ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিভেদ ও বৈষম্য রুখতে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (UGC) জারি করা নতুন নির্দেশিকা বা ‘রেগুলেশন ২০২৬’-এর ওপর অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ জারি করল দেশের শীর্ষ আদালত। বৃহস্পতিবার প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ এই রায় দিয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এই নিয়মাবলী বর্তমান রূপরেখায় কার্যকর হলে সমাজে বিভাজন তৈরি হতে পারে এবং এর পরিণাম অত্যন্ত “বিপজ্জনক” হতে পারে।
২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি ইউজিসি এই নতুন নিয়মাবলী (University Grants Commission (Promotion of Equity in Higher Education Institutions) Regulations, 2026) বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশ করেছিল। কিন্তু প্রকাশের মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই এর সাংবিধানিক বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একগুচ্ছ জনস্বার্থ মামলা জমা পড়ে সুপ্রিম কোর্টে। সেই মামলার প্রেক্ষিতেই আদালত ইউজিসি এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে নোটিশ পাঠিয়েছে। আগামী ১৯ মার্চ এই মামলার পরবর্তী শুনানি হবে।
ইউজিসির এই নতুন নির্দেশিকার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে তফশিলি জাতি (SC), তফশিলি জনজাতি (ST), অন্যান্য অনগ্রসর শ্রেণি (OBC) এবং অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া (EWS) শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে বৈষম্য দূর করা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, এই নির্দেশিকায় ‘বৈষম্য’ এবং ‘জাতিগত বৈষম্য’-এর যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তা অত্যন্ত একপেশে এবং তথাকথিত ‘জেনারেল ক্যাটাগরি’ বা সাধারণ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের অভিযোগ জানানোর অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে। আদালতে আবেদনকারীদের পক্ষে আইনজীবী বিষ্ণু জৈন সওয়াল করেন যে, রেগুলেশনের ৩(সি) ধারা অনুযায়ী জাতিগত বৈষম্যের সংজ্ঞায় শুধুমাত্র তফশিলি জাতি, জনজাতি এবং অনগ্রসর শ্রেণির বিরুদ্ধে হওয়া অবিচারকেই অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, সাধারণ শ্রেণির কোনো শিক্ষার্থী যদি জাতিগত বা অন্য কোনো কারণে বৈষম্যের শিকার হন, তবে তিনি এই বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে অভিযোগ জানাতে পারবেন না। আবেদনকারীদের দাবি, এটি সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদ (সাম্যের অধিকার)-এর পরিপন্থী।
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্যকান্ত বলেন, “যদি আমরা এখনই হস্তক্ষেপ না করি, তবে এই নিয়মাবলী সমাজে গভীর প্রভাব ফেলবে, সমাজকে বিভক্ত করবে এবং এর ফলাফল হবে ভয়াবহ।” আদালত ইউজিসির ব্যবহৃত ভাষার অস্পষ্টতা নিয়েও প্রশ্ন তোলে। বেঞ্চের মতে, নিয়মের অস্পষ্টতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দিতে পারে।
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী প্রশ্ন তোলেন, যখন ৩(ই) ধারায় বৈষম্যের সংজ্ঞা ইতিমধ্যেই বিস্তারিতভাবে দেওয়া আছে, যেখানে ধর্ম, জাতি, বর্ণ, লিঙ্গ, জন্মস্থান এবং প্রতিবন্ধকতার ভিত্তিতে কোনো বৈষম্যকেই বেআইনি বলা হয়েছে— তবে কেন আলাদা করে ৩(সি) ধারার প্রয়োজন পড়ল? আদালত মনে করে, ৩(সি) ধারাটি আসলে ৩(ই)-এর সংজ্ঞাকে সংকুচিত করে দিচ্ছে, যা উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থীদের সুরক্ষা কেড়ে নিচ্ছে।
শুনানি চলাকালীন প্রধান বিচারপতি একটি উদাহরণ টেনে বলেন, “ধরুন দক্ষিণ ভারতের কোনো শিক্ষার্থী উত্তর ভারতে পড়তে এলেন বা উল্টোটা ঘটল। সেখানে কেউ যদি তাঁর আঞ্চলিক সংস্কৃতি নিয়ে অপমানজনক মন্তব্য করেন, তবে এই নিয়মাবলীতে তাঁর সুরক্ষা কোথায়? যদি ৩(সি) ধারায় অভিযোগকারীর পরিচয় নির্দিষ্ট করে দেওয়া থাকে, তবে জেনারেল ক্যাটাগরির শিক্ষার্থীরা কোথায় যাবেন?”
ভারতের স্বাধীনতার ৭৫ বছর পার হওয়ার পরও সমাজে জাতিগত ও শ্রেণিগত বিভাজন টিকে থাকায় আক্ষেপ প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি। তিনি বলেন, “আমরা কি একটি শ্রেণিহীন সমাজের দিকে এগোচ্ছি নাকি একটি পশ্চাদপদ সমাজের দিকে? র্যাগিং-এর মতো সমস্যায় উত্তর-পূর্ব বা দক্ষিণ ভারতের শিশুরা যখন আসে, তখন তাঁদের সংস্কৃতি নিয়ে ব্যাঙ্গ করা হয়। সেখানে হোস্টেল ভাগ করে দেওয়া বা আলাদা করার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।”
বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী আমেরিকার উদাহরণ টেনে বলেন, “সংবিধানের ১৫(৪) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পিছিয়ে পড়া শ্রেণির জন্য বিশেষ আইন তৈরির ক্ষমতা রাষ্ট্রের আছে। কিন্তু আমরা আশা করব যে, আমেরিকা যেভাবে এককালে কৃষ্ণাঙ্গ এবং শ্বেতাঙ্গদের জন্য আলাদা স্কুল তৈরি করে বিভাজন তৈরি করেছিল, ভারতে যেন তেমন কোনো পশ্চাদমুখী পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।” শীর্ষ আদালত স্পষ্ট জানিয়েছে, এই নিয়মাবলীটি প্রয়োগ করার আগে একজন বিশেষজ্ঞ কমিটির দ্বারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এই বিশেষজ্ঞ কমিটি খতিয়ে দেখবে যাতে নির্দেশিকার ভাষা এমনভাবে সাজানো হয়, যাতে সমাজের কোনো স্তরের মানুষই বৈষম্যের শিকার না হন এবং আইনটির অপব্যবহার না ঘটে।
আদালতের বাইরেও এই নির্দেশিকা নিয়ে গত কয়েকদিন ধরে উচ্চবর্ণের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভ দেখা গিয়েছিল। তাঁদের দাবি ছিল, এই নিয়মাবলী আদতে সাধারণ শ্রেণির মানুষের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হবে এবং এটি সাম্যের বদলে প্রতিহিংসার পরিবেশ তৈরি করবে। ইউজিসির আইনজীবী তথা সলিসিটর জেনারেলের উদ্দেশ্যে আদালত নির্দেশ দিয়েছে যাতে একটি স্বচ্ছ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গড়ার লক্ষ্যে এই নিয়মাবলী সংশোধন করা হয়। সিনিয়র আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিংকেও এই মামলায় আইনি সহায়তার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছে।
ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বর্তমান চিত্র অনুযায়ী, সংরক্ষিত এবং অসংরক্ষিত উভয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যেই বিভিন্ন ধরণের হেনস্থার অভিযোগ থাকে। ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ড ব্যুরো (NCRB)-এর সাম্প্রতিক কিছু তথ্যে দেখা গেছে যে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে জাতিগত বৈষম্যের পাশাপাশি আঞ্চলিক বৈষম্য এবং লিঙ্গগত বৈষম্যের হারও ঊর্ধ্বমুখী। ইউজিসির ২০২৬-এর নিয়মাবলীতে ‘ইকুয়াল অপরচুনিটি সেন্টার’ এবং ‘ইক্যুইটি কমিটি’ তৈরির কথা বলা হয়েছে, কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের ফলে আপাতত এই প্রক্রিয়াটি স্থগিত রইল।
১৯ শে মার্চ পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে। ততদিন পর্যন্ত ইউজিসির এই নতুন নিয়মাবলী কার্যকর করা যাবে না। বিশেষজ্ঞ কমিটির রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই বোঝা যাবে, ভারতের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বৈষম্য রুখতে আইনি লড়াই কোন পথে মোড় নেয়।
(সূত্র: বার অ্যান্ড বেঞ্চ || অনুবাদ: আব্দুল বাকি)
