অসমে ভয়াবহ বন্যা: ৪৭ জনের মৃত্যু, ৭.২১ লক্ষ মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত, উদ্ধারে ভারতীয় সেনা

(অসমে ভয়াবহ বন্যা। ছবি: সংগৃহীত)

ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: অসমের বন্যা পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক রূপ নিয়েছে। শুক্রবার অসমের ডিসাস্টার রিপোর্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম-এর প্রকাশিত সর্বশেষ বুলেটিন অনুযায়ী, রাজ্যের ১১টি জেলায় ৭ লাখ ২১ হাজারের বেশি মানুষ জলবন্দি হয়ে পড়েছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় বন্যায় ভেসে ও ডুবে মারা গিয়েছেন ৬ জন। প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, রাজ্যের প্রায় ৯০০টি গ্রাম এখন জলের তলায়। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে শিবসাগর জেলা। সেখানে ৩,৯২,১৯৫ জন মানুষ চরম দুর্ভোগের শিকার। এছাড়া চরাইদেও জেলায় ১,১০,৭৫৫ জন, যোরহাটে ৯৭,৬৯০ জন এবং ডিব্রুগড়ে ১৩,৩৯০ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সব মিলিয়ে রাজ্যে প্রায় ২৪,৮৯৭.২৭ হেক্টর ফসলি জমি জলের নিচে তলিয়ে গেছে।

যে ১১টি জেলা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সেগুলি হলো- শিবসাগর, চরাইদেও, যোরহাট, ডিব্রুগড়, কার্বি আংলং, গোলাঘাট, কামরূপ, কামরূপ, নগাঁও, ধেমাঝি ও হোজাই। রাজ্যের নদীগুলির জলস্তর আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে। বুলেটিন অনুযায়ী, ৫টি প্রধান নদী একাধিক পয়েন্টে জল বিপৎসীমার উপর দিয়ে বইছে।

(জলের তলায় ঘর-বাড়ি। ছবি: সংগৃহীত)

বন্যার কবলে পড়ে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি চরম সংকটে পড়েছে গবাদি পশুও। তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১,৩৮,৯৬৫টি গবাদি পশু বন্যার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছে। ৫৪টি গবাদি পশু এবং ৫০০টি হাঁস-মুরগি সহ মোট ৫৪০টি প্রাণী বানের জলে ভেসে গেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য প্রশাসন ও বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী পূর্ণ শক্তিতে কাজ করছে। দুর্গম ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া এলাকাগুলিতে ত্রাণ পৌঁছাতে এবং আটকে পড়া মানুষদের তুলে আনতে ভারতীয় বায়ুসেনার হেলিকপ্টার ব্যবহার করা হচ্ছে। নিখোঁজ ও জলবন্দিদের উদ্ধারে প্রতিনিয়ত অভিযান চালানো হচ্ছে।

জলবন্দি ৫৭১ জনকে উদ্ধার ভারতীয় সেনার

ব্রহ্মপুত্র ও তার শাখা নদীগুলির পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে জল প্রবাহিত হওয়ায় প্লাবিত উপরি অসমের বিস্তীর্ণ এলাকা। টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে ঘরবাড়ি, ফসলি জমি এবং পরিকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই সংকটজনক পরিস্থিতিতে দুর্গত মানুষদের রক্ষায় দেবদূতের মতো এগিয়ে এসেছে ভারতীয় সেনা। তাঁদের পরিচালিত বিশেষ উদ্ধার অভিযান ‘অপারেশন জল রাহাত’-এর (Operation Jal Rahat) মাধ্যমে জলবন্দি ৫৭১ জন গ্রামবাসীকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। সেনা সূত্রে জানানো হয়েছে, গত ১৯ জুলাই থেকে ‘স্পিয়ার কোর’-এর অধীনে বিশেষ ত্রাণ দল দিনরাত এক করে এই উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত শিবসাগর, চরাইদেও এবং জোরহাট জেলায় ৪৫ জন সেনা সদস্যের সমন্বয়ে গঠিত ৩টি বিশেষ টিম সরাসরি মাঠে নেমেছে।

(জলবন্দি মানুষকে উদ্ধারে বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর কর্মীরা। ছবি: সংগৃহীত)

রাজ্য সরকার এবং স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করছেন সেনাজোয়ানরা। ইঞ্জিনিয়ারিং সরঞ্জাম, প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র ও ইমার্জেন্সি মেডিক্যাল কিটসহ স্পিডবোটে চেপে উত্তাল স্রোত পেরিয়ে গ্রামে গ্রামে পৌঁছে যাচ্ছেন তারা। ত্রাণ কার্যক্রমে যুক্ত এক সামরিক আধিকারিক জানান, “দেশের সীমান্ত রক্ষার পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জরুরি পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার।” জল স্তর ধীরে ধীরে স্থিতিশীল হতে শুরু করলেও উপরি অসমে সেনাবাহিনীর এই নিরবচ্ছিন্ন উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যপদ্ধতি ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলের মানুষের মনে আশা জাগাচ্ছে।

‘বন্যা পরিস্থিতি সঙ্কটজনক’: মুখ্যমন্ত্রী

বন্যা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করতে এবং উদ্ধারকাজ খতিয়ে দেখতে মঙ্গলবার শিবসাগর, চরাইদেও এবং জোড়হাট জেলা পরিদর্শন করেন অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। বন্যাকবলিত পরিবারগুলির সাথে দেখা করে মুখ্যমন্ত্রী তাদের প্রয়োজনীয় ত্রাণ ও সহায়তার আশ্বাস দেন। পরিদর্শনকালে মুখ্যমন্ত্রী নাজিরা এলাকার ডালবাগান হায়ার সেকন্ডারি স্কুলে স্থাপিত ত্রাণ শিবিরটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সেখানে আশ্রয় নেওয়া শয়ে শয়ে দুর্গত মানুষের সাথে তিনি কথা বলেন এবং শিবিরে পর্যাপ্ত খাদ্য, পানীয় জল, স্বাস্থ্যসেবা ও পয়ঃপ্রণালীর ব্যবস্থা রয়েছে কি না তা খতিয়ে দেখেন। আধিকারিকদের উদ্দেশ্যে মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট নির্দেশ দেন, যেন কোনো ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার সরকারি সাহায্য থেকে বঞ্চিত না হয়। দুর্গতদের আশ্বাস দিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “এই সংকট না কাটা পর্যন্ত আমরা প্রতিটি বন্যাদুর্গত পরিবারের পাশে থাকব। ত্রাণ শিবিরগুলিতে পর্যাপ্ত খাবার, নিরাপদ পানীয় জল এবং প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো পরিবারকেই সাহায্যের বাইরে রাখা চলবে না।”

(বন্যা পরিস্থিতি খতিয়ে দেখতে ত্রাণশিবিরে অসমের মুখ্যমন্ত্রী। ছবি: সংগৃহীত)

এনডিটিভি-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রতিবেশী নাগাল্যান্ডের মন জেলায় মেঘভাঙা বৃষ্টি এবং তার পরবর্তী টানা বর্ষণের ফলেই উজানি আসামে এই ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়েছে। চরাইদেও, শিবসাগর ও জোড়হাটের বহু এলাকা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। অনেক এলাকা এমনও রয়েছে যেখানে অতীতে কখনোই এই মাপের বন্যা দেখা যায়নি। সেনাবাহিনী, এনডিআরএফ এবং এসডিআরএফ উদ্ধারকাজ চালিয়ে গেলেও বানের জলে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া গ্রামগুলিতে পৌঁছানো কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। বহু রোগী এখনও আটকে রয়েছেন এবং হাজার হাজার পরিবার জলের তোড়ে বন্দী। সরকারি স্তরে ২৪ ঘণ্টা কাজ চললেও জল না কমা পর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত পরিমাণ জানা সম্ভব নয় বলে জানান মুখ্যমন্ত্রী। তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “ইতিমধ্যেই প্রাণহানির সংখ্যা বেশ উদ্বেগজনক। মোট জীবনের ও সম্পত্তির ক্ষতির সঠিক হিসেব পেতে অন্তত এক সপ্তাহ সময় লাগবে। কিছু দুর্গম এলাকায় পৌঁছানো এতটাই কঠিন যে আমরা এখনও বোতলজাত পানীয় জলও পৌঁছে দিতে পারিনি।” স্থানীয় সূত্রের কিছু তথ্যে শতাধিক মানুষ নিখোঁজ থাকার কথা বলা হলেও, সরকারি বুলেটিন অনুসারে এলাকাগুলিতে উদ্ধারকারী দল পৌঁছানোর সাথে সাথে সরকারিভাবে নিখোঁজের তালিকা হালনাগাদ করা হচ্ছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!