কাজ শেষ, মিলছে না বকেয়া বিল! রানিনগর-২ বিডিও অফিসের সামনে ঠিকাদারদের ধর্না, আন্দোলনের হুঁশিয়ারি

(বিডিও দফতরের সামনে বিক্ষোভ ঠিকাদারদের। || Image: Daily Domkal)

নিজস্ব সংবাদদাতা, রানিনগর: সরকারি প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করেও দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া বিল না পাওয়ার অভিযোগ তুলে বিক্ষোভে সামিল হলেন ঠিকাদাররা। বৃহস্পতিবার মুর্শিদাবাদের রানিনগর-২ ব্লক সমষ্টি উন্নয়ন আধিকারিকের (বিডিও) দফতরের সামনে অবস্থান-বিক্ষোভ ও ধর্না কর্মসূচি পালন করেন তাঁরা। ঠিকাদারদের অভিযোগ, একাধিক উন্নয়নমূলক প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার বহু মাস কেটে গেলেও এখনও তাঁদের প্রাপ্য অর্থ মেটানো হয়নি। ফলে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছেন তাঁরা। দ্রুত বকেয়া বিল পরিশোধের দাবি জানিয়ে প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেন বিক্ষোভকারীরা।

ঠিকাদারদের দাবি, ‘আমার পাড়া, আমাদের সমাধান’ প্রকল্প-সহ বিভিন্ন সরকারি উন্নয়নমূলক প্রকল্পে সরকারি নির্দেশিকা মেনে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ করা হয়েছে। কাজের গুণগত মান বজায় রেখে প্রকল্পগুলি শেষ করার পর প্রয়োজনীয় নথিপত্রও জমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার দীর্ঘ সময় পরেও বিল মেটানো না হওয়ায় তাঁরা আর্থিকভাবে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। ঠিকাদারদের অভিযোগ, সরকারি প্রকল্পের কাজ করতে গিয়ে অনেকেই নিজেদের সঞ্চিত অর্থ বিনিয়োগ করেছেন। আবার কেউ কেউ ব্যাংক ঋণ নিয়েছেন, কেউ ব্যক্তিগতভাবে ধার করেছেন, আবার অনেকেই নির্মাণ সামগ্রী সরবরাহকারী ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে মালপত্র সংগ্রহ করেছেন। সেই সমস্ত দেনা এখনও পরিশোধ করা সম্ভব হচ্ছে না, কারণ সরকারি বিলই হাতে আসেনি।

(বিডিও দফতরের সামনে ধর্নায় ঠিকাদাররা। || Image: Daily Domkal)

ঠিকাদার আসিক ইকবাল বলেন, “সরকারি টেন্ডার পাওয়ার পর আমরা নির্ধারিত সময়ে কাজ সম্পন্ন করেছি। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আমাদের বকেয়া বিল দেওয়া হচ্ছে না। শুধু রানিনগরেই অন্তত ৫০ জন ঠিকাদার এই সমস্যায় ভুগছেন। কেউ ১৮ লক্ষ টাকার কাজ করেছেন, কেউ ২৬ লক্ষ, কেউ ৩০ লক্ষ, আবার কেউ ৪৮ লক্ষ টাকার প্রকল্প সম্পন্ন করেছেন। সব মিলিয়ে প্রায় ৭ থেকে ৮ কোটি টাকার কাজ হয়েছে। তারপরও বিল দেওয়া হচ্ছে না। আমাদেরও সংসার আছে, পরিবার আছে। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ, সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয়—কোনোটাই ঠিকমতো চালাতে পারছি না।” তিনি প্রশ্ন তোলেন, “যদি প্রকল্পের জন্য অর্থ বরাদ্দ থেকেই থাকে, তাহলে আমাদের প্রাপ্য টাকা এখনও কেন পরিশোধ করা হচ্ছে না?”

ঠিকাদারদের বক্তব্য, বিল আটকে থাকায় শুধু তাঁদের ব্যক্তিগত জীবন নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে স্থানীয় অর্থনীতিও। নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারী ব্যবসায়ী, পরিবহণ পরিষেবা, শ্রমিক—সবাই তাঁদের পাওনা অর্থের অপেক্ষায় রয়েছেন। ফলে একটি বকেয়া বিলের প্রভাব বহু মানুষের জীবিকা ও আয়ের উপর পড়ছে। আরেক ঠিকাদার রাজেশ মোল্লা বলেন, “কাজ করার জন্য আমরা নিজেদের গচ্ছিত টাকা খরচ করেছি। অনেকের কাছ থেকে ধার নিয়েছি। এখন পাওনাদাররা প্রতিদিন টাকার জন্য চাপ দিচ্ছেন। সরকারি বিল না পেলে তাঁদের টাকা কীভাবে পরিশোধ করব? আমরা অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় রয়েছি।”

ধর্নায় অংশ নিয়ে রবিউল ইসলাম জানান, সরকারি প্রকল্পের কাজই তাঁদের প্রধান আয়ের উৎস। দীর্ঘদিন ধরে বিল আটকে থাকায় পরিবারের আর্থিক অবস্থা ভেঙে পড়েছে। তাঁর কথায়, “এই কাজই আমাদের মূল জীবিকা। কয়েক মাস ধরে আমরা আর্থিকভাবে একেবারে ভেঙে পড়েছি। সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। প্রতিদিন নতুন করে চিন্তা বাড়ছে।” বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সময়মতো কাজ শেষ করার জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে সবসময় চাপ থাকে। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পূর্ণ না হলে বিভিন্ন ধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়। কিন্তু কাজ শেষ হওয়ার পর ঠিকাদারদের ন্যায্য পাওনা দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকলেও তার কোনও দ্রুত সমাধান হচ্ছে না। ঠিকাদারদের বক্তব্য, তাঁরা কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ধর্নায় বসেননি। তাঁদের একমাত্র দাবি, সম্পন্ন হওয়া কাজের বিপরীতে প্রাপ্য বিল দ্রুত পরিশোধ করা হোক। বিল পেলে তাঁরা শ্রমিকদের মজুরি, নির্মাণসামগ্রী সরবরাহকারীদের পাওনা এবং অন্যান্য আর্থিক দায়বদ্ধতা মেটাতে পারবেন।

বিক্ষোভ চলাকালীন ঠিকাদাররা বিডিও দফতরের সামনে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করেন এবং প্রশাসনের হস্তক্ষেপ দাবি করেন। তাঁদের বক্তব্য, দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট দফতরে যোগাযোগ করা হলেও কার্যকর সমাধান মেলেনি। তাই বাধ্য হয়েই তাঁরা ধর্নার পথ বেছে নিয়েছেন। ঠিকাদাররা স্পষ্ট জানিয়েছেন, দ্রুত বকেয়া বিল পরিশোধের বিষয়ে ইতিবাচক পদক্ষেপ না নেওয়া হলে আগামী দিনে আন্দোলনের পরিধি আরও বাড়ানো হবে। প্রয়োজনে ব্লক স্তর ছাড়িয়ে জেলা এবং রাজ্য স্তরেও বৃহত্তর আন্দোলনের কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তাঁরা। তাঁদের দাবি, সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ঠিকাদাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। সময়মতো কাজ শেষ করার পরও যদি তাঁদের ন্যায্য প্রাপ্য অর্থ দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

অন্যদিকে, এ প্রসঙ্গে রানিনগর-২ ব্লক প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!