TOP NEWS

চাকমা হত্যার ন্যায়বিচারের দাবিতে জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ, স্লোগান উঠল ‘আমরা ভারতীয়’

(ন্যায়বিচারের দাবিতে জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ। || Image Credit: X/@umashankarsingh)

ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: ত্রিপুরার ছাত্র অ্যাঞ্জেল চাকমার খুনের বিচার চেয়ে রাজধানীতে বিক্ষোভে সামিল ছাত্রযুব থেকে বিভিন্ন স্তরের মানুষ। শুক্রবার নয়াদিল্লির জন্তর মন্তরে উত্তর-পূর্ব ভারতের একাধিক রাজ্যের মানুষ বিক্ষোভ দেখায়। তারা দাবি তোলেন, অ্যাঞ্জেল খুনের দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি খুনের তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়ারও দাবি উঠেছে। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, এই হত্যাকাণ্ড বর্ণবিদ্বেষপ্রসূত এবং এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও বর্ণবাদী মনোভাবের প্রতিফলন।

এদিন প্রতিবাদ চলাকালীন বিক্ষোভকারীরা সুর তোলেন, ‘আমরা চাইনিজ নই, আমরা ভারতীয়’। একইসঙ্গে অ্যান্টি-রেসিয়াল আইন প্রণয়নের দাবিতে প্ল্যাকার্ড হাতে ন্যায় বিচারের দাবি তোলেন তারা। এক আন্দোলনকারী বলেন, এটি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রশাসন ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটনার বর্ণবাদী দিকটি খাটো করে দেখাতে চাইছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের ছাত্র-ছাত্রী ও বাসিন্দাদের কাছে দৈনন্দিন বর্ণবিদ্বেষ, স্টেরিওটাইপিং এবং আইনগত সুরক্ষার দাবিতে আজকের বিক্ষোভ প্রদর্শন। বিক্ষোভ থেকে স্পষ্টভাবে দু’দফা দাবি তোলা হয়—অঞ্জেল চাকমা হত্যাকাণ্ডের তদন্ত অবিলম্বে সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া এবং বর্ণবিদ্বেষপ্রসূত হিংসা ও অপমান মোকাবিলায় একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যান্টি-রেসিয়াল আইন প্রণয়ন।

ডিক্সোনা চাকমা নামের এক আন্দোলনকারীর কথায়, “উত্তর-পূর্ব ভারতের ছাত্র-ছাত্রীরা নিয়মিত বৈষম্যের শিকার হন। অঞ্চলটি সম্পর্কে অজ্ঞতাই এই বিদ্বেষের মূল কারণ। শুধু চেহারার কারণে নিজের পরিচয় ও জাতীয়তা নিয়ে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয় তাদের।” আরেক আন্দোলনকারীর দিপ্তি চাকমার বক্তব্য, “বর্ণবিদ্বেষমূলক গালাগালি যেন স্বাভাবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমরা ন্যায়বিচার চাই। দিল্লিতেও আমাদের ‘চিঙ্কি’ বা ‘নেপালি’ বলে ডাকা হয়। এটা আর মেনে নেওয়া যায় না। ২৫ বছর ধরে এখানে থাকলেও বাইরে বেরোলে আমরা নিরাপদ বোধ করি না। স্কুল, হাসপাতাল—সব জায়গাতেই আমাদের জিজ্ঞেস করা হয় আমরা চীনা কি না।” রঞ্জিনী চাকমা হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছেন, “আর নয়। এটা সহ্য করা হবে না। সত্য সামনে আসতেই হবে এবং দায়বদ্ধতা স্থির করতে হবে।”

যদিও এদিনের বিক্ষোভে উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের পাশাপাশি অন্য রাজ্যের মানুষও সংহতি জানান। প্রাক্তন দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের সভাপতি রোনাক খাতরি বিক্ষোভে যোগ দিয়ে বলেন, “উত্তর-পূর্ব ভারতের ছাত্রছাত্রীদের বিরুদ্ধে বর্ণবিদ্বেষ দীর্ঘদিনের সমস্যা। এই ঘটনা শুধু দেরাদুনে ঘটেছে বলেই আমাদের দাবি নয়। ক্যাম্পাসে উত্তর-পূর্বের ছাত্রছাত্রীদের ‘চাইনিজ’ বা ‘মোমো’ বলে অপমান করা হয়।”

প্রসঙ্গত, গত ৯ ডিসেম্বর চব্বিশ বছর বয়সী অ্যাঞ্জেল চাকমাকে একদল দুষ্কৃতী ‘চিনা’ বলে কটাক্ষ করে। প্রতিবাদ করায় অ্যাঞ্জেলকে ছুরি ও ভারী বস্তু দিয়ে নৃশংসভাবে আক্রমণ করা হয়। টানা ১৭ দিন হাসপাতালে লড়াই করার পর গত শুক্রবার তাঁর মৃত্যু হয়। মৃত পড়ুয়া ছিলেন এক বিএসএফ জওয়ানের পুত্র। অভিযোগ, ঘটনার দিন অ্যাঞ্জেল ও তাঁর ভাই মাইকেল বাজারে গিয়েছিলেন। সেখানে দুই বাইকে চড়ে আসা ৬ জন দুষ্কৃতী মাইকেলকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয় এবং ‘চায়নিজ মোমো’ বলে গালিগালাজ করতে থাকে। অ্যাঞ্জেল নিজেকে ভারতীয় বলে পরিচয় দিলেও রেহাই পাননি। ঘাড় ও পিঠে গুরুতর চোট নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তাঁকে। শেষ পর্যন্ত ঘাড়ের হাড় ভেঙে যাওয়ায় মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তিনি।

এদিকে অসমের কংগ্রেস সাংসদ গৌরব গগৈও বিক্ষোভে উপস্থিত থেকে অঞ্জেল চাকমার পরিবারের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তিনি বর্ণবিদ্বেষমূলক গালাগালির বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন এবং দ্রুত তদন্তের দাবি জানান। কংগ্রেস নেতার কথায়, “জাতিভিত্তিক গালির মতোই বর্ণবিদ্বেষমূলক অপমানের ক্ষেত্রেও কঠোর শাস্তির বিধান থাকা উচিত।” বিষয়টি সংসদের আগামী অধিবেশনে তোলার আশ্বাসও দেন কংগ্রেস সাংসদ। নর্থ-ইস্ট স্টুডেন্টস সোসাইটি ডিইউ (NESSDU)-র সভাপতি পয়েন্টিং থোকচোম বলেন, এই বিক্ষোভ উত্তর-পূর্ব ভারতের মানুষের মধ্যে ভয় ও ক্ষোভের প্রতিফলন। বর্ণবিদ্বেষমূলক হামলার শক্ত আইন না থাকলে প্রতিটি উত্তর-পূর্বের ছাত্র-ছাত্রী ঝুঁকির মুখে থাকবেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!