নিজস্ব সংবাদদাতা, জলঙ্গি: হাড়ভাঙা খাটুনি শেষে দু’মুঠো অন্নের সংস্থান করাই যেখানে দায়, সেখানে নথিপত্রের অসঙ্গতি সংশোধনের গেরোয় কার্যত নাজেহাল দশা জলঙ্গির সাধারণ মানুষের। রবিবার সাগরপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে এসআইআর (SIR) শুনানি কেন্দ্রে ধরা পড়ল এমনই এক ছবি। ভোটার তালিকায় নাম বা তথ্যের ভুল সংশোধনের এই শুনানিতে এসে ক্ষোভ প্রকাশ করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পঁচাত্তর ছুঁইছুঁই সোনাভান বেওয়া। স্বামী নেই, মেয়েরাও নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। বাবার নামের বানানে সামান্য ভুলের কারণে নোটিশ পেয়েছেন তিনি। কুমারপুর ঘোষপাড়ার এই বৃদ্ধা অসুস্থ শরীর নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে একসময় অবসন্ন হয়ে মাটিতেই বসে পড়েন। ক্ষোভের সুরে তিনি বলেন, “বৃদ্ধ বয়সে কি এত দৌড়ানো যায়? সরকার কি মানুষকে দৌড় করানোটাই প্রধান কাজ হিসেবে বেছে নিয়েছে? শান্তি দেওয়ার বদলে শুধু কাগজের পিছনে ছোটাচ্ছে।”
সাগরপাড়ার শুনানি কেন্দ্রে উপস্থিত বহু মহিলাই সংসার কাজ ফেলে রেখে লাইনে দাঁড়িয়েছে। সাগরপাড়ার জরিনা বিবির স্বামী ভিন রাজ্যে কর্মরত। বাড়িতে ছোট দুই সন্তানকে অভুক্ত রেখেই সকাল দশটায় কেন্দ্রে এসেছিলেন তিনি, যাতে দ্রুত কাজ সেরে বাড়ি ফিরে রান্না করতে পারেন। কিন্তু দুপুর গড়ালেও কাজ শেষ না হওয়ায় বিরক্ত হয়ে ওঠেন তিনি। তাঁর কথায়, “এগুলো মানুষকে হেনস্থা করা ছাড়া কিছুই নয়।” অনেক মহিলাকেই দেখা গিয়েছে কোলে সদ্যোজাত শিশুকে নিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে। এই ‘কাগজের লড়াই’ কেবল হয়রানি নয়, সাধারণ মানুষের পেটেও টান দিচ্ছে। দেবীপুরের রাজিবুল সেখ জানান, গত তিন দিন ধরে কাগজের পিছনে ছুটতে গিয়ে তিনি কাজে যেতে পারেননি। পকেটে টাকা নেই, সংসার চলবে কী করে তা নিয়ে তিনি দিশেহারা। এক সবজি বিক্রেতা আক্ষেপ করে বলেন, “বাড়িতে এক পাল্লা কাঁচামাল পড়ে নষ্ট হচ্ছে। আমরা দিন আনি দিন খাই, একদিন কাজ কামাই মানে অনেক বড় ক্ষতি।”
শুনানি কেন্দ্রে আসা সাধারণ মানুষের মধ্যে এক অজানা ভয় ও আতঙ্কের পরিবেশ কাজ করছে। তাঁদের অভিযোগ, সরকার প্রদত্ত আধার, প্যান বা ড্রাইভিং লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও সেগুলোকে কেন পর্যাপ্ত প্রমাণ হিসেবে ধরা হচ্ছে না? ২০০২ সালের তালিকাকেই কেন মূল ভিত্তি করা হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। অভিযোগ উঠেছে, মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশোনা না করা ব্যক্তিদের স্কুল সার্টিফিকেটকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে না। এক ব্যক্তির মতে, “এটা নির্বাচন কমিশনের সাধারণ মানুষের জীবন নিয়ে ছেলেখেলা ছাড়া আর কিছুই নয়।” যদিও হয়রানির এই পাহাড়প্রমাণ অভিযোগ নিয়ে প্রশাসনের উচ্চপদস্থ কর্তারা সরাসরি মুখ খোলেননি।
