ডেইলি ডোমকল, নয়াদিল্লি: বিহারে ভোটার তালিকার ‘বিশেষ নিবিড় সংশোধন’ (Special Intensive Revision বা SIR) প্রক্রিয়াকে ‘নিরপেক্ষ, ন্যায়সঙ্গত এবং যুক্তিযুক্ত’ বলে দাবি করল জাতীয় নির্বাচন কমিশন। বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) সুপ্রিম কোর্টে শুনানির সময় কমিশন সাফ জানিয়েছে যে, গুটিকয়েক এনজিও এবং রাজনৈতিক নেতার মর্জিতে এই ধরণের একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার ওপর কোনো ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তদন্ত’ চালানো যেতে পারে না।
৬৬ লক্ষ নাম বাদ: কমিশনের যুক্তি
নির্বাচন কমিশনের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে প্রবীণ আইনজীবী রাকেশ দ্বিবেদী বলেন, “বিহারে এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় ৬৬ লক্ষ মানুষের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে একজনও সুপ্রিম কোর্ট বা হাই কোর্টে আবেদন করেননি। অথচ এডিআর (ADR) এবং পিইউসিএল (PUCL)-এর মতো এনজিও এবং কয়েকজন সাংসদ এই প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন।” তিনি আদালতকে অনুরোধ করেন, এই আবেদনগুলি যেন মোটা অঙ্কের জরিমানা বা ‘কস্ট’-সহ খারিজ করে দেওয়া হয়।
আইনের ব্যাখ্যা ও ইভিএম প্রসঙ্গ
কমিশন যুক্তি দিয়েছে যে, ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১(৩) ধারা অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনকে বিশেষ সংশোধন করার যে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, তার পদ্ধতি নির্ধারণের পূর্ণ স্বাধীনতা কমিশনের রয়েছে। ইভিএম এবং ব্যালট পেপার সংক্রান্ত পূর্ববর্তী একটি রায়ের প্রসঙ্গ টেনে রাকেশ দ্বিবেদী হালকা চালে বলেন, “সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমাদের ইউরোপকে অনুসরণ করতে হবে। তারা ইভিএম ব্যবহার করলে আমাদেরও করতে হবে, আর তারা ব্যালট পেপারে ফিরে গেলে আমাদেরও তাই করতে হবে।”
নাগরিকত্ব আইন ও জনবিন্যাসগত পরিবর্তন
বিহারে বিগত ২০ বছর ধরে এ ধরণের কোনো বিশেষ সংশোধন হয়নি বলে জানিয়েছে কমিশন। নগরায়ন এবং জনসংখ্যার স্থানান্তরের মতো বাস্তবতাকে মাথায় রেখেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব (সংশোধনী) আইনের প্রসঙ্গ তুলে আইনজীবী বলেন যে, আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে অনুপ্রবেশের বিষয়টি মাথায় রেখেই তৎকালীন অটল বিহারী বাজপেয়ী সরকার নাগরিকত্বের প্রমাণের জন্য কঠোর নিয়মাবলি প্রবর্তন করেছিল। বর্তমান সংশোধন প্রক্রিয়ায় সেই আইনি কাঠামোর প্রতিফলন ঘটেছে। তবে বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী প্রশ্ন তোলেন যে, কমিশনের মূল আদেশে কেন স্পষ্টভাবে অনুপ্রবেশের কথা উল্লেখ করা হয়নি। তিনি স্মরণ করিয়ে দেন যে, “আন্তঃরাজ্য অভিবাসন একটি সাংবিধানিক অধিকার।”
স্বচ্ছতার দাবি ও ‘আমেরিকান’ মডেলের সমালোচনা
নির্বাচন কমিশন দাবি করেছে যে, এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত স্বচ্ছ ছিল। বুথ লেভেল এজেন্টরা (BLA) বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাচাই করেছেন এবং ভোটারদের ৫ কোটিরও বেশি এসএমএস (SMS) পাঠানো হয়েছে। প্রায় ৭৬ শতাংশ ভোটারকে কোনো নথিপত্রই জমা দিতে হয়নি। শুনানি চলাকালীন আবেদনকারীদের পক্ষ থেকে মার্কিন আদালতের ‘ডিউ প্রসেস অফ ল’ (Due process of law) বা ‘আইনগত যথাযথ প্রক্রিয়া’র প্রসঙ্গ তোলা হলে রাকেশ দ্বিবেদী তার তীব্র বিরোধিতা করেন। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিচার করার জন্য ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্টকে তুলে আনতে পারেন, এমনকি গ্রিনল্যান্ডও দখল করতে চান। সেখানে কিসের ‘ডিউ প্রসেস’? আবেদনকারীরা সেই ব্যবস্থা এখানে আমদানি করতে চাইছেন।”
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর বেঞ্চ বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করছে। আবেদনকারীদের মূল অভিযোগ হলো, এই বিশেষ সংশোধনের পদ্ধতি স্বচ্ছ নয় এবং এর ফলে প্রকৃত নাগরিকরা তালিকা থেকে বাদ পড়ার আশঙ্কায় রয়েছেন।
