নিজস্ব সংবাদদাতা, ডোমকল: রাজ্যে ভোটের বাদ্যি বেজে গিয়েছে। চড়া রোদে রাজনৈতিক দলগুলোর হেভিওয়েট নেতারা যখন বিশাল গাড়ির কনভয় আর নিরাপত্তারক্ষীদের বেষ্টনীতে প্রচার সারছেন, তখন মুর্শিদাবাদের ডোমকলে দেখা গেল সম্পূর্ণ উল্টো ছবি। কোনো এসি গাড়ি নয়, বরং বাবার স্মৃতিবিজড়িত একটি পুরনো মডেলের মোটর সাইকেলে চেপে মোড়ে মোড়ে ঘুরছেন সিপিআইএম প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান (রানা)। কখনও চায়ের দোকানে আড্ডা, আবার কখনও সাধারণ মানুষের সঙ্গে খোশগল্পে মেতে উঠে জনসংযোগ সারছেন তিনি।
ডোমকলের সিপিআইএম প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান (রানা) প্রচারে নেমেছেন একেবারেই সাদামাটা ভঙ্গিতে। বিশাল গাড়ির বহর বা নিরাপত্তা রক্ষীর বদলে তাঁর সঙ্গী বাবার দেওয়া পুরোনো একটি মোটরবাইক। সেই বাইকেই চেপে তিনি ঘুরে বেড়াচ্ছেন ডোমকলের বিভিন্ন প্রান্তে—মোড়ে মোড়ে দাঁড়িয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, কখনও চায়ের দোকানে বসে আড্ডা দিচ্ছেন, আবার সেই সঙ্গে চালিয়ে যাচ্ছেন নিজের ভোটপ্রচার। নির্বাচনী রাজনীতির বর্তমান চিত্রে যেখানে ‘পাওয়ার শো’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে, সেখানে রানার এই সহজ-সরল প্রচার পদ্ধতি অনেকের কাছেই ব্যতিক্রমী বলে মনে হচ্ছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, “রানা দা বাইকে করে এসে আমাদের সঙ্গে বসে গল্প করছেন—এটা আলাদা একটা অনুভূতি।”
নির্বাচনী আবহে যখন অশান্তির আশঙ্কায় অনেকেই তটস্থ, তখন কোনো বিশেষ নিরাপত্তা ছাড়াই ডোমকলের অলিগলি চষে বেড়াচ্ছেন বাম প্রার্থী। মোস্তাফিজুর রহমান বলছেন, “ডোমকলের মানুষই আমার সিকিউরিটি। এলাকার মানুষকে যদি ভয়ই পাই, তবে তাঁদের কাজ করব কী করে? আমি ৩৬৫ দিন এই বাইকেই ঘুরি, চার চাকা গাড়ি আমার খুব একটা সুট করে না।”
নিজের এই প্রচার পদ্ধতি সম্পর্কে মোস্তাফিজুর রহমান (রানা) বলেন, “আমার এই মোটর সাইকেল ডোমকলের যেখানে থাক, সবাই জানে এটা রানাদার বাইক। ফলে আমি বাইকে চেপে ঘুরে বেড়াচ্ছি, এটা আমার কাছে নতুন কিছু নয়। আমি সারা বছরই এভাবেই চলাফেরা করি। বিশেষ দরকার হলে চার চাকার গাড়িতেও উঠতে হবে। কিন্তু আমার স্বাভাবিক চলাফেরা এই বাইকেই।”
প্রচারের মাঝেই তিনি স্পষ্ট করে দেন, তাঁর কাছে মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ঈদের পরদিন এলাকায় কোনও বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকায়, তিনি এই সুযোগে বাইক নিয়ে বেরিয়ে পড়েছেন জনসংযোগ বাড়াতে। প্রার্থীর কথায়, “আজ ঈদের পরের দিন। এলাকায় বড় কোনও রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। তাই বাইকে করে মোড়ে মোড়ে গিয়ে মানুষের সঙ্গে কথা বলছি, গল্প করছি। এইভাবেই মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠে।” নিরাপত্তা প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য আরও স্পষ্ট ও আত্মবিশ্বাসী। তিনি বলেন, “আমার কোনও সিকিউরিটির দরকার নেই। ডোমকলের মানুষই আমার সিকিউরিটি। আমি আজ এই এলাকার মানুষের জন্যই ভোটে দাঁড়িয়েছি। যদি আমি তাঁদেরকেই ভয় পাই, তাহলে সেটা ঠিক হবে না।”
মোস্তাফিজুর রহমানের এই প্রচারের অন্যতম সঙ্গী হলো তাঁর পুরনো বাইকটি। অনেকে ঠাট্টা করে এই বাইক বদলে ফেলার কথা বললেও রানা অনড়। আবেগপ্রবণ হয়ে তিনি বলেন, “এই বাইকটি আমার বাবা কিনে দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে বাবার স্মৃতি জড়িয়ে আছে। আমার কাছে এই বাইকটাই আসল।”
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যেখানে প্রায় প্রতিটি প্রার্থীই নিরাপত্তা বলয়ের মধ্যে থাকেন, সেখানে রানার এই বক্তব্য অনেকটাই আলাদা। তাঁর মতে, রাজনৈতিক মতাদর্শ আলাদা হতে পারে, কিন্তু মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক এবং বিশ্বাস থাকা উচিত। তিনি বলেন, “কেউ তৃণমূল করে, কেউ কংগ্রেস করে, কেউ বিজেপি করতে পারে—এটা স্বাভাবিক। কিন্তু আমি সবার বাড়িতে যাই। আমি ডোমকলের ভূমিপুত্র, আমার ভয় পাওয়ার কিছু নেই।” তিনি আরও যোগ করেন, “সবাই আমাকে ভোট দেবে এমন কথা নয়। মানুষ আমাকে ভোট না-ও দিতে পারে। কিন্তু আমার বিশ্বাস, কেউ আমাকে আক্রমণ করতে আসবে না। এই বিশ্বাসটাই আমার শক্তি।”
নিজের রাজনৈতিক জীবন ও আদর্শ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন তাঁর ‘গুরু’ আনিসুর রহমানের কথা। রানার কথায়, “আমার গুরু হলেন আনিসুর রহমান। তিনি ৩৪ বছর মন্ত্রী ছিলেন। কিন্তু জীবনে কোনওদিন নিরাপত্তা নিয়ে ঘোরেননি। আমি ওনার ছাত্র। তাই আমিও মনে করি, মানুষের সঙ্গে মিশে থাকাই আসল।” এই প্রসঙ্গেই উঠে আসে তাঁর বাইকের সঙ্গে ব্যক্তিগত আবেগের সম্পর্ক। রানা বলেন, “এই বাইকটাই আমার আসল সঙ্গী। অনেকেই মজা করে বলে, ‘রানা দা, এখন আর এই বাইক চলে না।”
নির্বাচনী আবহে যখন উন্নয়ন, প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক কৌশল—সবকিছু নিয়েই আলোচনা চলছে, তখন রানার এই আবেগঘন বক্তব্য অনেকের মন ছুঁয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে তাঁর সহজ যোগাযোগ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপর জোর দেওয়া রাজনৈতিকভাবে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা অবশ্য সময়ই বলবে। তবে তিনি নিজে আশাবাদী, এবারের নির্বাচন অন্যান্যবারের থেকে আলাদা হবে। তাঁর কথায়, “এবারের নির্বাচন অন্যরকম হবে। ডোমকলের মানুষও এই নির্বাচনকে অন্যভাবে নিয়েছে। আমি মানুষের ওপর ভরসা রাখছি।”
সব মিলিয়ে, ডোমকলের নির্বাচনী ময়দানে মোস্তাফিজুর রহমান (রানা)-র এই ‘বাইক প্রচার’ নিঃসন্দেহে এক ভিন্ন বার্তা দিচ্ছে—রাজনীতি মানেই শুধুমাত্র জাঁকজমক নয়, মানুষের কাছে পৌঁছনোর সহজ পথও হতে পারে অনেক বেশি কার্যকর। এখন দেখার বিষয়, এই সরলতা এবং মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ কতটা ভোটে পরিণত হয়। উচ্চবিত্ত প্রচারের চাকচিক্য সরিয়ে রেখে একজন প্রার্থীর এমন ‘মাটির কাছাকাছি’ থাকা ডোমকলের ভোটারদের মনে কতটা প্রভাব ফেলে, এখন সেটাই দেখার।
