TOP NEWS

‘এসআইআর’-এর যাঁতাকল ও রাষ্ট্রের অমানবিক উল্লাস: ভোটারই কি আজ কাঠগড়ায়?


——————————————————————————-

গণতন্ত্রের উৎসবে শামিল হওয়ার জন্য ভোটার তালিকায় স্বচ্ছতা জরুরি— এই আপ্তবাক্য নিয়ে কারও দ্বিমত থাকতে পারে না। কিন্তু স্বচ্ছতা আনার নামে রাষ্ট্র আজ যে ‘এসআইআর’ (SIR) নামক অসাংবিধানিক প্রক্রিয়ার জাল বিছিয়েছে, তা কার্যত সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের ওপর এক অঘোষিত যুদ্ধ ছাড়া আর কিছুই নয়। যে রাষ্ট্র মানুষকে সুন্দর জীবন ও জীবিকার নিরাপত্তা দেবে, সেই রাষ্ট্রই আজ মানুষকে রাষ্ট্রীয় যাঁতাকলে পিষে মারছে।

সমস্যা এড়িয়ে মশা মারতে কামান দাগা

ভারতীয় নির্বাচন প্রক্রিয়ায় সমস্যার কি অভাব আছে? ভোটের আগের হিংসা, ভোটের পরের রক্তপাত, ছোট রাজনৈতিক দলগুলোর কোণঠাসা হয়ে পড়া কিংবা বিরোধী ভোটারদের নিরাপত্তাহীনতা— এসব নিয়ে নির্বাচন কমিশনের কোনো ‘মাথাব্যথা’ চোখে পড়ে না। একটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভোট করতে খরচ হয় প্রায় ৯-১০ কোটি টাকা। এই বিপুল অপচয় কমানোর কোনো দিশা কমিশনের কাছে নেই। অথচ কমিশন উঠেপড়ে লেগেছে সাধারণ মানুষের নাগরিকত্ব আর অস্তিত্ব নিয়ে ছিনিমিনি খেলতে।

এই ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার করুণ ফল আজ আমাদের সামনে পরিষ্কার। নথির পাহাড় আর আতঙ্কের চাপে কোথাও মৃত্যুমিছিল চলছে, কোথাও সরকারি আমলারা পর্যন্ত মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। প্রশ্ন জাগে, শান্তির নিশ্বাসটুকু কেড়ে নিয়ে কিসের ডিজিটাল ইন্ডিয়া গড়তে চাইছি আমরা?

কেন বিকল্পের কথা ভাবল না কমিশন?

আমরা যখন ‘স্মার্ট ইন্ডিয়া’র ঢাক পিটিয়ে গলা ফাটাই, তখন এই গোটা প্রক্রিয়া কেন ডিজিটাল পদ্ধতিতে সম্পন্ন করা গেল না? এর একটি সহজ বিকল্প তো ছিলই। প্রত্যেক ভোটার যদি আধার কার্ডের আঙুলের ছাপ (Biometric) দিয়ে লিঙ্ক করতেন, তবে মৃত বা ভুয়ো ভোটার শনাক্ত করা কি খুব কঠিন ছিল? হাতেগোনা কিছু ব্যতিক্রম হয়তো থাকত, যা নথিপত্র দিয়ে সমাধান করা যেত। কিন্তু সেই পথে না হেঁটে রাষ্ট্র বেছে নিল হয়রানির কঠিন পথ।

এখন প্রশ্ন উঠতে পারে, বহু মানুষ তো অবৈধভাবে আধার কার্ড তৈরি করেছে! যদি তাই হয়ে থাকে, তবে তার দায় কার? সাধারণ মানুষের না কি সরকারি সিস্টেমের? এত আধিকারিক, এত কোটি কোটি টাকার ডিজিটাল পরিকাঠামো থাকার পরও যদি ভুয়ো আধার বা ভুয়ো ভোটার তালিকায় নাম ঢোকে, তবে সেই ব্যর্থতার জবাব কমিশন বা সরকারকেই দিতে হবে।

ব্যর্থতা ঢাকতে ভোটারই আজ অভিযুক্ত

সবচেয়ে অদ্ভুত এবং লজ্জাজনক বিষয় হলো, সিস্টেম নিজের ব্যর্থতা ঢাকতে প্রমাণ দেওয়ার দায় চাপিয়ে দিয়েছে ভোটারের কাঁধে। রাষ্ট্র বলছে, “ভোটার তুমিই প্রমাণ করো যে তুমি বৈধ ভোটার ও বৈধ নাগরিক।” অথচ এই ভোটারের ভোটেই নেতারা মসনদে বসেন। আজ যাঁদের হাতে ক্ষমতা, তাঁরাই সাধারণ মানুষকে সন্দেহভাজন করে তুলছেন। যদি বৈধ-অবৈধ প্রমাণের দায়িত্ব সাধারণ নাগরিককেই নিতে হয়, তবে নির্বাচন কমিশনের মতো বিশাল এক শ্বেতহস্তী পালার দরকারটা কী?

শেষ কথা

দিনের শেষে ২০০-৩০০ টাকা রোজগার করে নুন-ভাত খেয়ে যে মানুষটা শান্তির ঘুম ঘুমাতে চায়, তার সেই শান্তিতেই আজ থাবা বসানো হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা রোজগার করেও যদি অস্তিত্বের সংকটে শান্তিতে ঘুমানো না যায়, তবে সেই জীবনের কোনো মূল্য নেই। গোটা পরিস্থিতি একটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে— দেশ এক বিপজ্জনক পথে এগোচ্ছে। মানুষ আজ ক্ষুব্ধ, আজ তাঁদের পাল্টা প্রশ্ন করার সময় এসেছে। ক্ষমতার চেয়ারে বসে ভোটারের অধিকার নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ না হলে, সময়ের চাকা ঠিকই ঘুরে দাঁড়াবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!