TOP NEWS

“টাকা না দিলে পরের কিস্তি বন্ধ”, কাটমানি চেয়ে হুমকি পঞ্চায়েত সদস্যার স্বামীর, অস্বস্তিতে বাম!

(অভিযোগকারী সাদ্দাম সেখ। || Image: Daily Domkal)

নিজস্ব সংবাদদাতা, জলঙ্গি: রাজ্য সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক প্রকল্প ‘বাংলা আবাস যোজনা’। এবার সেই প্রকল্পকে ঘিরে ফের কাটমানির অভিযোগ উঠল মুর্শিদাবাদের জলঙ্গিতে। সরকারি প্রকল্পের ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা দাবি, হুমকি ও অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগে জলঙ্গি ব্লকের দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের এক সিপিআইএম পঞ্চায়েত সদস্যার স্বামীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়েছে জলঙ্গি বিডিও অফিসে। এই ঘটনায় স্থানীয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে।

অভিযোগকারী উপভোক্তার নাম সাদ্দাম সেখ। তিনি জলঙ্গি ব্লকের দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ঘোড়ামারা এলাকার বাসিন্দা। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকারের ‘বাংলা আবাস যোজনা’ প্রকল্পে সরকারি ঘর পাওয়ার পর থেকেই পঞ্চায়েত সদস্যার স্বামী রাকিবুল হাসান ওরফে নান্টু তাঁর কাছে কুড়ি হাজার টাকা কাটমানি দাবি করেন। টাকা দিতে অস্বীকার করায় তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় এবং অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করা হয় বলেও অভিযোগ।

কীভাবে ঘর পেলেন উপভোক্তা

সাদ্দাম সেখ জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। নিজস্ব পাকা ঘর না থাকায় পরিবার নিয়ে অত্যন্ত দুর্বিষহ অবস্থায় থাকতে হচ্ছিল তাঁকে। এই অবস্থায় রাজ্য সরকারের ‘বাংলা আবাস যোজনা’ প্রকল্পে আবেদন করেন তিনি। প্রশাসনিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর তিনি ওই প্রকল্পে একটি সরকারি ঘর বরাদ্দ পান। প্রকল্পের নিয়ম অনুযায়ী, ঘর নির্মাণের জন্য প্রথম কিস্তির টাকা উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে সরাসরি পাঠানো হয়। সেমত সাদ্দাম সেখের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে গত বছরের ২৯ নভেম্বর প্রথম কিস্তির টাকা জমা পড়ে। টাকা পাওয়ার পর থেকেই সমস্যার সূত্রপাত।

টাকা পাওয়ার পর থেকেই চাপ?

অভিযোগকারী ব্যক্তির অভিযোগ, টাকা ব্যাঙ্কে ঢোকার কিছুদিনের মধ্যেই দেবীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের ১০০ নম্বর বুথের সিপিআইএম পঞ্চায়েত সদস্যা হিরামন সরকারের স্বামী রাকিবুল হাসান তাঁকে একাধিকবার দেখা করতে বলেন। প্রথমে বিষয়টিকে তিনি গুরুত্ব দেননি। কিন্তু পরে সরাসরি তাঁর কাছে কুড়ি হাজার টাকা দাবি করা হয় বলে অভিযোগ। সাদ্দাম সেখের দাবি, রাকিবুল হাসান শুধু ফোনেই নয়, তাঁর বাড়িতে গিয়েও টাকা দাবি করেন। তাঁকে বলা হয়—ঘর পাইয়ে দেওয়ার জন্য অনেক “কষ্ট” করতে হয়েছে, অফিসারদের এনে জিও-ট্যাগ করানো হয়েছে, তাই এই টাকা দিতে হবে।

টাকা না দিলে হুমকি!

অভিযোগ, সাদ্দাম সেখ কাটমানির টাকা দিতে অস্বীকার করলে তাঁকে নানাভাবে ভয় দেখানো হয়। এমনকি পরবর্তী কিস্তির টাকা দেওয়া হবে না বলেও হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়। সাদ্দাম সেখের কথায়, “আমি গরিব মানুষ। সরকারি নিয়ম মেনে ঘর পেয়েছি। টাকা দিতে পারব না বলায় আমাকে হুমকি দেওয়া হয়েছে। অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজও করা হয়েছে।” উপভোক্তার অভিযোগ, এই হুমকির কারণে তিনি এবং তাঁর পরিবার মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পরবর্তী কিস্তির টাকা আটকে গেলে ঘর নির্মাণ বন্ধ হয়ে যাবে—এই আশঙ্কায় তিনি আতঙ্কিত।

প্রশাসনের দ্বারস্থ উপভোক্তা

উপায় না পেয়ে অবশেষে প্রশাসনের দ্বারস্থ হন সাদ্দাম সেখ। জলঙ্গি বিডিও অফিসে গিয়ে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। অভিযোগপত্রে তিনি গোটা ঘটনার বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেছেন এবং অভিযুক্তের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। সাদ্দাম সেখ বলেন, “আমি প্রশাসনের কাছে ন্যায়বিচার চাই। তদন্ত করে যদি প্রমাণ হয়, তাহলে যেন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সরকারি প্রকল্পে ঘর পাওয়া আমার অধিকার, তার জন্য কাউকে টাকা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না।”

একা নন সাদ্দাম?

অভিযোগকারী দাবি করেছেন, তাঁর মতো আরও অনেক উপভোক্তার কাছেও একইভাবে কাটমানি দাবি করা হয়েছে। ঘোড়ামারা এলাকার একাধিক ব্যক্তি নাকি একই ধরনের হুমকির শিকার হয়েছেন। যদিও তাঁদের অনেকেই ভয় বা সামাজিক চাপের কারণে প্রকাশ্যে মুখ খুলতে সাহস পাচ্ছেন না। প্রশ্ন উঠছে, সরকারি প্রকল্পের সুবিধা কি আদৌ স্বচ্ছভাবে পৌঁছচ্ছে উপভোক্তাদের কাছে? নাকি স্থানীয় স্তরে প্রভাবশালীদের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে?

ভাইরাল অডিও ঘিরে বিতর্ক

এই ঘটনার মধ্যেই নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে একটি অডিও কল রেকর্ড। অভিযোগকারী সাদ্দাম সেখের ও রাকিবুল হাসানের কথোপকথনের একটি অডিও রেকর্ড সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই অডিও কলের সত্যতা অবশ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করেনি ‘ডেইলি ডোমকল’। ভাইরাল অডিও অনুযায়ী, ফোনে অভিযুক্তকে বলতে শোনা যাচ্ছে— “পর পর তিনদিন অফিসার নিয়ে এসে জিও ট্যাগ করিয়ে দিয়েছি। এখন টাকা পেয়ে মজা লাগছে তাই না! ঘরের টাকাটা কি এমনি এমনি এসেছে!” এই কথোপকথনে পরোক্ষভাবে রাকিবুল বোঝাতে চেয়েছেন, তিনি না থাকলে নাকি সরকারি ঘর পাওয়া যেত না। পাশাপাশি অডিওতে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগও উঠেছে।

অভিযোগ অস্বীকার অভিযুক্তের

যদিও সমস্ত অভিযোগ অস্বীকার করেছেন পঞ্চায়েত সদস্যার স্বামী রাকিবুল হাসান। তিনি দাবি করেছেন, তাঁর নামে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও মিথ্যা। রাকিবুল হাসান বলেন, “আমি এইরকম কোনও কথাই বলিনি। আমার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে অপপ্রচার করা হচ্ছে। শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস রাজনৈতিকভাবে আমার সঙ্গে পেরে উঠছে না বলেই আমার নামে মিথ্যা অভিযোগ আনা হচ্ছে।” তিনি আরও বলেন, তাঁকে ফাঁসানোর জন্য পরিকল্পিতভাবে এইসব করা হচ্ছে।

রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে

এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকায় রাজনৈতিক তরজা শুরু হয়েছে। শাসক ও বিরোধী শিবির একে অপরের বিরুদ্ধে পাল্টা অভিযোগ তুলছে। শাসক দলের স্থানীয় নেতাদের দাবি, বিরোধী দলের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাই দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় প্রভাব খাটিয়ে সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা আদায় করছে। অন্যদিকে, বিরোধী শিবিরের দাবি, প্রকৃত ঘটনা আড়াল করতে শাসক দল রাজনৈতিক রং লাগানোর চেষ্টা করছে।

প্রশাসনের ভূমিকা কী?

এই প্রসঙ্গে জলঙ্গি ব্লক প্রশাসন জানিয়েছে, একটি লিখিত অভিযোগ জমা পড়েছে। গোটা ঘটনার তদন্ত করা হবে। তদন্তে যদি অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়, তাহলে নিয়ম অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্ত কত দ্রুত শেষ হবে এবং আদৌ নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কিনা, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ।

বেশকিছু প্রশ্ন থেকেই যায়

এই ঘটনায় বেশকিছু প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা পেতে হলে কি টাকা দিতে হবে? কোন অধিকারে একজন পঞ্চায়েত সদস্যার স্বামী সরকারি ঘর পাইয়ে দেওয়ার নামে টাকা দাবি করতে পারেন? স্বচ্ছতায় প্রশাসনের নজরদারি কোথায়? স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ বলছে, ‘বাংলা আবাস যোজনা’ প্রকল্প রাজ্য সরকারের গরিব মানুষের মাথার উপর ছাদ দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। সেই প্রকল্প যদি দুর্নীতির অভিযোগে কলুষিত হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের আস্থা ভাঙবে। এখন দেখার, প্রশাসন অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!