ডেইলি ডোমকল, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশ এবং সীমান্ত সুরক্ষাকে রাজ্য সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার বলে উল্লেখ করে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী জানিয়েছেন, ইতিমধ্যেই প্রায় ৪,৮০০ জন অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীকে সীমান্তবর্তী জেলার হোল্ডিং সেন্টার থেকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। আরও ৮৩৬ জন বর্তমানে বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে রয়েছেন এবং তাঁদেরও শীঘ্রই ডিপোর্ট করা হবে। রবিবার বিজেপির বিশেষ প্রশিক্ষণ শিবির উপলক্ষে আয়োজিত এক প্রস্তুতি বৈঠকে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ অনুপ্রবেশ দীর্ঘদিনের একটি বড় সমস্যা। সেই সমস্যা মোকাবিলায় তাঁর সরকার কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। তিনি জানান, ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় ৫৫৬ কিলোমিটার জমির মধ্যে ইতিমধ্যেই প্রায় ১০০ কিলোমিটার জমি সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ)-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, সীমান্ত সুরক্ষার স্বার্থে জমি হস্তান্তরের কাজ একটি চলমান প্রক্রিয়া। তিনি বলেন, “দেশের নিরাপত্তার স্বার্থে আন্তর্জাতিক সীমান্তকে আরও সুরক্ষিত করা আমাদের সরকারের অগ্রাধিকার। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গের চিকেনস নেক করিডরকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।” শুভেন্দু অধিকারী জানান, উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’ ভারতের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রায় ২০ থেকে ২২ কিলোমিটার চওড়া এবং প্রায় ৬০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই করিডরই উত্তর-পূর্ব ভারতের সঙ্গে দেশের মূল ভূখণ্ডের একমাত্র স্থল সংযোগ রক্ষা করে। তাই এই অঞ্চলকে আরও নিরাপদ করতে সীমান্ত অবকাঠামো উন্নয়নের উপর বিশেষ জোর দেওয়া হচ্ছে। উল্লেখ্য, পশ্চিমবঙ্গই দেশের মধ্যে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সবচেয়ে বড় রাজ্য। রাজ্যের সঙ্গে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সীমান্তের দৈর্ঘ্য ২,২১৭ কিলোমিটার, যেখানে সমগ্র ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দৈর্ঘ্য ৪,০৯৬ কিলোমিটার। মুখ্যমন্ত্রী দাবি করেন, কেন্দ্রীয় আইনের আওতায় যাঁরা নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ)-এর সুবিধাভোগী নন, সেই সমস্ত অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের শনাক্ত করে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, “এই ব্যক্তিদের সরাসরি বিএসএফের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। দেশের অন্যান্য রাজ্যে এই আইন কার্যকর হলেও পূর্ববর্তী তৃণমূল সরকার তা কার্যকর করেনি। ফলে বহু অবৈধ অনুপ্রবেশকারী রাজ্যের জেল ও বিভিন্ন সরকারি ব্যবস্থার সুবিধা ভোগ করছিলেন, যার আর্থিক বোঝা বহন করছিল সাধারণ করদাতারা।” মুখ্যমন্ত্রী আরও দাবি করেন, উত্তর ২৪ পরগনার হাকিমপুর সীমান্ত এলাকায় নজরদারি বৃদ্ধির ফলে বহু অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ইতিমধ্যেই স্বেচ্ছায় এলাকা ছেড়ে চলে গিয়েছেন।
অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে শুভেন্দু অধিকারী বলেন, “পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যাগত চিত্র উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।” তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক স্বার্থে পূর্ববর্তী সরকার দীর্ঘদিন ধরে এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয়নি। তিনি জানান, রাজ্যে জনগণনার প্রস্তুতি ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। আগামী ১ আগস্ট থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত বাড়ি বাড়ি সমীক্ষা চালানো হবে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারির মধ্যে জনগণনার কাজ সম্পূর্ণ করে তার ভিত্তিতে নতুন করে আসন পুনর্বিন্যাস বা ডিলিমিটেশন করা হবে বলেও জানান তিনি।
সভায় মুখ্যমন্ত্রী তাঁর সরকারের বিভিন্ন জনকল্যাণমূলক প্রকল্পের কথাও তুলে ধরেন। তিনি জানান, নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’-র আওতায় রাজ্যের ৫০ লক্ষ মহিলার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ৩,০০০ টাকা করে পাঠানো হয়েছে। তাঁর দাবি, “সরকার গঠনের প্রথম দিনেই ২৮ লক্ষ ২৫ হাজার ৭৬৯ জন মহিলার অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানো সম্ভব হয়েছে, যা আমাদের অন্যতম বড় সাফল্য।” অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য ১২ পাতার আবেদনপত্র নিয়ে সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারি অর্থ জনগণের করের টাকায় পরিচালিত হয়। তাই প্রকৃত উপভোক্তাদের চিহ্নিত করতে যথাযথ যাচাই প্রক্রিয়া জরুরি।
পূর্ববর্তী সরকারের লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্প নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর দাবি, প্রকল্পের প্রায় ২ কোটি ২০ লক্ষ উপভোক্তার মধ্যে ২৭ লক্ষ নাম ভোটার তালিকায় ছিল না। এছাড়া প্রায় তিন লক্ষ পুরুষও বেআইনিভাবে মহিলাদের জন্য নির্ধারিত এই প্রকল্পের সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। মুখ্যমন্ত্রীর মতে, এটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক দুর্নীতির উদাহরণ। তিনি বলেন, “আমরা যে স্বচ্ছ যাচাই প্রক্রিয়া চালু করেছি, তার সুফল আগামী ৫০ বছর ধরে রাজ্য পাবে।” মুখ্যমন্ত্রী অভিযোগ করেন, পূর্ববর্তী শাসনামলে বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছিল। এমনকি বিধবা ভাতার মতো প্রকল্পেও পুরুষদের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে তিনি দাবি করেন। তাঁর কথায়, “যেদিকে তদন্ত করা হচ্ছে, সেখান থেকেই দুর্নীতির গন্ধ বেরিয়ে আসছে। মনে হচ্ছে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডকেই হয়তো জেলে পরিণত করতে হবে।”
উল্লেখ্য, সরকার পরিবর্তনের পর রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে দুর্নীতি, কাটমানি এবং তোলাবাজির অভিযোগে একাধিক তৃণমূল নেতা, জনপ্রতিনিধি, বর্তমান ও প্রাক্তন বিধায়ক, কাউন্সিলর এবং পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়েছে। তাঁদের অনেককেই ইতিমধ্যে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। নির্বাচনের সময় বিজেপি ক্ষমতায় এলে বাঙালির খাদ্যাভ্যাসে প্রভাব পড়বে বলে যে প্রচার চালানো হয়েছিল, তারও জবাব দেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আগামী সপ্তাহ থেকেই রাজ্যের বিভিন্ন এলাকায় জনপ্রতি ৫ টাকায় সপ্তাহে দু’দিন মাছ-ভাত দেওয়া হবে। বাঙালির খাদ্যসংস্কৃতির প্রতি আমাদের পূর্ণ শ্রদ্ধা রয়েছে।” রাজ্যের স্বাস্থ্য পরিষেবার উন্নয়ন নিয়েও একাধিক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী। তিনি জানান, সোমবার নয়াদিল্লির বিজ্ঞান ভবনে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে আয়ুষ্মান ভারত প্রকল্প সংক্রান্ত একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। এর ফলে প্রায় ১ কোটি ৪৬ লক্ষ পরিবার, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ৬ কোটি মানুষ আয়ুষ্মান ভারত কার্ডের সুবিধা পাবেন। প্রত্যেক পরিবার বছরে সর্বোচ্চ ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত বিনামূল্যে চিকিৎসার সুযোগ পাবে। মুখ্যমন্ত্রী আরও জানান, জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের আওতায় কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রক পশ্চিমবঙ্গের জন্য ৪,৫০০ কোটি টাকা অনুমোদন করেছে। এর মধ্যে ইতিমধ্যেই ৫২৭ কোটি টাকা রাজ্য পেয়েছে। তাঁর দাবি, “খুব শীঘ্রই রাজ্যের স্বাস্থ্য ক্ষেত্রে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখতে পাবেন মানুষ।”
সভায় মুখ্যমন্ত্রী জানান, ১২৫ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্প এবং প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনাও নতুন উদ্যমে বাস্তবায়িত হবে। পাশাপাশি রাজ্য সরকারি কর্মচারীদের মহার্ঘ ভাতা (ডিএ) সংক্রান্ত ঘোষণাও আগামী ২২ জুন রাজ্য বাজেট পেশের সময় করা হবে বলে ইঙ্গিত দেন তিনি। তিনি বলেন, “আমাদের সরকার সপ্তম বেতন কমিশন গঠন করেছে। ২০১৬ থেকে ২০১৯ সালের বকেয়া ডিএ প্রায় তিন লক্ষ কর্মচারী ও পেনশনভোগীদের দেওয়া হয়েছে।” মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর নির্দেশে কেন্দ্রীয় সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রক পশ্চিমবঙ্গকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করছে। আগামী দিনে সীমান্ত সুরক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, কর্মসংস্থান এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান— এই পাঁচ ক্ষেত্রকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েই রাজ্য সরকার কাজ করবে বলেও জানান তিনি।
