্টের বক্তব্যে কোনো নীতিগত পরিবর্তন হয়নি। তার মতে, “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ” বলতে ট্রাম্প বোঝাতে চেয়েছেন—যখন তিনি মনে করবেন ইরান আর হুমকি নয়।
ইরানের অবস্থান
ট্রাম্পের দাবি সত্ত্বেও ইরান আত্মসমর্পণের কোনো ইঙ্গিত দেয়নি। বরং তেহরান সংঘাতের পরিধি বাড়িয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে যেখানে যেখানে মার্কিন ঘাঁটি রয়েছে, সেসব দেশের দিকে ইরান ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে হামলার জন্য দুঃখ প্রকাশ করলেও বলেছেন, ইরান আত্মরক্ষা চালিয়ে যাবে। তিনি বলেন, “যেসব প্রতিবেশী দেশে হামলা হয়েছে, তাদের কাছে আমি এবং ইরানের পক্ষ থেকে ক্ষমা চাইছি। তবে ইরানের বিরুদ্ধে কোনো দেশ থেকে হামলা না হলে আমরা কোনো ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করব না।” ট্রাম্প পরে মন্তব্য করেন, ইরান নাকি প্রতিবেশী দেশগুলোর কাছে ক্ষমা চেয়ে কার্যত পরাজয় স্বীকার করেছে। “মধ্যপ্রাচ্যের দাদাগিরি করা দেশটি এখন হেরে গেছে,”—বলেন তিনি।
যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে প্রশ্ন
এক সপ্তাহের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক ভিন্ন ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। সেগুলোর মধ্যে রয়েছে—ইরানের “তাৎক্ষণিক পারমাণবিক হুমকি” প্রতিহত করা, ইসরায়েলের সম্ভাব্য হামলার পর ইরানের পাল্টা আঘাত ঠেকানো, ইরানে শাসন পরিবর্তন ইরানের আগাম হামলার আশঙ্কা এবং শেষ পর্যন্ত “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ”। এই পরস্পরবিরোধী ব্যাখ্যার কারণে বিশ্লেষকদের মত, ইরান যুদ্ধের প্রকৃত লক্ষ্য নিয়ে এখনও গভীর ধোঁয়াশা রয়ে গেছে।
