নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: দীর্ঘ এক মাসের সিয়াম সাধনার অন্তে দুয়ারে কড়া নাড়ছে খুশির ঈদ-উল-ফিতর। কাল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ, যখন সৌহার্দ্য ও ভ্রাতৃত্বের মেলবন্ধনে মেতে উঠবে গোটা দেশ। বাংলার অন্যান্য প্রান্তের মতো মুর্শিদাবাদের ডোমকল মহকুমাতেও এখন সাজ সাজ রব। বাজার-হাটে শেষ মুহূর্তের ভিড় আর নতুন পোশাকের গন্ধে ম ম করছে চারপাশ। তবে এই উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই বিষাদে পরিণত না হয় এবং আইন-শৃঙ্খলা যাতে বিন্দুমাত্র বিঘ্নিত না হয়, তার জন্য কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে জেলা পুলিশ প্রশাসন। একদিকে যেমন পুলিশের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা, অন্যদিকে ধর্মীয় নেতৃত্ব ও ইমামদের পক্ষ থেকে দেওয়া হয়েছে সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখার বার্তা।
পবিত্র ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে ডোমকল মহকুমার সাধারণ মানুষের সুরক্ষা ও আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বিশেষ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পুলিশ প্রশাসন। ডোমকল মহকুমা পুলিশ আধিকারিক (SDPO) শুভম বাজাজ ‘ডেইলি ডোমকল’-কে জানিয়েছেন, মহকুমাজুড়ে মোতায়েন থাকবে অতিরিক্ত পুলিশ বাহিনী। উৎসবের দিন যাতে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, তার জন্য ইদের দিন ভোর ৫টা থেকেই ময়দানে নেমে পড়বে পুলিশ কর্মীরা।
পুলিশ সূত্রে খবর, যেহেতু রাজ্যে ভোট প্রক্রিয়ার মধ্যে ঈদ উদযাপন হবে, সেমত সাধারণ পুলিশের পাশাপাশি স্পর্শকাতর এলাকাগুলোতে স্পেশাল র্যাফ (RAF) ফোর্স মোতায়েন করা হচ্ছে। এছাড়াও কেন্দ্রীয় বাহিনী বা সিএপিএফ (CAPF) সদস্যদের নিয়ে এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে রুট মার্চ বা টহলদারি চালানো হবে। মহকুমার রাস্তাঘাটে নজরদারি চালাতে অতিরিক্ত গাড়ি এবং মোটরসাইকেল নিয়ে পুলিশের একাধিক ‘মোবাইল টিম’ সারাক্ষণ টহল দেবে। ঈদ উপলক্ষে রাস্তায় মানুষের ঢল নামে। এই পরিস্থিতিতে যানজট নিরসন এবং দুর্ঘটনা রুখতে জনবহুল মোড়গুলোতে ‘স্ট্যাটিক টিম’ মোতায়েন থাকবে। বেপরোয়া যান চলাচল রুখতে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে চলবে ‘নাকা চেকিং’।
ডোমকলের এসডিপিও শুভম বাজাজ মহকুমাবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, “আমার পক্ষ থেকে মহকুমার সকল মানুষকে ঈদ মোবারক। আমরা চাই আপনারা সুস্থভাবে এবং অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে উৎসব পালন করুন। আপনাদের নিরাপত্তায় পুলিশ প্রশাসন সর্বদা সজাগ রয়েছে।”
সংযম ও ত্যাগের বার্তা: ইমামের বিশেষ আবেদন
ইদের এই পুণ্যলগ্নে ধর্মীয় ও সামাজিক কর্তব্যের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন বিশিষ্ট ইমাম মুফতি মহম্মদ জাহিরুল ইসলাম রেজবি। তিনি মনে করিয়ে দেন, ঈদ মানে কেবল আনন্দ বা উৎসব নয়, এর গভীরে রয়েছে ত্যাগের এক মহান শিক্ষা। রমজানের মূল নির্যাস হলো ‘তাকওয়া’ আত্মশুদ্ধি অর্জন করা। তাঁর কথায়, ঈদের নামাজের আগেই ‘ফিতরা’ বা দান নির্দিষ্ট পরিমাণে গরিবদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার আবেদন জানান তিনি। সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষগুলো যদি আনন্দে শামিল হতে না পারেন, তবে ঈদের খুশি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। উৎসবের নামে অতিরিক্ত বিলাসিতা বা অপচয় ইসলামি শিক্ষার পরিপন্থী। তাই সংযম বজায় রেখে উৎসব পালনের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। ইমাম জানান, “ভারত একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। এখানে প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ নিজেদের উৎসব স্বাধীনভাবে পালন করে।” জাহিরুল ইসলাম রেজবির কথায়, “উৎসবের এই আলো যেন প্রতিটি মানুষের জীবনে সমৃদ্ধি ও ভ্রাতৃত্বের নতুন বার্তা নিয়ে আসে। প্রশাসন ও জনগণের সহযোগিতায় আগামীকালের দিনটি হয়ে উঠুক প্রকৃত অর্থেই সম্প্রীতির উৎসব।”
বিগত কয়েক বছরে ঈদের দিনগুলিতে বাইক দুর্ঘটনার হার বৃদ্ধি পাওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ইমাম এবং পুলিশ প্রশাসন উভয়ই। বিশেষ করে অল্পবয়সী ছেলেদের বেপরোয়া গতিতে বাইক চালানো নিয়ে সতর্ক থাকার বার্তা দেওয়া হয়েছে। মুফতি জাহিরুল ইসলাম রেজবি অভিভাবকদের উদ্দেশ্যে বলেন, “অল্পবয়সী বা নাবালকদের হাতে দয়া করে মোটরবাইক তুলে দেবেন না। আর যুবকদের বাইক নিয়ে রাস্তায় বেরোনোর সময় সতর্ক করুন। তারা যেন কোনোভাবেই ট্রাফিক আইন অমান্য না করে বা বেপরোয়াভাবে গাড়ি না চালায়।” তিনি স্পষ্ট জানান, আনন্দের আতিশয্যে যেন কেউ জনজীবনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না করে।
