TOP NEWS

জলঙ্গিতে ৪ বছর ধরে পড়ে থাকা গাড়িতে পচাগলা মৃতদেহ, কঙ্কালসার দেহ ঘিরে রহস্যের জট

(পরিত্যক্ত গাড়ির ভেতর থেকে পচাগলা দেহ উদ্ধার, জলঙ্গিতে চাঞ্চল্য। || নিজস্ব চিত্র)

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলঙ্গি: দীর্ঘদিন ধরে রাস্তার ধারে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকা একটি চারচাকা গাড়ির ভেতর থেকে উদ্ধার হল পচাগলা এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তির দেহ। শনিবার সকালে মুর্শিদাবাদের জলঙ্গি থানার জোটতলা এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। দেহটির পচনের মাত্রা এতটাই বেশি যে শনিবার সন্ধ্যা পর্যন্ত মৃত ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে তদন্ত শুরু করেছে জলঙ্গি থানার পুলিশ।

স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, জোটতলায় পথের সাথী গেস্ট হাউসের পাশেই একটি গ্যারেজ রয়েছে। প্রায় চার বছর আগে এক ব্যক্তি একটি চারচাকা গাড়ি সারাইয়ের জন্য ওই গ্যারেজে রেখে যান। এরপর আর কেউ গাড়িটি নিতে আসেননি। গ্যারেজ মালিকের তত্ত্বাবধানে সেটি দীর্ঘদিন ধরে গেস্ট হাউসের সামনে রাস্তার ধারে পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটি ধুলোয় ঢেকে যায়, এমত অবস্থায় সেটির দিকে আর কেউ বিশেষ নজর দিত না।

জানা গিয়েছে, শনিবার সকালে গ্যারেজ মালিক রিপন শেখ ওই পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে একটি যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়ার উদ্দেশ্যে সেখানে যান। বহুদিন বন্ধ থাকা গাড়ির দরজা খুলতেই তিনি স্তম্ভিত হয়ে যান। দেখা যায়, গাড়ির পেছনের সিটের উপর কাত হয়ে পড়ে রয়েছে একটি পচাগলা দেহ। মৃতদেহের পরনে থাকা পোশাকও পচে গিয়েছে, দেহের অধিকাংশ মাংস ক্ষয়ে গিয়ে কঙ্কালের সঙ্গে চামড়া লেগে রয়েছে। দৃশ্যটি এতটাই ভয়াবহ ছিল যে আতঙ্কিত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে তিনি স্থানীয়দের ডাকেন এবং জলঙ্গি থানায় খবর দেন।

(রাজ্য সড়কের পাশে পড়ে পরিত্যক্ত গাড়িটি। || নিজস্ব চিত্র)

খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে গাড়িটি ঘিরে ফেলে এবং মৃতদেহটি উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায়। থানার পক্ষ থেকে একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে পুলিশের অনুমান, দেহটি অন্তত সাত থেকে আট মাস আগের। পচনের মাত্রা অত্যন্ত বেশি হওয়ায় মৃত্যুর সঠিক সময় ও কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের রিপোর্টের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

ঘটনার পর এলাকায় কৌতূহলী মানুষের ভিড় জমে যায়। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকেই জানান, গত কয়েক মাস ধরে ওই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় মাঝেমধ্যেই দুর্গন্ধ পাওয়া যেত। কিন্তু কেউ সন্দেহ করেননি যে একটি গাড়ির ভেতরে মানুষের মৃতদেহ পড়ে থাকতে পারে। অনেকেই ভেবেছিলেন, কোনও কুকুর বা শিয়াল জাতীয় প্রাণী মারা গিয়ে পচে গিয়েছে। এলাকার বাসিন্দা তথা প্রাক্তন বাম বিধায়ক ইউনুস সরকার বলেন, “আমরাও বহুদিন ধরে ওই এলাকায় দুর্গন্ধ পেয়েছি। কিন্তু ভেবেছিলাম, কোনও পশু মরে পড়ে আছে। তাই নাকে রুমাল চাপা দিয়ে চলে গিয়েছি। আজ শুনছি, আসলে মানুষের দেহ পচে যাওয়ার গন্ধ ছিল। বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। পুলিশ পুরো বিষয়টি তদন্ত করে দেখুক।”

ইতিমধ্যে তদন্তে নেমে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে পুলিশ। প্রথমত, কীভাবে একটি মৃতদেহ দীর্ঘদিন ধরে একটি গাড়ির ভেতরে পড়ে রইল অথচ কেউ তা টের পেল না? দ্বিতীয়ত, দেহটি ওই গাড়ির ভেতরে কীভাবে এল—মৃত ব্যক্তি নিজে ঢুকেছিলেন, নাকি অন্য কেউ সেখানে রেখে গিয়েছে? তৃতীয়ত, গাড়ির মালিক কে এবং কেন চার বছর ধরে গাড়িটি ফেলে রাখা হয়েছিল?

এদিকে গ্যারেজ মালিক রিপন শেখের কাছ থেকে পুলিশ গাড়ির মালিকানা ও পূর্ব ইতিহাস সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছে। তবে এই ঘটনা নিয়ে গ্যারেজ মালিক রিপন শেখের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছিল। তবে কে গাড়িটি গ্যারেজে রেখে গিয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি গ্যারেজ মালিক। কেন কোনও নথি বা তথ্য সংরক্ষণ করা হয়নি, সে প্রশ্নেরও সদুত্তর মেলেনি। বিষয়টি নিয়ে তাঁর প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করা হলেও তিনি তেমনভাবে কথা বলতে চাননি।

(পরিত্যক্ত গাড়ি থেকে কঙ্কালসার দেহ উদ্ধার। || নিজস্ব চিত্র)

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, দেহটি থেকে কোনও পরিচয়পত্র বা ব্যক্তিগত সামগ্রী মেলেনি। ফলে পরিচয় নির্ধারণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। পচনের কারণে মুখমণ্ডল বিকৃত হয়ে যাওয়ায় চাক্ষুষ শনাক্তকরণও সম্ভব হচ্ছে না। ময়নাতদন্তের পাশাপাশি ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে। প্রয়োজনে ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তের উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। পাশাপাশি আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজ, স্থানীয়দের তথ্য এবং গ্যারেজের পুরোনো নথিপত্র (যদি থাকে) খতিয়ে দেখছে পুলিশ। ডোমকল মহকুমা পুলিশ আধিকারিক (এসডিপিও) শুভম বাজাজ জানান, “একটি পরিত্যক্ত গাড়ির ভেতর থেকে পচাগলা মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা রুজু করে দেহটি ময়নাতদন্তে পাঠানো হয়েছে। দেহের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে। পুরো ঘটনাটি গুরুত্ব সহকারে খতিয়ে দেখা হচ্ছে।”

জলঙ্গি থানার এত কাছাকাছি এলাকায় একটি গাড়ির মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মৃতদেহ পড়ে থাকার ঘটনা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। অনেকেরই প্রশ্ন, রাস্তার ধারে পরিত্যক্ত যানবাহন বা বস্তু দীর্ঘদিন পড়ে থাকলে তা কি নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হয় না? পুরো ঘটনায় জলঙ্গি জুড়ে চাঞ্চল্য ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। একটি সাধারণ, পরিত্যক্ত গাড়ির ভেতরে এতদিন ধরে মানুষের দেহ পড়ে থাকতে পারে—এই ভাবনাই অনেককে শিউরে তুলছে।

এদিকে পুলিশ জানিয়েছে, দেহের পরিচয় শনাক্ত হলেই মৃত্যুর প্রকৃতি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। খুন নাকি আত্মহত্যা তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। রহস্যঘেরা এই মৃত্যুর তদন্ত কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেই দিকেই নজর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!