TOP NEWS

‘যুবসাথী’ প্রকল্প: ভাতার আশায় দীর্ঘ লাইনে ডোমকলের উচ্চশিক্ষিতরা, ‘ভাতাময় রাজ্য’ কটাক্ষ বিরোধীদের

(ডোমকল পুরসভার 'যুবসাথী' ক্যাম্পে ফর্ম জমা দিতে ভিড়। || Image: Daily Domkal)

নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: রাজ্যের বেকার যুবসমাজের জন্য নতুন ভাতা প্রকল্প ‘যুবসাথী’ চালুর ঘোষণা ঘিরে মুর্শিদাবাদের ডোমকল মহকুমা জুড়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক উৎসাহ ও বিতর্ক। আগামী ১ এপ্রিল থেকে প্রকল্প চালুর আগে আবেদন গ্রহণের জন্য ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় বিশেষ শিবিরের আয়োজন করেছে রাজ্য সরকার। ডোমকল মহকুমার বিভিন্ন ব্লক ও পৌর এলাকায় রবিবার সকাল থেকেই এই শিবিরগুলিতে দেখা গেল বেকার যুবক-যুবতীদের দীর্ঘ লাইন। রাজ্য সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ২১ থেকে ৪০ বছর বয়সী মাধ্যমিক-উত্তীর্ণ কর্মহীন যুবক-যুবতীদের প্রতি মাসে ১৫০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হবে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে। সর্বাধিক পাঁচ বছর পর্যন্ত এই ভাতা পাওয়া যাবে। সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নিযুক্ত কিংবা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, কৃষকবন্ধুর মতো অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের সুবিধাভোগীরা এই প্রকল্পের আওতায় আসবেন না।

ডোমকল বিধানসভায় দুই কেন্দ্রে শিবির

ডোমকল বিধানসভা এলাকায় পৌর ও পঞ্চায়েত অঞ্চল মিলিয়ে দুটি পৃথক কেন্দ্রে শিবির করা হয়েছে। পৌর এলাকার বাসিন্দাদের জন্য ডোমকল রবীন্দ্র-নজরুল অডিটোরিয়াম প্রাঙ্গণে চলছে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পের ফর্ম বিতরণ ও জমা নেওয়ার কাজ। পাশাপাশি কৃষকবন্ধু ও লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো অন্যান্য সরকারি প্রকল্পের আবেদন ও সংশোধনের সুবিধাও দেওয়া হচ্ছে। অন্যদিকে ডোমকল বিধানসভার পঞ্চায়েত এলাকার বাসিন্দাদের জন্য মধুরকুল হাইস্কুল প্রাঙ্গণে চলছে বিশেষ শিবির। সকাল থেকেই এই দুই কেন্দ্রে আবেদনকারীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ডোমকল পুরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের স্নাতকোত্তর উত্তীর্ণ যুবক সৌরভ মণ্ডল লাইনে দাঁড়িয়ে আবেদনপত্র জমা দিয়ে বলেন, “দুই বছর ধরে চাকরির চেষ্টা করছি। কবে চাকরি পাব জানি না। ততদিন যদি ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে ভাতা পাই, অন্তত নিজের পকট খরচটা চালাতে সুবিধা হবে।”

ভাতায় জীবন চলে না — ক্ষোভ

তবে প্রকল্প নিয়ে উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি ক্ষোভও স্পষ্ট অনেকের বক্তব্যে। ডোমকলেরই বাসিন্দা রুবেল শেখ স্নাতক পাশ করে বর্তমানে রাজমিস্ত্রির কাজ করেন। তিনি আবেদনপত্র জমা দিলেও প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। রুবেল বলেন, “ভাতায় কি পেট ভরবে? বাজারে সবকিছুর দাম আগুন। দেড় হাজার টাকায় কী হবে? ফোনের রিচার্জেই শেষ হয়ে যাবে। সরকারের উচিত ভাতা দেওয়ার বদলে কর্মসংস্থান তৈরি করা।” তাহলে আবেদন করছেন কেন — এই প্রশ্নের উত্তরে তাঁর তার সোজাসাপ্টা জবাব, “সরকার যে টাকা দিচ্ছে, সেটা তো আমাদেরই ট্যাক্সের টাকা। সুবিধা পাওয়া গেলে নেব না কেন?” এই দ্বৈত মনোভাবই যেন ফুটে উঠছে বহু আবেদনকারীর বক্তব্যে—একদিকে ভাতার প্রয়োজনীয়তা, অন্যদিকে কর্মসংস্থানের দাবিও সমান জোরালো।

রানিনগর ও জলঙ্গিতেও ভিড়

ডোমকল মহকুমার অন্য দুই বিধানসভা কেন্দ্র রানিনগর ও জলঙ্গিতেও একই ছবি দেখা গেছে। রানিনগর বিধানসভা দুটি ব্লক—রানিনগর-১ ও রানিনগর-২—নিয়ে গঠিত। এই বিধানসভা এলাকার বাসিন্দাদের জন্য দুটি পৃথক কেন্দ্রে শিবির করা হয়েছে। রানিনগর-১ ব্লকের আবেদনকারীদের জন্য ইসলামপুর আদর্শ মহাবিদ্যালয়ে এবং রানিনগর-২ ব্লকের বাসিন্দাদের জন্য রানিনগর-২ ব্লক অফিস প্রাঙ্গণে আবেদন গ্রহণ চলছে।

জলঙ্গি বিধানসভা এলাকার জন্য তিনটি কেন্দ্রে শিবির হয়েছে—জলঙ্গি মহাবিদ্যালয়, সাগরপাড়া বালিকা বিদ্যালয় এবং রানিনগর-২ ব্লক অফিস প্রাঙ্গণ। বিভিন্ন গ্রাম থেকে বহু যুবক-যুবতী সকালেই এসে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। শিবিরে দাঁড়িয়ে থাকা বহু যুবক-যুবতীর মুখে একদিকে স্বস্তির প্রত্যাশা, অন্যদিকে আত্মসম্মানের সংকটও ধরা পড়েছে। অনেকেই জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন বেকার থাকার কারণে পারিবারিক ও সামাজিক চাপ বাড়ছে। এক তরুণী আবেদনকারী বলেন, “চাকরি পেলে ভালো লাগত। কিন্তু এখন কোনও আয় নেই। তাই ভাতা নিতে বাধ্য হচ্ছি।”

উচ্চশিক্ষিত বেকারদের দীর্ঘ লাইন

শিবিরগুলিতে লক্ষ্য করা গেছে, শুধু মাধ্যমিক বা স্নাতক নয়, ৩০-৩৫ বছর বয়সী বহু স্নাতকোত্তর ও উচ্চশিক্ষিত যুবক-যুবতীও আবেদন করতে এসেছেন। তাদের বক্তব্যে উঠে এসেছে দীর্ঘদিনের বেকারত্বের হতাশা। এক আবেদনকারী বলেন, “না রাজ্য না কেন্দ্র—কোনও সরকারই বেকারদের কথা ভাবছে না। চাকরি নেই, সুযোগ নেই। আর কতদিন বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করব?” আরেকজনের কথায়, “আমাদেরও তো জীবন আছে। বয়স বাড়ছে, দায়িত্ব বাড়ছে। সামান্য ভাতাও এখন দরকার হয়ে পড়েছে।” এই কথাগুলিই যেন বর্তমান যুবসমাজের অর্থনৈতিক বাস্তবতার প্রতিফলন—শিক্ষা বাড়ছে, কিন্তু কর্মসংস্থান বাড়ছে না।

প্রসঙ্গত, মুর্শিদাবাদের ডোমকল মহকুমা মূলত কৃষিনির্ভর ও সীমান্তবর্তী অঞ্চল। শিল্প বা পরিষেবা খাতে বড় কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। ফলে উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজের একটি বড় অংশ কর্মহীন বা অস্থায়ী কাজে যুক্ত। অনেকেই পরিযায়ী শ্রমিক হিসেবে রাজ্যের বাইরে কাজ করতে বাধ্য হন। স্থানীয় বাসিন্দা মিলন মণ্ডল মনে করেন, সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পের প্রয়োজন আছে, কিন্তু তা দীর্ঘমেয়াদে সমাধান নয়। তিনি বলেন, “জনমুখী প্রকল্পের বিরোধী নই। বেকারদের মাসিক ভাতা দেওয়া ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এতে কি রাজ্যের উন্নয়ন হবে? কর্মসংস্থান তৈরি হলে তবেই রাজ্যের আর্থিক উন্নয়ন সম্ভব।” শিক্ষিত বেকারদের একাংশের বক্তব্য, সামাজিক সুরক্ষা ভাতা স্বল্পমেয়াদে ভোগব্যয় বাড়াতে সাহায্য করলেও উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান তৈরি না হলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন সম্ভব নয়। ডোমকল মহকুমার মতো সীমান্তবর্তী ও কৃষিনির্ভর অঞ্চলে শিল্প ও পরিষেবা খাতের কর্মসংস্থান সীমিত হওয়ায় বেকারত্বের চাপ বেশি। ফলে ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে আবেদনকারীর সংখ্যা বেশি হওয়া স্বাভাবিক।

রাজনৈতিক তাৎপর্য

ডোমকলের এক আবেদনকারী যুবকের কথায় যেন সামগ্রিক চিত্র ধরা পড়ে, “ভাতা থাকলে ভালো। কিন্তু আমরা কাজ চাই। নিজের পরিশ্রমে আয় করতে চাই।” এই প্রত্যাশাই এখন ডোমকল মহকুমা থেকে গোটা রাজ্যের বেকার যুবসমাজের মুখ্য দাবি—ভাতা নয়, কর্মসংস্থানের পথ খুলুক। রাজনৈতিক মহলের মতে, বেকার যুবসমাজের মধ্যে আর্থিক সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যেই এই প্রকল্প চালু করা হচ্ছে। নির্বাচনের আগে বা রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রেক্ষাপটে সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পগুলির গুরুত্বও বাড়ে। তবে ডোমকলের বিরোধী মহল ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে—ভাতা নয়, কর্মসংস্থানই হওয়া উচিত মূল লক্ষ্য। এক কংগ্রেস নেতার কথায়, “কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পেরে, ভাতাময় রাজ্য গড়ছেন দিদি।”যদিও শাসক শিবিরের দাবি, সামাজিক সুরক্ষা ও কর্মসংস্থান—দুই ক্ষেত্রেই সমান্তরাল উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

‘যুবসাথী’ প্রকল্প

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ঘোষণার পর শনিবার নবান্ন থেকে মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তী সমস্ত জেলার জেলাশাসকদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক করে প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রস্তুতি পর্যালোচনা করেন। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, রাজ্যের ২৯৪টি বিধানসভা কেন্দ্রেই নির্দিষ্ট সময়সূচি মেনে ক্যাম্পের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ করতে হবে। সেমত রবিবার থেকে রাজ্যজুড়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

প্রশাসন জানিয়েছে, ‘যুবসাথী’ প্রকল্পে আবেদন অনলাইন ও অফলাইন—দুইভাবেই করা যাবে। শিবিরে এসে সরাসরি ফর্ম জমা দেওয়ার পাশাপাশি নির্দিষ্ট পোর্টালের মাধ্যমে অনলাইন আবেদনও করা সম্ভব। ১৫ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ক্যাম্প ২৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। এই সময়ের মধ্যে রাজ্যের প্রতিটি বিধানসভা এলাকায় আবেদন গ্রহণের কাজ সম্পন্ন করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রশাসনিক সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পে আবেদন করতে হলে—
আবেদনকারীর বয়স ২১ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে হতে হবে। মাধ্যমিক বা সমতুল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে। সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে নিযুক্ত থাকা চলবে না। অন্য নির্দিষ্ট ভাতা প্রকল্পের সুবিধাভোগী হওয়া যাবে না। সর্বাধিক পাঁচ বছর পর্যন্ত ভাতা পাওয়া যাবে। এই শর্তাবলি অনুযায়ী প্রকৃত কর্মহীন যুবসমাজকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছে প্রশাসন।

১ এপ্রিল থেকে প্রকল্প চালু হলে বাস্তবে কতজন উপকৃত হন এবং ভাতার অর্থ যুবসমাজের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনে—তা সময়ই বলবে। তবে ডোমকলের শিবিরগুলিতে আবেদনকারীদের বক্তব্যে স্পষ্ট—ভাতা সাময়িক স্বস্তি দিলেও স্থায়ী সমাধান হিসেবে তারা কর্মসংস্থানই চান।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!