TOP NEWS

বস্তারে মাওবাদীদের ঐতিহাসিক পতন: ১০৮ জন ক্যাডারের আত্মসমর্পণ ও বিপুল কুবেরের ধনের হদিস

ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ইতিহাসে এক অভাবনীয় এবং নাটকীয় মোড় নিল ছত্তিশগড়ের বস্তার অঞ্চল। দীর্ঘ কয়েক দশকের মাওবাদী সশস্ত্র বিদ্রোহের কফিনে শেষ পেরেকটি পুঁতে দিয়ে বুধবার একসঙ্গে ১০৮ জন মাওবাদী ক্যাডার নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ ২০২৬ সালের ৩১ মার্চের মধ্যে দেশ থেকে মাওবাদী দমনের যে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছিলেন, তার ঠিক কয়েক দিন আগে এই গণ-আত্মসমর্পণকে ‘লাল সন্ত্রাস’ নির্মূলের পথে চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে দেখছে প্রশাসন।

বুধবার বস্তারের নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এসে অস্ত্র ত্যাগ করেন ১০৮ জন সক্রিয় মাওবাদী। পুলিশ সূত্রে খবর, এদের মধ্যে একটি বড় অংশই মাওবাদীদের অত্যন্ত শক্তিশালী ও প্রভাবশালী ‘দণ্ডকারণ্য স্পেশাল জোনাল কমিটি’র (DKSZC) সদস্য। আত্মসমর্পণকারী এই ক্যাডারদের মাথার ওপর সব মিলিয়ে প্রায় ৩ কোটি ৯৫ লক্ষ টাকার সরকারি পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এত বিপুল সংখ্যক প্রশিক্ষিত ক্যাডারের একসঙ্গে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসা মাওবাদী আন্দোলনের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার শামিল। বস্তারের দুর্গম অরণ্যে যে বিদ্রোহ একসময় সমান্তরাল সরকার চালাত, আজ তা স্পষ্টতই পতনের দোরগোড়ায়।

এই অপারেশনের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটি হলো মাওবাদীদের গোপন ডাম্প বা ভাণ্ডার থেকে উদ্ধার হওয়া বিপুল সম্পদ। আত্মসমর্পণকারী মাওবাদীদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তল্লাশি চালিয়ে নিরাপত্তা বাহিনী ৩ কোটি ৬১ লক্ষ টাকা নগদ এবং প্রায় এক কিলোগ্রাম সোনা উদ্ধার করেছে, যার বাজারমূল্য আনুমানিক ১ কোটি ৬৪ লক্ষ টাকা।

এটিই ভারতের ইতিহাসে প্রথম কোনো মাওবাদী বিরোধী অভিযানে এত বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কার উদ্ধারের ঘটনা। মাওবাদীরা সাধারণত লেভি বা তোলাবাজির মাধ্যমে এই অর্থ সংগ্রহ করত বলে অনুমান করা হচ্ছে। এই বিশাল পরিমাণ সম্পদ উদ্ধার হওয়ার ফলে মাওবাদীদের আর্থিক রসদ যে সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল, তা বলাই বাহুল্য।

সূত্রে খবর, অর্থের পাশাপাশি নিরাপত্তা বাহিনী মাওবাদীদের একটি বিশাল অস্ত্রাগারও বাজেয়াপ্ত করেছে। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের তালিকায় রয়েছে- ৭টি একে-৪৭ রাইফেল, ১০টি ইনসাস (INSAS) রাইফেল, ১টি কারবাইন ও ৫টি এসএলআর (SLR), ৪টি লাইট মেশিনগান (LMG), ২০টি .৩০৩ রাইফেল ও ২৫টি ১২-বোর গান, ১১টি বিজিএল লঞ্চার ও ১টি মেগা বিজিএল লঞ্চার, ১টি মর্টার ও ১৩টি ভরমার বন্দুক। সব মিলিয়ে ১০১টি আধুনিক ও দেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখন পুলিশের কব্জায়। এই বিপুল পরিমাণ মারণাস্ত্র হাতছাড়া হওয়া মাওবাদী বাহিনীর জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি।

রায়পুরের শৌর্য ভবনে আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে ছত্তিশগড় পুলিশের মহানির্দেশক (DGP) অরুণ দেব গৌতম বলেন, “এই গণ-আত্মসমর্পণ বস্তারে মাওবাদী নেটওয়ার্ক ধ্বংস করার লক্ষ্যে রাজ্য সরকারের ‘পুনা নারগেম’ (নতুন সকাল) অভিযানের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের প্রতিফলন।” পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি থেকে এ পর্যন্ত মোট ২,৭১৪ জন মাওবাদী আত্মসমর্পণ করেছেন। এটি প্রমাণ করে যে, সাধারণ ক্যাডার থেকে শুরু করে উচ্চপদস্থ নেতারাও এখন হিংসার পথ ছেড়ে উন্নয়নের মূল স্রোতে ফিরতে মরিয়া।

এবারের আত্মসমর্পণকারীদের মধ্যে মাওবাদী পদমর্যাদার বেশ কয়েকজন শীর্ষ নেতা রয়েছেন, যা সংগঠনটির সাংগঠনিক কাঠামো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। তালিকায় রয়েছে- ডিভিসিএম (DVCM) রাহুল তেলাম, পান্ড্রু কোয়াসি, ঝিতরু ওয়ায়াম, রামধর ওরফে বিরু, মল্লেশ, সিওয়াইপিসি (CYPC) কমান্ডার মুচাকি, ডিভিসিএম কোসা মাণ্ডবী। এই নেতারা দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা বাহিনীর ‘মোস্ট ওয়ান্টেড’ তালিকায় ছিলেন এবং বস্তারের বিভিন্ন হিংসাত্মক ঘটনার মূল চক্রী ছিলেন।

ছত্তিশগড়ের মুখ্যমন্ত্রী বিষ্ণু দেব সাই এই ঘটনাকে বস্তারের শান্তি ও স্থিতিশীলতার পথে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বে ‘সুরক্ষা, উন্নয়ন ও বিশ্বাস’—এই ত্রিমুখী কৌশলে আমরা মাওবাদী সমস্যার স্থায়ী সমাধানের পথে হাঁটছি। আমাদের সরকারের পুনর্বাসন নীতি আজ বিভ্রান্ত যুবকদের সুস্থ জীবনে ফেরাতে সাহায্য করছে।”

অন্যদিকে, সিআরপিএফ-এর ডিরেক্টর জেনারেল জি.পি. সিং বর্তমানে ছত্তিশগড়ের সম্মুখ সমরে থাকা বেসগুলি পরিদর্শন করছেন। তিনি জওয়ানদের সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন যে, মাওবাদীরা কোণঠাসা হয়ে আইইডি (IED) ব্যবহারের মাধ্যমে মরণকামড় দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে। তাই ‘জিরো ক্যাজুয়ালিটি’ বা শূন্য হতাহতের লক্ষ্য নিয়ে চূড়ান্ত আঘাত হানতে হবে।

বস্তার থেকে যে খবর আসছে, তা শুধু একদল সশস্ত্র মানুষের আত্মসমর্পণ নয়, বরং কয়েক দশকের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের অবসানের ইঙ্গিত। ৩১ মার্চের চূড়ান্ত সময়সীমার আগে এই সাফল্য কেন্দ্রীয় সরকারকে এক বাড়তি মাইলেজ দেবে। মাওবাদীদের একসময়ের দুর্ভেদ্য দুর্গ আজ উন্নয়নের জোয়ারে এবং নিরাপত্তার চাপে ধূলিসাৎ হতে বসেছে। আদিবাসী অধ্যুষিত এই জনপদ কি তবে সত্যিই বন্দুকের গর্জন ভুলে শান্তির নতুন ভোরে পা রাখতে চলেছে? উত্তর হয়তো আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!