নিজস্ব সংবাদদাতা, স্টাফ রিপোর্টার: এক মাসব্যাপী সংযম, সাধনা ও আত্মশুদ্ধির পর পবিত্র রমজান মাসের সমাপ্তি ঘটছে। ৩০টি রোজা সম্পূর্ণ করে আগামীকাল, শনিবার, দেশজুড়ে উদযাপিত হবে মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর। এই উৎসবকে কেন্দ্র করে ইতিমধ্যেই ডোমকল মহকুমার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে জোর প্রস্তুতি। শুক্রবার দুপুর থেকেই বাজারে নেমেছে মানুষের ঢল—মিষ্টির দোকান থেকে মাংসের বাজার, সর্বত্রই চোখে পড়ছে উপচে পড়া ভিড়।
রমজান মাস মুসলিমদের জন্য আত্মসংযম ও আধ্যাত্মিকতার এক বিশেষ সময়। সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত উপবাস পালন করে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন ধর্মপ্রাণ মুসলিমরা। সেই এক মাসের সাধনার শেষে আসে ঈদ—আনন্দ, ভ্রাতৃত্ব ও ভাগাভাগির উৎসব। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ঈদকে ঘিরে মানুষের মধ্যে থাকে বিশেষ উচ্ছ্বাস, যা ডোমকলের বিভিন্ন এলাকায় এদিন সেই উচ্ছ্বাস দেখা গিয়েছে।
শুক্রবার দুপুর গড়াতেই ডোমকল শহর ও আশপাশের গ্রামাঞ্চলের বাজারগুলিতে ভিড় বাড়তে শুরু করে। বিশেষ করে মিষ্টির দোকানগুলিতে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন লক্ষ্য করা যায়। বুন্দিয়া, জিলাপি, লাড্ডু, দই, ক্ষীরকদম—নানা রকম মিষ্টি কিনতে ভিড় করেন মানুষ। দোকানদারদের মুখেও ফুটে ওঠে ব্যস্ততা ও সন্তুষ্টির ছাপ। এক দোকানদার সাজিদুল ইসলাম জানান, “ঈদের আগের দিন আমাদের ব্যবসার সবচেয়ে ব্যস্ত সময়। সকাল থেকেই ক্রেতারা আসছেন, তবে দুপুরের পর ভিড় আরও বেড়ে গেছে। আমরা আগেভাগেই বাড়তি মিষ্টি প্রস্তুত করেছি।”
অন্যদিকে, সেমাই ও বুন্দিয়ার দোকানগুলিতেও একই চিত্র। ঈদের অন্যতম প্রধান খাদ্য ‘সেমাই’ ছাড়া এই উৎসব যেন অসম্পূর্ণ। ফলে বিভিন্ন ধরনের সেমাই—লাচ্ছা সেমাই, রোস্টেড সেমাই, প্যাকেটজাত সেমাই—সবকিছুর চাহিদা তুঙ্গে। জলঙ্গির খাইরুল আলম বলেন, “ঈদের সকালে পরিবারের সবাই মিলে সেমাই খাওয়ার একটা আলাদা আনন্দ আছে। তাই ভালো মানের সেমাই কিনতেই বাজারে এসেছি।”
মাংসের বাজারেও ছিল ভিড়ের চাপ। ঈদের দিন বিশেষ রান্নার জন্য আগেভাগেই মাংস কিনে রাখার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় অনেকের মধ্যে। মাংসের দোকানগুলিতে ক্রেতাদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খেতে হয় বিক্রেতাদের। এক মাংস ব্যবসায়ী জানান, “ঈদের আগে চাহিদা অনেক বেড়ে যায়। তাই আমরা বেশি পরিমাণে মাংসের জোগান রেখেছি। তবে ভিড় এতটাই বেশি যে সামলানো কঠিন হয়ে পড়ছে।” শুধু খাদ্যসামগ্রী নয়, নতুন পোশাক কেনার ক্ষেত্রেও শেষ মুহূর্তের ব্যস্ততা দেখা যায়। যদিও বেশিরভাগ মানুষ আগেই কেনাকাটা সেরে ফেলেন, তবুও অনেকে শেষ মুহূর্তে বাজারে ভিড় করেন পছন্দমতো জামা-কাপড় কিনতে। শিশুদের মধ্যে ঈদ নিয়ে আনন্দ চোখে পড়ার মতো। নতুন জামা, জুতো ও বিভিন্ন উপহার পেয়ে তাদের আনন্দ যেন দ্বিগুণ।
ডোমকলের বিভিন্ন ঈদগাহে ঈদ-উল-ফিতরের নামাজকে কেন্দ্র করে চলছে প্রস্তুতি। ঈদগাহ পরিষ্কার করা, নামাজের জন্য জায়গা প্রস্তুত করা, সাজানোর ব্যবস্থা করা—সব কিছুতেই ব্যস্ত রয়েছেন স্থানীয় মানুষজন। অনেক জায়গায় খোলা মাঠেও ঈদের জামাতের আয়োজন করা হয়েছে, যাতে বেশি সংখ্যক মানুষ একসঙ্গে নামাজ আদায় করতে পারেন।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকেও নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে নেওয়া হয়েছে পদক্ষেপ। বাজার ও জনবহুল এলাকায় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে, যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণেও নেওয়া হয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা, কারণ ঈদের আগের দিন বাজারে যানজটের সমস্যা বাড়তে পারে।
এদিকে, ঈদ মানেই শুধু আনন্দ নয়, দান-খয়রাতেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে এই দিনে। রমজান মাসে যাকাত ও ফিতরা দেওয়ার মাধ্যমে সমাজের দরিদ্র ও অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানোর বার্তা দেওয়া হয়। ডোমকলের বিভিন্ন এলাকায় অনেকেই ইতিমধ্যেই দরিদ্র মানুষের মধ্যে খাদ্য ও পোশাক বিতরণ করেছেন, যাতে তারাও ঈদের আনন্দে শামিল হতে পারেন। এক প্রবীণ বাসিন্দা ছাইদার আলী বলেন, “ঈদের আসল আনন্দ তখনই, যখন আমরা সবাই মিলে তা ভাগ করে নিতে পারি। শুধু নিজের পরিবারের জন্য নয়, সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষদের কথাও ভাবা উচিত।” এই ভাবনাকেই সামনে রেখে বহু স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ও স্থানীয় উদ্যোগে গরিবদের জন্য বিশেষ সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
সামগ্রিকভাবে, ডোমকল মহকুমা জুড়ে এখন উৎসবের আবহ। প্রতিটি ঘরে ঘরে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি—কোথাও রান্নার তোড়জোড়, কোথাও ঘর সাজানোর কাজ। শিশু থেকে প্রবীণ—সবাই অপেক্ষায় আগামীকালের সেই বিশেষ মুহূর্তের, যখন ঈদের নামাজ শেষে একে অপরকে আলিঙ্গন করে জানানো হবে শুভেচ্ছা—“ঈদ মোবারক”। এইভাবে এক মাসের ত্যাগ ও সংযমের পর খুশির ঈদকে বরণ করতে প্রস্তুত ডোমকলের মানুষ। শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের বার্তা নিয়ে আগামীকাল সকালেই শুরু হবে উৎসবের আনুষ্ঠানিকতা, আর সেই সঙ্গে ছড়িয়ে পড়বে আনন্দের জোয়ার গোটা অঞ্চলে।
