“বুলডোজার চালিয়ে সমাজের রক্তপিপাসা মেটানো হচ্ছে”— বিস্ফোরক বিচারপতি শ্রীধরন

ডিডি ডিজিটাল ডেস্ক: সাধারণ অভিযোগ উঠলেই অভিযুক্তের বাড়িঘর বুলডোজার দিয়ে গুড়িয়ে দেওয়া জেনো নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। এবার ‘বুলডোজার বিচার’ নিয়ে কড়া অবস্থান নিলেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি অতুল শ্রীধরন। পুরসভার নিয়ম লঙ্ঘনের অজুহাতে অভিযুক্তদের বাড়ি-ঘর বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলার সরকারি নীতিকে তীব্র ভর্ৎসনা করেন বিচারপতি। দেশজুড়ে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং যোগী আদিত্যনাথ সরকারের ‘বুলডোজার নীতি’ সম্পর্কিত একটি বিভক্ত রায়ে ৫১ পৃষ্ঠার মতামত পেশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, কোনো অপরাধ ঘটার সাথে সাথে বাড়ি ভেঙে ফেলা আসলে সমাজের ‘রক্তপিপাসা’ মেটানোর এক কৃত্রিম প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়। সুপ্রিম কোর্টের নির্দিষ্ট নির্দেশিকা থাকা সত্ত্বেও সরকারি আধিকারিকরা যেভাবে আইনের তোয়াক্কা না করে বুলডোজার চালাচ্ছেন, তাতে মনে হয় শীর্ষ আদালতের রায়কে তারা পাত্তাই দিচ্ছেন না। একই সাথে, বেআইনি নির্মাণ কীভাবে তৈরি হয় তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বিচারপতি জানান, কোনো বসতি বা বাড়ি রাতারাতি গড়ে ওঠে না। আমলাতান্ত্রিক ও রাজনৈতিক মদতে দুর্নীতিগ্রস্ত সরকারি আধিকারিকরা ঘুষের বিনিময়ে চোখ বন্ধ করে থাকেন বলেই এই বেআইনি নির্মাণগুলি ডালপালা মেলে।

বিচারপতি শ্রীধরন স্পষ্টভাবে মন্তব্য করেন, অসাধু প্রোমোটার ও দুর্নীতিগ্রস্ত আধিকারিকদের যোগসাজশে তৈরি হওয়া এই বেআইনি বাড়িগুলিতে যখন সরকার নিজেই জল ও বিদ্যুতের মতো সার্বভৌম নাগরিক সুবিধা প্রদান করে, তখন রাজ্য নিজেই সেই অপরাধের সহযোগী হয়ে ওঠে। আর দশক খানেক পর সাধারণ ক্রেতারা এর নির্মম শিকার হন এবং গৃহহীন হন। দেশে দুর্নীতি যেভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বিচারপতি শ্রীধরন বলেন, সাধারণ একজন ভারতীয় দুর্নীতিকে ততক্ষণ পর্যন্ত ভুল মনে করেন না, যতক্ষণ না তিনি নিজে হাতেনাতে ধরা পড়ছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল-এর ২০২৫ সালের রিপোর্টে ১৮২টি দেশের মধ্যে ভারত ৯১তম স্থানে রয়েছে— এই তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “এই লজ্জাঙ্কও আমাদের আর লজ্জিত করে না।” বিচারপতি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, এই অনিয়ন্ত্রিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি দেশের ধনী ও দরিদ্রের ব্যবধানকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে দেশে ব্যাপক গৃহযুদ্ধ বা সামাজিক অশান্তির চিত্রনাট্য তৈরি করছে।

অযোধ্যার রাম মন্দিরে অনুদান চুরির ঘটনা নিয়ে নজিরবিহীন মন্তব্য করেন এলাহাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি। ক্ষোভের সাথে বিচারপতির পর্যবেক্ষণ, রাম মন্দিরে অনুদান চুরির ঘটনাটি ভারতীয়দের সততা ও নৈতিকতার চরম অধঃপতনকে নির্দেশ করে। রাম মন্দির ট্রাস্টের অনুদান তছরূপের বিতর্ক প্রসঙ্গে বিচারপতি বলেন, “রাম মন্দিরে অনুদানের টাকা চুরির সাম্প্রতিক বিতর্কটি সব সীমানা পার করে দিয়েছে। এই চুরির পরেও যাদের কোনো যায় আসে না, তাদের আর কোনো কিছুতেই লজ্জিত করা সম্ভব নয়। এটি ভারতীয়দের সততার চরম অধঃপতনকে স্পষ্ট ফুটিয়ে তোলে।” রাজ্য সরকার যদি সত্যিই সমাজ থেকে দুর্নীতি দূর করতে আন্তরিক হয়, তবে কেবল মুখে কথা না বলে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৮৮’ সংশোধন করে কঠোরতম বিধান হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের ব্যবস্থা করা উচিত বলে মন্তব্য করেন বিচারপতি অতুল শ্রীধরন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!