ডেইলি ডোমকল, ডিজিটাল ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের বহুল প্রতীক্ষিত বিধানসভা নির্বাচন এবার অনুষ্ঠিত হবে দুই দফায়—২৩ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল। ভোট গণনা হবে ৪ মে। রবিবার এই সূচি ঘোষণা করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। একই সঙ্গে ঘোষণা করা হয়েছে অসম, তামিলনাড়ু, কেরল এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পুদুচেরির বিধানসভা নির্বাচনের তারিখও। তবে অন্যান্য রাজ্যে এক দফায় ভোট হলেও পশ্চিমবঙ্গে ভোট হবে দুই দফায়। উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গে আট দফায় ভোটগ্রহণ হয়েছিল এবং প্রায় এক মাস ধরে চলেছিল নির্বাচনী প্রক্রিয়া।
আট দফা থেকে দুই দফায় ভোট
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল কোভিড-১৯ মহামারির মধ্যে। সেই সময় প্রথম দফার ভোট হয়েছিল ২৭ মার্চ এবং শেষ দফার ভোট হয়েছিল ২৯ এপ্রিল। নিরাপত্তা বাহিনীর পর্যাপ্ত মোতায়েন নিশ্চিত করার জন্য তখন বহু দফায় ভোটগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তবে এবার বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে জানান, নির্বাচন যেন দুই বা তিন দফার মধ্যেই সম্পন্ন করা হয়। তাঁদের যুক্তি, দীর্ঘ সময় ধরে নির্বাচন চললে নির্বাচনী ব্যয় বেড়ে যায় এবং ভোটারদের উৎসাহও কমে যায়। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি। অতীতে পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের সময় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু এবার রাজ্যে ইতিমধ্যেই বিপুল সংখ্যক কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন রয়েছে বলে রাজনৈতিক দলগুলির দাবি, তাই দীর্ঘ নির্বাচনী সূচির প্রয়োজন নেই।
চতুর্থ মেয়াদের লক্ষ্য মমতার
২০১১ সালে দীর্ঘদিনের বাম শাসনের অবসান ঘটিয়ে ক্ষমতায় আসেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। এরপর ২০১৬ এবং ২০২১ সালে পরপর দুইবার জয়ী হয়ে তিনি মুখ্যমন্ত্রী হন। এবার তিনি চতুর্থ মেয়াদের লক্ষ্য নিয়ে ভোটের ময়দানে নামছেন। ৭১ বছর বয়সী এই জননেত্রী দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে কিছুটা সরকারবিরোধী মনোভাবের মুখে পড়লেও এখনও তিনি রাজ্যের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মুখ। বিশেষ করে মহিলাদের জন্য বিভিন্ন সামাজিক কল্যাণমূলক প্রকল্প তাঁর বড় রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
এবারের নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রচারের কেন্দ্রে থাকতে পারে বাঙালি পরিচয়ের প্রশ্ন এবং কেন্দ্রের বিরুদ্ধে “বাংলা বিরোধী” মনোভাবের অভিযোগ। পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সংস্থার অপব্যবহার এবং বিজেপিকে “বহিরাগত” দল হিসেবে তুলে ধরা তাঁর প্রচারের অন্যতম মূল সুর হতে পারে। আদর্শ আচরণবিধি কার্যকর হওয়ার আগে মুখ্যমন্ত্রী দ্রুত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে মহার্ঘ ভাতা বকেয়া প্রদান এবং রাজ্যের পুরোহিত ও মুয়াজ্জিনদের মাসিক ভাতা ৫০০ টাকা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত। তবে ১৫ বছরের শাসনের পর তৃণমূল সরকারের সামনে দুর্নীতি এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ে বিরোধীদের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার চ্যালেঞ্জও রয়েছে।
ক্ষমতার দৌড়ে বিজেপির জোরালো প্রচেষ্টা
অন্যদিকে, প্রধান বিরোধী দল বিজেপিও এবার বড় সাফল্যের লক্ষ্য নিয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বর্তমানে বিজেপির সদস্য সংখ্যা ৭৭। দলের নির্বাচনী প্রচারের নেতৃত্ব দেবেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। নির্বাচনের আগে রাজ্যে বিজেপির শীর্ষ নেতাদের একাধিক জনসভা করার পরিকল্পনা রয়েছে। গত জুলাই মাসে দলের রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পান রাজ্যসভার সাংসদ শৌমিক ভট্রচার্য। তাঁকে একদিকে শক্তিশালী প্রচার সংগঠিত করতে হবে, অন্যদিকে রাজ্য সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বও সামলাতে হবে। বিজেপির নির্বাচনী প্রচারের মূল ইস্যুগুলির মধ্যে থাকবে সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ, দুর্নীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং কেন্দ্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নে রাজ্য সরকারের অনীহা।
ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
এবারের নির্বাচনে অন্যতম বড় বিতর্কের বিষয় হল সম্প্রতি হওয়া ভোটার তালিকার বিশেষ সংশোধন প্রক্রিয়া—স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন (SIR)। তৃণমূল কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, বিজেপি নির্বাচন কমিশনকে ব্যবহার করে বৈধ ভোটারদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। এ নিয়ে দলটি আদালতের দ্বারস্থও হয়েছিল। অন্যদিকে বিজেপির দাবি, তৃণমূল রাজনৈতিক স্বার্থে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করছে। এই সংশোধন প্রক্রিয়ায় প্রায় ৬৩ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়েছে, যা ২০২১ সালের নির্বাচনে তৃণমূল ও বিজেপির মোট ভোটের ব্যবধানের থেকেও বেশি। ফলে বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিবর্তন নির্বাচনের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
দুর্নীতি ও আইনশৃঙ্খলা বড় ইস্যু
বিরোধী দলগুলি বারবার তৃণমূল সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে। বিশেষ করে শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতি মামলায় সুপ্রিম কোর্ট প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষকের নিয়োগ বাতিল করায় সরকার বড় ধাক্কা খেয়েছে। এছাড়া আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও বিরোধীদের বড় রাজনৈতিক অস্ত্র। ২০২৪ সালের আগস্টে কলকাতার আর জি কর হাসপাতালের এক চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি করেছিল। বিরোধীরা নির্বাচনী প্রচারে এই ঘটনা এবং নারীর প্রতি সহিংসতার অন্যান্য ঘটনাকে সামনে আনতে পারে। তৃণমূলের দাবি, রাজ্য সরকার প্রতিটি ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং বিজেপি সংবেদনশীল বিষয়কে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করছে।
আগের নির্বাচনের ফল
২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে তৃণমূল কংগ্রেস ২৯৪টির মধ্যে ২১৫টি আসন জিতে বিপুল জয় পেয়েছিল। বিজেপি ৭৭টি আসন পেয়ে প্রধান বিরোধী দলে পরিণত হয়। অন্যদিকে, তিন দশক ধরে রাজ্য শাসন করা সিপিএম সেই নির্বাচনে একটি আসনও জিততে পারেনি। বামফ্রন্টের জোটসঙ্গী কংগ্রেসও কোনও আসন পায়নি। ফলে এবারের নির্বাচনেও মূল লড়াই যে তৃণমূল ও বিজেপির মধ্যে হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে প্রায় ঐকমত্য রয়েছে।
